অনেকে স্ক্রিপ্ট হাতে পেয়ে আগে সংলাপের সংখ্যা গোনেন

ফজলুর রহমান বাবু
মোহাম্মদ নূরুজ্জামান পরিচালিত ‘মাস্তুল’ চলচ্চিত্রে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন ফজলুর রহমান বাবু। আজ প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাচ্ছে সিনেমাটি। অভিনেতার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মীর রাকিব হাসান
শারীরিকভাবে কেমন আছেন?
মোটামুটি ভালো আছি। বড় একটা অস্ত্রোপচার হয়েছে, তাই এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক বলা যাবে না। চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী বিশ্রাম নিচ্ছি। শরীর অনেকটাই ভালো। তবে এখন শুটিং করছি না। আশা করছি, আর মাসখানেকের মধ্যে আবারও নিয়মিত কাজ শুরু করতে পারব। সে জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত আছি। অভিনয়ই আমার জীবন, তাই দ্রুতই দর্শকের সামনে নতুন কাজ নিয়ে আসতে চাই।
‘মাস্তুল’ মুক্তি পাচ্ছে। প্রচারণা কেমন চলছে?
ভালোই চলছে। গত মঙ্গলবার দর্শক, চলচ্চিত্রকর্মী, আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধবসহ অনেকেই সিনেমাটির বিশেষ প্রদর্শনী দেখেছেন। আমরা তাদের প্রতিক্রিয়া শুনেছি। একটি চলচ্চিত্র নির্মাণের পর দর্শকের সামনে সেটি পৌঁছাতে পারা সবসময়ই আনন্দের বিষয়। এখন অপেক্ষা সাধারণ দর্শকের প্রতিক্রিয়া শোনার।
‘মাস্তুল’ সিনেমায় আপনার কোনো সংলাপ নেই?
মকবুল চরিত্রের সংলাপ নেই ঠিক, কিন্তু সে বোবা নয়। মকবুল কথা বলতে পারে, সব বোঝে, ভালো-মন্দ বিচার করতে পারে। কিন্তু সে খুব কম কথা বলে, অপ্রয়োজনীয় কথা বলা থেকে নিজেকে দূরে রাখে। গল্পের প্রয়োজনে চরিত্রটিকে এভাবেই নির্মাণ করা হয়েছে। সবসময় মনে করি, অভিনয় শুধু সংলাপ বলা নয়। অনেক অভিনয়শিল্পী স্ক্রিপ্ট হাতে পেয়ে আগে সংলাপের সংখ্যা গোনেন। কিন্তু আমরা যারা থিয়েটার থেকে এসেছি, তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলো— চরিত্রের ভেতরের যাত্রা, তার মনস্তত্ত্ব, পরিবর্তন ও অবস্থান। অভিনয় মূলত অ্যাকশন ও রিঅ্যাকশনের শিল্প। তাই সংলাপ না থাকা কখনোই আমার কাছে বাধা ছিল না।
মকবুল চরিত্রটি সম্পর্কে একটু বলুন।
মকবুল একটি জ্বালানিবাহী তেলের ট্যাংকারের বৃদ্ধ পাচক। তার জীবন কেটেছে নদীতে, জাহাজে, বন্দরে। সে অনেক কিছু দেখেছে, অনেক কিছু বুঝেছে। কিন্তু খুব বেশি প্রকাশ করে না। ভেতরে ভেতরে তার একটা নিঃসঙ্গতা আছে, একটা মানবিকতা আছে। গল্পের মধ্যে পথশিশু নূরার সঙ্গে তার যে সম্পর্ক তৈরি হয়, সেটাই মূলত সিনেমার আবেগের জায়গা।
এ চরিত্রে অভিনয়ের অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
নতুন ধরনের অভিজ্ঞতা। কারণ, আমাদের দেশে নদী ও জাহাজকেন্দ্রিক মানুষের জীবন নিয়ে খুব বেশি সিনেমা নির্মাণ হয়নি। এখানে জাহাজের সুকানি, লস্কর, বাবুর্চি— এসব মানুষের জীবন উঠে এসেছে। তারা এক ঘাট থেকে আরেক ঘাটে যায়, পানিতে ভেসে ভেসে জীবন কাটায়, কখনো বন্দরে থামে, আবার যাত্রা শুরু করে। এই জগৎ আমাদের অনেকের কাছেই অচেনা। সেই অচেনা জীবনকে কাছ থেকে দেখা, তাদের বাস্তবতা বোঝার চেষ্টা করা এবং সেই পরিবেশের অংশ হয়ে ওঠা আমার জন্য চ্যালেঞ্জিং ছিল। তবে কাজটি খুব উপভোগ করেছি। চরিত্রটিকে যতটা সম্ভব বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার চেষ্টা করেছি।
মকবুল চরিত্রের সঙ্গে আপনার পরিচয় বা সংযোগ তৈরি হলো কীভাবে?
