চাকরি ছেড়ে ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়েছিলেন তারা
- অভিনয়কে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ার আগে তাদের অনেকের জীবন ছিল অন্যরকম। নিরাপদ ও নিশ্চিত জীবনের পথ ছেড়ে শেষ পর্যন্ত তারা বেছে নিয়েছেন শোবিজের অনিশ্চিত জগৎ।

(বাঁ থেকে) হানিফ সংকেত, দিলদার, ফজলুর রহমান বাবু, আবুল হায়াত, চঞ্চল চৌধুরী, দিলারা জামান, বুলবুল আহমেদ
শিক্ষকতা থেকে অভিনয়ে
দিলারা জামানের কর্মজীবনের শুরু হয়েছিল শিক্ষকতা দিয়ে। সব মিলিয়ে প্রায় ২৬ বছর শিক্ষকতা করেছেন তিনি। দিলারা বলেছেন, ‘শিক্ষকতা ছেড়ে আসার একমাত্র কারণ ছিল আমার অভিনয়। এটাকে কেউ ভালো চোখে দেখেনি। আমি হয়তো অসুস্থতার কারণে একদিন ছুটির দরখাস্ত করেছি। পরের দিন গেলে প্রশ্ন আসত— শুটিং করতে গিয়েছিলেন নাকি? কিন্তু আমি স্পষ্ট করে বলতে পারি, এভাবে স্কুল কামাই করে বা কাজ ফেলে আমি কোনোদিন শুটিং করিনি। সবসময়ই বলতাম, শনি-রবিবার ছুটি থাকে, ওই সময়েই আমি কাজ করব। ঠিক সেইভাবেই আমি অভিনয় চালিয়ে গিয়েছিলাম।’ ২০০০ সাল থেকে অভিনয়কেই নিজের পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন দিলারা জামান।
অনার্স শেষ করার পর চঞ্চল চৌধুরী কোডায় চাকরি নেন। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত সেখানে চারুকলা বিভাগে শিক্ষকতা করেছেন। ২০০৫ সালে মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর নির্মিত গ্রামীণফোনের বিজ্ঞাপনে কাজ করে তিনি ব্যাপক পরিচিতি পান। এরপর ‘তালপাতার সেপাই’, ‘নিখোঁজ সংবাদ’সহ একের পর এক কাজ আসতে থাকে। একটা সময় চাকরি ছেড়ে ফুলটাইম অভিনয়ে মন দেন।
প্রকৌশলী থেকে অভিনয়-উপস্থাপনা
বুয়েট থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে ১৯৬৮ সালে ঢাকা ওয়াসায় প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দেন আবুল হায়াত। চাকরির পাশাপাশি নাট্যচর্চা চালিয়ে যেতে চেয়েছিলেন বলেই অনেক ভালো চাকরির সুযোগ পেয়েও ঢাকা ওয়াসার চাকরিকে বেছে নেন। কারণ সেখানে বদলি হয়ে ঢাকার বাইরে যাওয়ার ঝুঁকি ছিল না। ১৯৭৮ সালে অর্থনৈতিক উন্নতির আশায় লিবিয়ায় যান আবুল হায়াত। প্রায় তিন বছর সেখানে কাজ করলেও নাটকের টান কাটাতে পারেননি। দেশে ফিরে প্রথমেই ঢাকা ওয়াসার সরকারি চাকরিতে ইস্তফা দেন। অভিনয়ে যেন আরেকটু বেশি সময় দিতে পারেন এজন্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পরামর্শক হিসেবে কাজ করেন। পরে ১৯৯৫ সালের দিকে পুরোপুরিভাবে চাকরি ছেড়ে এই মাধ্যমকেই পেশা হিসেবে বেছে নেন।
প্রকৌশল শাস্ত্রে লেখাপড়া শেষ করে বাংলাদেশ মহাকাশ গবেষণা ও দূর অনুধাবন প্রতিষ্ঠানে যোগ দেন হানিফ সংকেত। সেখানে ঊর্ধ্বতন প্রকৌশলীর দায়িত্ব পালন করেন। পরে স্বেচ্ছায় অবসর নিয়ে উপস্থাপনাতেই পুরোপুরি মনোনিবেশ করেন।
ব্যাংকার থেকে অভিনয়ে
