রইদে ঝলমল তুষি

নাজিফা তুষি। ছবি : র্যাফ ক্লিক
মেজবাউর রহমান সুমনের ‘রইদ’ সিনেমাটি মুক্তির পর দর্শক ও সমালোচকদের প্রশংসায় ভাসছেন অভিনেত্রী নাজিফা তুষি। ‘রইদ’-এ ‘সাধুর বউ’ চরিত্রে নাজিফা তুষির অভিনয় মুগ্ধ করেছে দর্শকের পাশাপাশি তারকাদেরও। অভিনেত্রী আফসানা মিমি বলেছেন, ‘নাজিফা তুষি ও নূর ইমরান শুধু অভিনয়ই করেননি, চরিত্রগুলোকে জীবন্ত করে তুলেছেন। পুরো হল নিস্তব্ধ হয়ে সিনেমাটি দেখেছে। ছবি শেষে মনে হয়েছে, কিছু অনুভূতির ভাষা হয় না।’ নির্মাতা অনিমেষ আইচ অভিনয়শিল্পীদের প্রশংসা করে বলেছেন, ‘নাজিফা তুষি পুরো ছবিতে একমুহূর্তের জন্যও চরিত্রের ধারাবাহিকতা ভাঙেননি। নূর ইমরানও তার অভিনয়ে সর্বোচ্চ নিষ্ঠার পরিচয় দিয়েছেন।’ অভিনেতা ইয়াশ রোহান বলেছেন, ‘মোস্তাফিজুর নূর ইমরান ও নাজিফা তুষির অভিনয় ছিল নীরব, সংযত এবং গভীর। তারা করতালির জন্য অভিনয় করেননি, বরং চরিত্রের ভেতর বাস করেছেন। বিশেষ করে তুষি এমন একটি কঠিন ও নীরব চরিত্রে অভিনয়ের সাহস দেখিয়েছেন, যা অনেক অভিনেতাই এড়িয়ে যেতেন। আর সেই চ্যালেঞ্জে তিনি অসাধারণভাবে সফল হয়েছেন।’
প্রথমবার দেখার অনুভূতি
সিনেমাটি প্রথমবার দর্শকের সঙ্গে হলেই ঈদের দিন দেখেছেন তুষি। তিনি বলেছেন, সিনেমা দেখতে দেখতে শুটিংয়ের দিনগুলোর স্মৃতি বারবার মনে পড়ছিল। সেই সময়ের নানা মুহূর্ত যেন আবার ফিরে আসছিল। তাই অনুভূতিগুলো ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন হয়ে পড়েছে তার জন্য। তবে দর্শকদের ভালোবাসাই এখন সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। তুষির ভাষায়, ‘আমরা তো আনন্দ নিয়েই কাজটি করেছি। এখন সেই আনন্দ, সেই অভিজ্ঞতা দর্শকদের সঙ্গে ভাগাভাগি করছি। দর্শক পছন্দ করছেন, ভালোবাসা দিচ্ছেন— এটিই যথেষ্ট। এটিই সবচেয়ে বড় আনন্দ।’
রইদের আলো
সিনেমার সাফল্যের কৃতিত্ব নিজের কাঁধে নিতে নারাজ তুষি। তিনি বলেছেন, ‘রইদের আলো শুধু আমার মধ্যে নয়, আমাদের সবার মধ্যে। আমার সাধু আছে, পান্না আছে, পুরো টিম আছে, পরিচালক আছেন, এমনকি দর্শকদের মধ্যেও সেই আলো আছে। না হলে এত মানুষ সিনেমা দেখতে আসছেন কেন?’ তার মতে, শুধু অভিনেতা-অভিনেত্রী নয়; আর্ট, কস্টিউম, সেট নির্মাণ— সব বিভাগের মানুষ অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। নিজাম ভাইয়ের তৈরি বাড়ি, নসিব, সানি এবং অনেকের অবদান ছাড়া ‘রইদ’ সম্ভব হতো না।
সহ-অভিনেতা
তুষি বলেছেন, ‘রইদের সাধু মোস্তাফিজুর নূর ইমরান অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। দিনের পর দিন নৌকা চালিয়েছেন। আমরা যারা শহরে বড় হয়েছি, তাদের পক্ষে গ্রামের জীবনের এত কাছাকাছি যাওয়া সহজ নয়। পুরো টিম মিলে সেই জীবনটিকে অনুভব করার চেষ্টা করেছি।’
চরিত্রে পরিচিতি
