জহিরের লেখা বইবন্দি থাকবে এটা হতে পারে না

কোহিনূর আক্তার সুচন্দা -শাহাদাত হোসেন সবুজ
আজ শহীদ বুদ্ধিজীবী ও প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার জহির রায়হানের ৯২তম জন্মদিন। চলচ্চিত্রের এই যোদ্ধাকে নিয়ে বলেছেন তার সহধর্মিণী অভিনেত্রী কোহিনূর আক্তার সুচন্দা। শুনেছেন মীর রাকিব হাসান
জহির রায়হান জন্মদিন কীভাবে পালন করতেন?
আমি যতদিন তার সঙ্গে ছিলাম, কোনোদিন দেখিনি বা শুনিনি যে নিজের জন্মদিন পালন করেছেন। তিনি দেশ ও চলচ্চিত্রের মধ্যে এতটাই ডুবে থাকতেন, এসব নিয়ে কেউ বলার সাহসও পেত না। পোশাক, চলাফেরা, খাওয়াদাওয়া— কোনো কিছুতেই তার বিশেষ চাহিদা ছিল না। কাজ ছাড়া তিনি আর কিছুই বুঝতেন না, ভাবতেনও না।
জন্ম ও মৃত্যু দিবসে কেউ কোনো আয়োজন করলে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে?
অনেকেই করে। একসময় জহির রায়হানের জন্মদিন তো দূরের কথা, অন্তর্ধান দিবস নিয়েও পত্রিকায় খুব কম দেখতাম। এখন নতুন প্রজন্ম তার বিষয়ে জানতে চাইছে, সংবাদ হচ্ছে— এটা পরিবারের পক্ষ থেকে ভালো লাগে। জহির নিখোঁজ হওয়ার পর অনেকের মনে হয়েছিল, তিনি চলে গেছেন, তাকে নিয়ে আর কী হবে। কাছের মানুষরাও তেমন কিছু করেনি। এখন অবশ্য অনেক পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছি।
তার উপন্যাস বা গল্প থেকে নতুন প্রজন্ম কাজ করতে চাইলে কী বলবেন?
আমি অবশ্যই সাধুবাদ জানাব এবং সমর্থন করব। তার ছোট গল্প নিয়ে নাটক করার জন্য অনেকে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন, আমি অনুমতিও দিয়েছি। তার লেখা বইবন্দি হয়ে থাকবে, কেউ জানবে না— এটা তো হতে পারে না।
‘লেট দেয়ার বি লাইট’-এর নেগেটিভ বা অন্য কোনো উপকরণ আপনাদের কাছে আছে?
যা আছে, আর্কাইভে। ব্যক্তিগতভাবে এসব সংরক্ষণ করা খুব কঠিন। এফডিসিতে আমার প্রযোজিত সিনেমার অনেক কিছুই নষ্ট হয়ে গেছে। স্বাধীনতার পর প্রায় সাড়ে তিন দশক সিনেমাটির কোনো খোঁজ ছিল না। পরে বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভের গোডাউন থেকে ফুটেজ উদ্ধার করা হয়। কয়েকবার সিনেমাটির কাজ শেষ করার পরিকল্পনা হলেও শেষ পর্যন্ত তা আলোর মুখ দেখেনি। জহির চিত্রনাট্য লিখে সিনেমাটি শুরু করেননি; তাৎক্ষণিক চিন্তা থেকেই নির্মাণ শুরু করেছিলেন। তাই চিত্রনাট্য ছাড়া অসমাপ্ত সিনেমাটি শেষ করা খুব কঠিন। সিনেমাটি সাদাকালো, কিছু অংশ নষ্ট হলেও নেগেটিভ মোটামুটি ভালো ছিল।
অনেকে মনে করেন, জহির রায়হানকে জাতীয়ভাবে স্বীকৃতি দেওয়া উচিত...
আমিও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি। দুটি বিষয়ে বিশেষভাবে বলেছি— জহির রায়হানকে জাতীয়ভাবে স্বীকৃতি দেওয়া এবং তার অমূল্য চলচ্চিত্রগুলো সুন্দরভাবে সংরক্ষণ করা। তার অনেক সিনেমার ভালো প্রিন্ট নেই, নেগেটিভ নষ্ট হয়ে গেছে। কোনো সিনেমার অর্ধেক আছে, অর্ধেক নেই; কোথাও শুধু কয়েকটি গান টিকে আছে। এগুলো সংরক্ষণ করা সরকারের দায়িত্ব। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধ কল্যাণ ট্রাস্টের কাছে আমি বহুবার চিঠি দিয়ে অনুরোধ করেছি।
মুক্তিযুদ্ধের পর জহির রায়হানের সিনেমাগুলোর ক্ষেত্রে কী ঘটেছিল?
