আশায় আছেন স্ট্যান্ডআপ কমেডিয়ানরা

(পেছনে বাঁ থেকে) রাফসান সাবাব, আবু হেনা রনি ও আহমেদ আশিক, (সামনে বাঁ থেকে) নাভিদ মাহবুব, আমিন হান্নান চৌধুরী ও আনন্দ মজুমদার
দেশে স্ট্যান্ডআপ কমেডির জনপ্রিয়তা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তার, করপোরেট শো, ক্যাফে ও লাইভ ইভেন্টের সুবাদে নতুন প্রজন্মের কাছে এটি এখন জনপ্রিয়। ইউটিউব, ফেসবুক, টিকটক কিংবা ইনস্টাগ্রামের মাধ্যমে প্রতিদিনই নতুন নতুন কমেডিয়ান দর্শকের সামনে আসছেন। কিন্তু যারা নিয়মিত এই অঙ্গনে কাজ করছেন, তাদের প্রায় সবাই বলছেন, দেশে স্ট্যান্ডআপ কমেডি এখনো এমন জায়গায় পৌঁছায়নি যেখানে অধিকাংশ শিল্পী নিশ্চিন্তে এটিকে একমাত্র পেশা হিসেবে বেছে নিতে পারেন। বরং স্বপ্ন, সংগ্রাম, অনিশ্চয়তা, সীমিত আয়ের সুযোগ এবং দর্শকের রুচির পরিবর্তনের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করেই এগোতে হচ্ছে।
বদলে গেছে প্রচারের মাধ্যম
জনপ্রিয় স্ট্যান্ডআপ কমেডিয়ানদের একজন নাভিদ মাহবুব। তার মতে, স্ট্যান্ডআপ কমেডির মূল কাঠামো আগের মতোই আছে, কিন্তু বদলে গেছে এর প্রচারের মাধ্যম। একসময় একজন কমেডিয়ানের সামনে দর্শকের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ ছিল খুবই সীমিত। এখন স্মার্টফোন আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থাকলেই নিজের কনটেন্ট সারা বিশ্বের দর্শকের সামনে তুলে ধরা সম্ভব।
নাভিদ মাহবুবের অভিমত, ‘এ পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক হলো প্রতিভা আর আটকে থাকে না। যে কেউ নিজের দক্ষতা প্রমাণের সুযোগ পাচ্ছেন।’ তবে একই সঙ্গে তিনি মনে করিয়ে দিলেন, ‘কোটি কোটি কনটেন্টের ভিড়ে নিজেকে আলাদা করে তুলে ধরাও এখন আগের চেয়ে কঠিন হয়ে গেছে। শুধু ভালো কমেডি করলেই হবে না, সেটি মানুষের কাছে পৌঁছাতেও হবে।’
পরিবারই বোঝে না এই পেশা
তরুণ কমেডিয়ান আহমেদ আশিক ও আমিন হান্নান চৌধুরীর গল্প অনেকটা একই রকম। একজন বিদেশে চাকরি করেন, অন্যজন ব্যবসা পরিচালনা করেন। কিন্তু তাদের পরিচয়ের বড় অংশ জুড়ে রয়েছে স্ট্যান্ডআপ কমেডি। তারা নিয়মিত মঞ্চে পারফর্ম করেন, আবার ফেসবুক ও ইউটিউবের জন্য কনটেন্ট তৈরি করেন। তবুও পরিবার পর্যন্ত অনেক সময় তাদের এই পেশাকে পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারে না। আশিক মজা করে বললেন, তার মা এখনো মনে করেন তিনি মঞ্চে নাচেন!
আমিন হান্নান চৌধুরী বললেন– একসময় তিনি ভাবতেই পারেননি যে, স্ট্যান্ডআপ কমেডি একটি পেশা হতে পারে। এখন তিনি ফুলটাইম এই কাজ করার চেষ্টা চালাচ্ছেন। কিন্তু এখনো পুরোপুরি এই আয়ের ওপর নির্ভর করতে পারেন না। কারণ এটি এমন একটি শিল্প, যেখানে দর্শকের পছন্দ খুব দ্রুত বদলে যায়। আজ যিনি জনপ্রিয়, কাল হয়তো অন্য কেউ দর্শকের মন জয় করবেন। ফলে ভবিষ্যৎ নিয়ে সবসময় এক ধরনের অনিশ্চয়তা কাজ করে। আয় কেমন জানতে চাইলে রসিকতার সুরে তিনি বলেছেন, ‘আয়ের প্রশ্ন করে লজ্জা দেবেন না!’ তার মজার ছলে বলা এই মন্তব্যেই স্ট্যান্ডআপ কমেডিয়ানদের অর্থনৈতিক বাস্তবতা স্পষ্ট হয়।
নিয়মিত শো পাওয়া কঠিন
রাফসান সাবাব, আনন্দ মজুমদার এবং অন্য কমেডিয়ানদের অভিজ্ঞতাও প্রায় একই। তাদের মতে, মানুষ অনলাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কমেডি দেখতে আগ্রহী হলেও লাইভ শোয়ের টিকিট কিনে কমেডি উপভোগ করার সংস্কৃতি এখনো গড়ে ওঠেনি। ফলে নিয়মিত শো পাওয়া কঠিন, আর পেলেও সেখান থেকে স্থায়ী আয়ের নিশ্চয়তা নেই।
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ
শিল্পীরা বলছেন, স্ট্যান্ডআপ কমেডির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রতিনিয়ত নতুন কনটেন্ট তৈরি করা। একজন গায়ক একই গান বহুবার গাইতে পারেন, কিন্তু একজন কমেডিয়ান একই জোক দ্বিতীয়বার বললেই মজা নষ্ট হয়ে যায়।
নাভিদ মাহবুবের মতে, ‘একটি সফল দুই-তিন মিনিটের কমেডি সেট তৈরিতেও পাঁচ-ছয় মাস সময় লেগে যেতে পারে। কারণ প্রতিটি জোকের মধ্যে থাকতে হয় নতুনত্ব, পর্যবেক্ষণ, সময়জ্ঞান এবং দর্শককে চমকে দেওয়ার ক্ষমতা। এ কারণেই কমেডিয়ানদের সারাক্ষণ নতুন নতুন বিষয় খুঁজে বের করতে হয়।’
স্ট্যান্ডআপ কমেডি কী?