চরিত্রের নামেই পরিচিত হওয়া অভিনেতার সবচেয়ে বড় সম্মান। ‘সাধুর বউ’ চরিত্রটি নিয়ে দর্শকদের উচ্ছ্বাসের বিষয়ে তুষি বলেছেন, একজন অভিনেতার জন্য এর চেয়ে বড় সম্মান আর কিছু হতে পারে না। ‘যখন নিজের নামের চেয়ে চরিত্রের নাম মানুষের কাছে বেশি প্রিয় হয়ে ওঠে, তখন সেটিই একজন অভিনেতার সবচেয়ে বড় অর্জন। ট্রেলার প্রকাশের পর থেকেই মানুষ সাধু আর সাধুর বউকে ভালোবেসেছে। এখনো যেভাবে এই চরিত্রগুলোকে ভালোবাসছে, সেটি আমার কাছে অস্কার পাওয়ার মতো অনুভূতি।’
সুমনের সঙ্গে দ্বিতীয়বার
‘হাওয়া’র পর আবারও সুমনের পরিচালনায় কাজ করেছেন তুষি। তার মতে, সুমনের সঙ্গে কাজ করা যেকোনো অভিনেতার জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। তিনি বলেছেন, ‘তার সঙ্গে কাজের প্রক্রিয়াটা একেবারেই আলাদা। তিনি অভিনেতাদের এমন এক ট্রান্সে নিয়ে যান, যেখানে জোর করে অভিনয় করতে হয় না। চরিত্রগুলো যেন স্বাভাবিকভাবেই তৈরি হয়ে যায়। তিনি খুব কম নির্দেশনা দেন। বরং চরিত্রগুলোকে অনুসরণ করেন। এটা খুব অদ্ভুত এবং অসাধারণ অভিজ্ঞতা।’
‘পাগলি’ হয়ে ওঠা
‘পাগলি’ চরিত্রের পোশাক নির্বাচন নিয়েও ছিল দীর্ঘ গবেষণা। তুষি জানিয়েছেন, স্থানীয় বাজার থেকে ব্যবহৃত পুরনো কাপড় সংগ্রহ করা হয়েছিল। শুটিংয়ের আগেই সেগুলো ব্যবহার করতেন তারা। তিনি বলেছেন, ‘আমরা নিজেদের ব্যক্তিগত কাপড় পরতাম না। স্থানীয় বাজার থেকে কেনা পুরনো কাপড়ই ব্যবহার করতাম। পরে শুটিংয়ের সময় সেই পোশাকগুলো আরও বারবার ব্যবহার করে, ওয়েদারিং করে চরিত্রের উপযোগী করা হয়েছে।’ তবে তার মতে, পোশাক বা বাহ্যিক রূপ নয়, চরিত্রের মানসিক অবস্থানে পৌঁছানোই ছিল সবচেয়ে বড় কাজ। তিনি বলেছেন, ‘কালো হওয়া, পোড়া, অসুন্দর দেখানো— এসব খুব সহজ। কিন্তু চরিত্রের মনস্তত্ত্বে পৌঁছানো, সেই মানসিক জায়গায় বিচরণ করাটাই আসল বিষয়।’ তিনি জানিয়েছেন, প্রায় ছয় মাস কোনো সাবান, শ্যাম্পু, কন্ডিশনার বা প্রসাধনী ব্যবহার করেননি— বলেছেন, ‘আমি শুধু পানি ব্যবহার করতাম। কারণ সাবান ব্যবহার করলে ত্বক পরিষ্কার হয়ে যায়। আমি চেয়েছিলাম ত্বকের প্রকৃত দাগ, ছোপ, ফ্রেকলস সব দৃশ্যমান থাকুক।’ শুধু তাই নয়, চরিত্রের প্রয়োজনে নিয়মিত পানও খেতেন তিনি। ‘আমার মা পান খান। আমি দেখেছি পান খেলে দাঁতে এক ধরনের টেক্সচার তৈরি হয়। সেটি দরকার ছিল। তাই পান খেতাম। আবার ওই অঞ্চলের মানুষের মতো দেখানোর জন্য চুনও ব্যবহার করেছি।’ চরিত্রের জন্য নিজের গায়ের রঙ আরও গাঢ় করতে সরিষার তেল ব্যবহার করতেন তুষি। তিনি বলেছেন, ‘আমার একমাত্র স্কিন কেয়ার ছিল সরিষার তেল। কারণ সরিষার তেল মেখে রোদে গেলে ত্বক দ্রুত পুড়ে যায়। আমি চাইছিলাম ত্বক পুরোপুরি বার্ন হয়ে যাক। মেকআপ দিয়ে এটি সম্ভব ছিল না। কারণ ঘাম বা বৃষ্টিতে মেকআপ উঠে যেত।’
শুধু অভিনয় নয়
শুধু অভিনয় নয়, চরিত্রের জীবনের সঙ্গে মিশে যাওয়ার জন্য স্থানীয় মানুষের সঙ্গে মাঠে কাজও করেছেন তিনি। তুষি বলেছেন, ‘আমরা যে বাড়িটি বানিয়েছি, সেটার কাজেও অংশ নিয়েছি। গাছ লাগিয়েছি, মাটি ফেলেছি, টিলার ওপরে উঠেছি। ওখানকার মানুষের সঙ্গে মিশে সব কাজ করেছি।’
‘হাওয়া’র চেয়ে কঠিন ‘রইদ’