জহির বেঁচে নেই বলে তার সব সিনেমার মালিক হঠাৎ সরকার বা অন্য কেউ হয়ে যাবে— এমন কোনো আইনগত বিষয় ছিল না। তার সন্তান আছে, আমি বেঁচে ছিলাম; সেখানে অন্য কেউ মালিক হতে পারে না। কিন্তু বিভিন্ন জায়গায় ও হলে সিনেমা চালিয়ে অর্থ আয় করা হয়েছে, সংরক্ষণের দিকে নজর দেওয়া হয়নি। আমি বহুবার চিঠি লিখেছি, এখনো অনেক চিঠির কপি আমার কাছে আছে। অন্য দেশগুলোয় পুরনো সিনেমা, ক্যামেরা ও যন্ত্রপাতি কী সুন্দরভাবে সংরক্ষণ করা হয়। আমাদের দেশে সেই নিয়ম বা যত্ন নেই।
জহির রায়হানের কোনো চিঠি, নোট, স্ক্রিপ্ট বা শুটিং নোট আপনাদের কাছে ছিল?
২৫ মার্চ রাতে দিলু রোডের ভাড়া বাড়িতে অনেক কিছু ছিল। জহিরকে তখন পাকিস্তানি সেনারা খুঁজছিল। আমরা রাতে বাড়ি থেকে বের হয়ে যাই। পরে জানতে পারি, বের হওয়ার আধা ঘণ্টা পর আর্মি সেখানে যায়। তারা ঘরে ঢুকে আসবাবপত্র, কাগজপত্রসহ মূল্যবান সবকিছু তছনছ করে দেয়। আমার নিজেরও অনেক জিনিস ছিল, সেগুলোও নষ্ট হয়ে যায়।
‘বরফ গলা নদী’ নিয়ে সিনেমা নির্মাণের কথা বলেছিলেন...
অনেক আগেই সিনেমাটি করার পরিকল্পনা করেছিলাম। নানা কারণে করা হয়ে ওঠেনি। কিন্তু সিনেমাটি বানাতে চাই। শরীর ঠিকঠাক থাকলে অবশ্যই নির্মাণ করব। সিনেমাটি বানাতে পারলে আমার জীবনে কোনো আফসোস থাকত না।
জহির রায়হান নিখোঁজ হওয়ার পর আপনার জীবন কীভাবে কেটেছে?
অনেক বছর কাজই করতে পারিনি। অভিনয় করার মানসিকতা বা ইচ্ছা— কিছুই ছিল না। পরে বুঝলাম, এভাবে জীবন চলবে না। সন্তানদের মানুষ করতে হবে, নিজেকেও বাঁচতে হবে। তাই ধীরে ধীরে কাজে ফিরলাম। কিন্তু চলচ্চিত্রে একবার দীর্ঘ বিরতি হলে সেই জায়গা পূরণ করা খুব কঠিন। এখনো আমি ভাড়া বাড়িতে থাকি। আমার ছোট্ট একটি ফ্ল্যাট আছে, সেখানে নাতি-নাতনিদের নিয়ে থাকা সম্ভব নয়।
জহিরের সঙ্গে শেষ দেখা কবে, শেষ কথা কী হয়েছিল?
১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি। পুরান ঢাকার বি কে গাঙ্গুলী লেনের শ্বশুরবাড়িতে আমরা ছিলাম। সকালে নাশতা তৈরি করছিলাম। বাসার কাজের ছেলে এসে জানাল, নিচে আর্মির পোশাক পরা একজন লোক জহিরকে ডাকছেন। জহির না খেয়েই নিচে নেমে গেল। কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে বলল, গাড়িতে পেট্রল নেই, পকেটে টাকা নেই— টাকা দিতে। যাওয়ার সময় আমি বলেছিলাম, চার-পাঁচ দিন ধরে পরা মোজাটা বদলে যেতে। সে বলল, ‘পরে ফেলছি, এখন
সময় নেই। আমি ফিরে এলে তুমি ধুয়ে দিও।’ তারপর টাকা নিয়ে দৌড়ে চলে গেল। সেটাই ছিল আমাদের শেষ দেখা ও শেষ কথা।