জনতা ব্যাংকে প্রায় ১০ বছর ব্যাংকার হিসেবে কাজ করেছেন বুলবুল আহমেদ। মতিঝিলের প্রধান কার্যালয়ে শিক্ষানবিশ কর্মকর্তা হিসেবে শুরু করে পরে শাখা ব্যবস্থাপকের দায়িত্বও পালন করেন। চলচ্চিত্রে ‘ইয়ে করে বিয়ে’ দিয়ে তার অভিষেক। এরপর ‘অঙ্গীকার’-এ কবরীর বিপরীতে অভিনয় করে পরিচিতি বাড়তে থাকে। একসময় অভিনয়ের টান এতটাই বেড়ে যায় যে, ব্যাংকের চাকরির পাশাপাশি অভিনয় চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। চাকরি ছাড়ার সিদ্ধান্ত সহজ ছিল না। স্ত্রী ডেইজি আহমেদ নিরাপদ ব্যাংকারের জীবন ছেড়ে অনিশ্চিত অভিনয় পেশায় যাওয়ার বিষয়ে প্রথমে রাজি ছিলেন না। পরে শাশুড়ির সহযোগিতায় তিনি স্ত্রীকে বোঝাতে সক্ষম হন। শেষ পর্যন্ত অভিনয়ের স্বপ্ন পূরণের পথে এগিয়ে যান বুলবুল আহমেদ।
তিন যুগের বেশি সময় ধরে অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত ফজলুর রহমান বাবু। প্রায় ২০ বছর ব্যাংকে চাকরি ও অভিনয় একসঙ্গে সামলেছেন তিনি। কিন্তু মন পড়ে থাকত অভিনয়েই। একসময় চাকরি ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে সময় লেগে যায় আরও পাঁচ বছর। শেষ পর্যন্ত ২০০৬ সালে নিশ্চিত ভবিষ্যৎ ছেড়ে অনিশ্চিত অভিনয়জীবনে পা রাখেন। নিজের সিদ্ধান্তের কথা বলতে গিয়ে বাবু বলেছেন, ‘ভালোবাসার টানে মানুষ ঘরবাড়ি ছাড়ে, রাজা সিংহাসন ছাড়ে। আমি ভালোবাসার টানে চাকরি ছেড়েছি। ঝুঁকিটাও কম ছিল না। সন্তানরা তখন ছোট। কিছু হয়ে গেলে পরিবারের কী হবে— এই চিন্তাও ছিল। কিন্তু ফুলটাইম দুটি কাজ সমান গুরুত্ব দিয়ে হয় না। এজন্য আজীবনের জন্য অভিনয়কে বেছে নিলাম।’
বিভিন্ন পেশা থেকে শোবিজে
ঢাকায় এসে শুরুতে তিতাস গ্যাস কোম্পানিতে চাকরি নেন রাজীব। ১৯৮১ সালে ‘রাখে আল্লাহ মারে কে’ সিনেমার মাধ্যমে চলচ্চিত্রে অভিষেক ঘটে তার। চাকরির কারণে অভিনয়ে পুরোপুরি সময় দিতে পারছিলেন না। ১৯৮২ সালে পরিচালক কাজী হায়াৎ ‘খোকনসোনা’ সিনেমায় তাকে মূল নায়কের চরিত্রে কাস্ট করেন। বড় বাজেটের বাণিজ্যিক সিনেমায় প্রধান নায়কের সুযোগ হাতছাড়া করতে চাননি রাজীব। তাই তিতাস গ্যাসের নিশ্চিত ও নিরাপদ চাকরি ছেড়ে দেওয়ার সাহসী সিদ্ধান্ত নেন।
পূর্বাণী হোটেলে চাকরি করতেন দিলদার। ১৯৭৩ সালে সেখানে ফ্লোর ইনচার্জ হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। টানা ১৫ বছর পূর্বাণী হোটেলে চাকরি করেছেন। ১৯৮৮ সাল থেকে পুরোপুরি অভিনয়ে মনোযোগী হন দিলদার। মৃত্যুর আগপর্যন্ত সেই পথেই ছিলেন।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে সাত বছর চাকরি করার পর ১৯৯২ সালে ক্যাপ্টেন পদ থেকে অবসর নেন হাসান মাসুদ। এরপর শুরু করেন সাংবাদিকতা। ২০০৮ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন ইংরেজি সংবাদমাধ্যমে কাজ করেন। একটা সময় অভিনয়ের ব্যস্ততা বেড়ে গেলে চাকরি স্থায়ীভাবে ছাড়তে হয়। চলচ্চিত্রে আসার আগে শবনম বুবলী ছিলেন একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের সংবাদ পাঠিকা। ২০১৬ সালে শাকিব খানের বিপরীতে ‘বসগিরি’ সিনেমার মাধ্যমে চলচ্চিত্রে অভিষেক হয় তার। সংবাদ পাঠিকার পরিচয় পেছনে ফেলে ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন চলচ্চিত্রের পরিচিত মুখ।