তুষির মতে, ‘হাওয়া’ তার জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলেও ‘রইদ’ ছিল আরও বেশি চ্যালেঞ্জিং। ‘আমি রাস্তায় রাস্তায় পাগল মানুষ খুঁজতাম। তাদের মতো হওয়ার চেষ্টা করতাম। কিন্তু বুঝেছি, ওই জীবনযাপন করা এত সহজ নয়। চরিত্রটা দেখতে যত সহজ মনে হয়, ভেতরে ততটাই কঠিন।’ তিনি স্মরণ করেন প্রথম লুক টেস্টের অভিজ্ঞতা। সেখানে গিয়ে তাকে বলা হয়েছিল, তাকে এখনো শহুরে মনে হচ্ছে। ‘আমার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল, যেন আমাকে আর শহরের মেয়ে মনে না হয়। ওই অঞ্চলের ১০ জন মানুষের মধ্যে দাঁড়ালে যেন মনে হয় আমিও তাদেরই একজন।’
নামহীন চরিত্র
তুষি জানিয়েছেন, তার অভিনীত চরিত্রটির কোনো নামই নেই। তিনি বলেছেন, ‘এই প্রথম আমি এমন একটি চরিত্র করেছি যার কোনো নাম নেই। এই চরিত্রের মানসিক অবস্থায় থাকা সহজ ছিল না। চরিত্রটিকে বিশ্বাস করতে হয়েছে। কারণ আমি বিশ্বাস না করলে দর্শকও বিশ্বাস করবে না।’
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব ও বিদেশি স্বীকৃতির প্রসঙ্গ উঠলেও তুষি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন দেশের দর্শকদের ভালোবাসাকে। তিনি বলেছেন, ‘হাওয়ার সময় আমরা দেশের মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি। এবারও চাই দেশের মানুষ আমার পরিচালক, আমার টিমের কাজকে ভালোবাসুক। দেশের বাইরের মানুষ প্রশংসা করলে ভালো লাগবে, কিন্তু সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো দেশের মানুষের গ্রহণযোগ্যতা।’
গাইলেন গানও
অভিনয়ের পাশাপাশি এই সিনেমায় কণ্ঠও দিয়েছেন তুষি। ‘পাগলির প্রেম জ্বালা’ শিরোনামের গানটি এরই মধ্যে আলোচনায় এসেছে। নিজের কণ্ঠে গান গাওয়ার অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি বলেছেন, ‘আমি মূলত অভিনয়ের মানুষ। কিন্তু গান সবসময় আমার ভেতরের একটি ভালোবাসার জায়গা ছিল। যখন আমাকে গানটি গাওয়ার কথা বলা হলো, তখন ভয়ও কাজ করছিল— দর্শক আমাকে গায়িকা হিসেবে নেবে কি না।’
তবে গানটি প্রকাশের পর দর্শকদের প্রতিক্রিয়া তাকে অভিভূত করেছে। বিশেষ করে রবীন্দ্র সরোবরে গানটি পরিবেশনের পর থেকে গানটি আলোচনায় চলে আসে।
এরপর তুষি
তুষি এখন ব্যস্ত শিবব্রত বর্মনের ছোটগল্প অবলম্বনে নির্মিতব্য রবিউল আলম রবির ‘সুরাইয়া’ সিনেমার শুটিংয়ে। অন্যদিকে পাঁচ বছর বিরতির পর নতুন কাজ নিয়ে ফিরছেন নির্মাতা আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ। তার সিরিজ ‘অ্যানি’-তেও আছেন তুষি। সিরিজটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সিরিজ উৎসব ‘সেরিয়েনক্যাম্প ফেস্টিভ্যাল’-এর ‘উইমেন ইন সিরিজ’ বিভাগে বিশ্ব প্রিমিয়ারের জন্য নির্বাচিত হয়েছে। তুষি জানিয়েছেন, ‘আন্ধার’ ও ‘সখী রঙ্গমালা’সহ তার আরও কয়েকটি কাজ রয়েছে মুক্তির অপেক্ষায়। পাশাপাশি নতুন আরও একটি সিনেমার কাজও শুরু করেছেন তিনি। তবে আপাতত তার পুরো মনোযোগ ‘রইদ’-কে ঘিরেই।