লোক হাসানো কেন কঠিন, এ নিয়েও শিল্পীদের অভিজ্ঞতা ভিন্ন। আমিন হান্নান বললেন, ‘বাংলাদেশিরা স্বভাবগতভাবেই রসিক। গ্রামের চায়ের দোকান থেকে শহরের আড্ডাসহ সব জায়গাতেই হাস্যরসের অভাব নেই। তাই মানুষকে নতুন কিছু দিয়ে চমকে দেওয়া সহজ নয়।’
হাসির মধ্য দিয়েই সবচেয়ে কার্যকরভাবে সত্য কথা বলা যায়। স্ট্যান্ডআপ কমেডি শুধু কৌতুক নয়; এটি সমাজকে আয়নার সামনে দাঁড় করানোর একটি শিল্প
আমিন হান্নানের দৃষ্টিতে, প্রকৃত স্ট্যান্ডআপ কমেডি মানে হলো সম্পূর্ণ মৌলিক লেখা, ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ এবং নিজস্ব গল্প।
কমেডি কি শুধু বিনোদন, নাকি সামাজিক পরিবর্তনেরও মাধ্যম, এই প্রশ্নে অবশ্য শিল্পীদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। নাভিদ মাহবুব মনে করেন, ‘হাসির মধ্য দিয়েই সবচেয়ে কার্যকরভাবে সত্য কথা বলা যায়। মানুষ যখন হাসে, তখন বার্তাটি সহজে গ্রহণ করে।’ তার মতে, স্ট্যান্ডআপ কমেডি শুধু কৌতুক নয়; এটি সমাজকে আয়নার সামনে দাঁড় করানোর একটি শিল্প।
আরেকটি বড় সংকট
স্ট্যান্ডআপ কমেডির আরেকটি বড় সংকট অবকাঠামো। নিয়মিত পারফর্ম করার জন্য পর্যাপ্ত ভেন্যু নেই। ওপেন মাইকের সংখ্যাও খুব কম। নতুন শিল্পীরা নিজেদের দক্ষতা যাচাই করার সুযোগও পান সীমিত।
আমিন হান্নানের মতে, দেশে আরও বেশি ওপেন মাইক আয়োজন প্রয়োজন। কারণ বিশ্ব জুড়েই স্ট্যান্ডআপ কমেডির প্রথম পাঠ শুরু হয় ওপেন মাইক থেকে। সেখানে দর্শকের প্রতিক্রিয়া দেখে একজন শিল্পী বুঝতে পারেন কোন লেখা কাজ করছে আর কোনটি করছে না।
আবু হেনা রনির মতে, দেশে স্ট্যান্ডআপ কমেডি এখনো নবীন একটি শিল্প। দীর্ঘদিন ধরে দর্শক নাটক, চলচ্চিত্র বা চরিত্রভিত্তিক কৌতুকের সঙ্গে পরিচিত। ফলে একজন মানুষ মঞ্চে দাঁড়িয়ে শুধু কথা বলে দর্শককে হাসাবেন, এই সংস্কৃতি এখনো পুরোপুরি তৈরি হয়নি।
কমেডি ক্লাব
আবু হেনা রনি জানান বিভিন্ন জেলায় কমেডি ক্লাব গড়ে উঠছে, নতুন শিল্পীরা আসছেন এবং করপোরেট শো বাড়ছে।
নাভিদ মাহবুবের দাবি, দেশে স্থায়ী অর্থে স্ট্যান্ডআপ কমেডি ক্লাব বলতে এখনো মূলত নাভিদ’স কমেডি ক্লাব রয়েছে। পাশাপাশি ‘স্ট্যান্ডআপ ঢাকা’ নিয়মিত কমেডি রুম পরিচালনা করছে। যদিও বিভিন্ন জেলায় কমেডি সংগঠন তৈরি হয়েছে, তবে অধিকাংশেরই নিজস্ব স্থায়ী ভেন্যু নেই।
অন্যদিকে আবু হেনা রনি জানিয়েছেন, বাংলাদেশ কমেডি ক্লাব, ফুল অব কমেডি, কমেডি হাউজসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম নতুন শিল্পীদের সুযোগ করে দিচ্ছে।