চরিত্রটি একজন চিত্রনাট্যকারের সৃষ্টি। বাস্তবে হয়তো হুবহু এমন কাউকে দেখিনি। তবে সব চরিত্র কি বাস্তবে দেখা সম্ভব? যদি একজন সৈনিকের চরিত্র করি, তাহলে কি আমাকে যুদ্ধক্ষেত্রে যেতে হবে? বিষয়টি কিন্তু এমন নয়। অভিনয়ের একটি বড় অংশ কল্পনা, পর্যবেক্ষণ ও অনুভবের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। স্ক্রিপ্টে চরিত্রের একটি কাঠামো থাকে। আমরা সেই কাঠামো ধরে চরিত্রের ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করি। তার মনোজগৎ, আচরণ, নীরবতা— এসব বুঝে নিতে হয়। সেভাবেই চরিত্রের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হয়।
চরিত্রটির জন্য আলাদা কোনো প্রস্তুতি নিয়েছিলেন?
অবশ্যই। প্রস্তুতি ছাড়া অভিনয় হয় না। প্রতিটি চরিত্রের জন্যই প্রস্তুতি লাগে। তবে সেটি সবসময় দৃশ্যমান নয়। কখনো পর্যবেক্ষণ করতে হয়, কখনো ভাবতে হয়, কখনো চরিত্রের জীবনকে নিজের ভেতরে তৈরি করতে হয়। মকবুলের ক্ষেত্রেও সেটাই করেছি। যেহেতু সংলাপ ছিল না, তাই অভিব্যক্তি ও শরীরী ভাষার ওপর অনেক বেশি মনোযোগ দিতে হয়েছে।
পথশিশু নূরার সঙ্গে আপনার চরিত্রের সম্পর্ক সিনেমার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তার সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
খুব ভালো। একটি বিষয় অনেকেই জানেন না— এ সিনেমার কাজ শুরু হয়েছিল প্রায় পাঁচ-ছয় বছর আগে। বিভিন্ন কারণে, বিশেষ করে করোনার কারণে এটি তৈরি হতে তিন-চার বছর লেগেছে। ফলে সেই শিশুশিল্পী এখন আর শিশু নেই, বড় হয়ে গেছে। সে কিন্তু বাস্তবের পথশিশু নয়, একজন অভিনেতা। কিন্তু তার অভিনয় এতই সাবলীল ছিল যে, দর্শক বিশ্বাস করবে ছেলেটি সত্যিই ওই পরিবেশে বেড়ে উঠেছে। শুধু নূরা নয়, সিনেমায় এমন অনেকে ছিলেন যারা আসলে বাস্তবের জাহাজকর্মী। তারা নিজেদের চরিত্রেই অভিনয় করেছেন। ফলে আমরা পেশাদার অভিনয়শিল্পীরা তাদের সঙ্গে মিলে সমন্বয় করে নিয়েছি।
শুটিংয়ের কোনো বিশেষ ঘটনা মনে পড়ে?
মজার ঘটনার চেয়ে প্রতিকূলতার কথাই বেশি মনে পড়ে। আমরা যখন শুটিং করছিলাম, তখন হঠাৎ করোনা মহামারী শুরু হয়ে গেল। শুটিং করতে যেতে হচ্ছে, আবার ভয়ও কাজ করছে। মাস্ক পরে, নানা সতর্কতা মেনে কাজ করতে হয়েছে। তারপর লোকেশনও ছিল বিভিন্ন জায়গায়। কোনো দৃশ্য নদীতে, কোনো দৃশ্য বন্দরে, কোনো দৃশ্য অন্য কোথাও। ফলে সবকিছু মিলিয়ে কাজটি শেষ করতে অনেক বেগ পেতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত সিনেমাটির কাজ সম্পন্ন করতে পেরে ভালো লাগছে।
আপনার দৃষ্টিতে ‘মাস্তুল’ কতটা গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র?
একটি বিষয় পরিষ্কার করে বলতে চাই— সিনেমার কাজ শুধু সমাজকে শিক্ষা দেওয়া নয়। অনেক সময় আমরা সিনেমার ওপর অতিরিক্ত দায়িত্ব চাপিয়ে দিই। সিনেমা মূলত বিনোদনের মাধ্যম। একজন পরিচালক তার ভাবনা, অনুভূতি ও গল্প দর্শকের সামনে তুলে ধরেন। তবে ভালো সিনেমা মানুষকে ভাবায়, প্রশ্ন তৈরি করে, নতুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি দাঁড় করায়। ‘মাস্তুল’-এর মধ্যেও নিশ্চয়ই কয়েকটি বার্তা আছে। কারণ, জীবনের প্রতিটি গল্পেই কিছু না কিছু বক্তব্য থাকে। সেগুলো নিজের মতো করে খুঁজে নেবেন দর্শক।




