হলিউডের শিশু তারকাদের অকালমৃত্যু, খ্যাতির আড়ালে মাদকের ভয়াবহ থাবা

৩৭ বছর বয়সে পদার্পণ করার মাত্র ৫ দিন আগেই না-ফেরার দেশে পাড়ি জমান হেইডেন পেনেটিয়ের
রুপালি পর্দার ঝকঝকে আলো, লাল গালিচার সংবর্ধনা, কোটি কোটি ভক্তের ভালোবাসা আর অল্প বয়সেই মিলিয়নিয়ার হয়ে যাওয়া— বাইরের দুনিয়া থেকে শিশু তারকাদের জীবনকে মনে হয় স্বপ্নের মতো নিখুঁত।
কিন্তু সেই জাঁকজমকপূর্ণ জীবনের আড়ালে লুকিয়ে থাকে এক অন্ধকার বাস্তবতা। সম্প্রতি জনপ্রিয় মার্কিন অভিনেত্রী হেইডেন পেনেটিয়েরের মাত্র ৩৬ বছর বয়সে আকস্মিক মৃত্যু আবারও উন্মোচিত করে দিয়েছে হলিউডের সেই বিষাক্ত পরিবেশকে, যেখানে সাফল্যের তীব্র চাপের পাশাপাশি শিশুদের হাতে খুব সহজেই পৌঁছে যায় প্রাণঘাতী মাদক।
‘হিরোজ’ খ্যাত অভিনেত্রী হেইডেন পেনেটিয়ারের মৃত্যুর সঠিক কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া না গেলেও, উদ্ধারকারী দলের তথ্য অনুযায়ী অতিমাত্রায় মাদক সেবনের ফলে কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে তার মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। স্থানীয় পুলিশের রিপোর্ট এমনটাই বলছে।
মৃত্যুর মাত্র কয়েক মাস আগে প্রকাশিত তার আত্মজীবনীতে হেইডেন নিজেই লিখেছিলেন, কীভাবে মাত্র ১৬ বছর বয়সে ক্লান্তি কাটাতে তার টিমের এক সদস্য তার হাতে তুলে দিয়েছিল প্রথম ড্রাগ।
তার টিমের একজন সদস্য তার শক্তি ও তেজ বাড়াতে সাহায্য করার জন্য তার হাতে একটি পিল বা বড়ি তুলে দিয়েছিল। হেইডেনের ভাষায়, ‘ট্যাবলেটটি খাওয়ার মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে আমার শরীরে এক নতুন শক্তি চলে এলো। মনে হলো, চমৎকার এক প্রশান্তির ঘুম শেষ করে মাত্রই জেগে উঠলাম।’ সেটিই ছিল তার ধ্বংসের শুরু।
মনোবিজ্ঞানী ও আসক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশু তারকারা শৈশবেই এমন এক জগতে প্রবেশ করে যা কোনো শিশুর মানসিক বিকাশের জন্য উপযুক্ত নয়।
মিসিসিপির ‘অক্সফোর্ড ট্রিটমেন্ট সেন্টার’-এর ডিরেক্টর ড. লুকাস ট্রটম্যানের মতে, শিশু তারকারা খুব অল্প বয়সেই প্রাপ্তবয়স্কদের জীবনের মানসিক আঘাত, কাজের চাপ ও ব্যক্তিগত জীবনের গোপনীয়তা হারানোর মুখোমুখি হয়। তাদের হাতে বিপুল অর্থ ও মাদক পৌঁছালেও, সেটিকে ‘না’ বলার মতো পরিণত মানসিকতা বা সুরক্ষাকবচ তাদের থাকে না।
ক্যামেরার সামনে সারাক্ষণ থাকার কারণে স্বাভাবিক শৈশব বলে কিছু থাকে না শিশু তারকাদের। ব্যর্থতার ভয়, মিডিয়ার ট্রলিং এবং ভক্তদের প্রত্যাশার পারদ মেটাতে গিয়ে তারা ভোগেন চরম হতাশায়।
হেইডেন পেনেটিয়ার নিজেই প্রকাশ করেছিলেন, তার মা মাত্র ১১ মাস বয়স থেকে তাকে দিয়ে অভিনয় করানো শুরু করেন। যখন মা-বাবাই সন্তানের ‘ম্যানেজার’ হয়ে ওঠেন, তখন সম্পর্কের স্বাভাবিক সীমানা মুছে যায় এবং শিশুর মানসিক স্বাস্থ্যের চেয়ে ব্যবসায়িক লাভ বড় হয়ে দাঁড়ায়।
হলিউডে শিশু তারকাদের এভাবে হঠাৎ ঝরে যাওয়া বা মাদকের করাল গ্রাসে নিমজ্জিত হওয়ার ঘটনা এটিই প্রথম নয়। মাত্র ১২ বছর বয়সেই ড্রু ব্যারিমোরকে যেতে হয়েছিল পুনর্বাসন কেন্দ্রে।
বিখ্যাত পপ তারকা ডেমি লোভাটো মাত্র ১৩ বছর বয়সে এক দুর্ঘটনার শিকার হওয়ার পর চিকিৎসায় ব্যবহৃত ব্যথানাশক ওষুধ থেকে মারাত্মক মাদকাসক্ত হয়ে পড়েন।
অন্যদিকে, অভিনেত্রী হেইডেন পেনেটিয়ারের মৃত্যুর কিছুদিন আগেই মারা যান মিশেল ট্র্যাকটেনবার্গ ও ডাভি চেজের মতো জনপ্রিয় দুই প্রাক্তন শিশু তারকা, যারা জীবনভর মদ ও মাদকের মারাত্মক বিষাক্ত প্রভাবের সঙ্গে লড়াই করে গেছেন।
এই ধারাবাহিক মৃত্যুতে উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রখ্যাত অভিনেত্রী মিশেল রদ্রিগেজ আক্ষেপ করে ভ্যারাইটিকে বলেছেন, ‘অল্প বয়সে এভাবে একে একে তরুণদের চলে যাওয়া মোটেই স্বাভাবিক নয়! আমাদের খতিয়ে দেখা দরকার আসলে ঠিক কী ঘটছে।’
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, যখন একজন শিশু তারকার ক্যারিয়ারের ভাটা পড়ে বা জনপ্রিয়তা কমতে থাকে, তখন তারা তীব্র ‘ডোপামিন শর্টেজ’ বা মানসিক শূন্যতায় ভোগেন। সেই শূন্যতা ও বিষাদ পূরণ করতেই তারা মাদকের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। আসক্তি মূলত একটি দীর্ঘস্থায়ী রোগ, যা থেকে পুরোপুরি মুক্তি পাওয়া অত্যন্ত কঠিন।
হেইডেন প্যানেটিয়ারের ভাই জ্যানসেন ২৮ বছর বয়সে অতিরিক্ত মাদক সেবনের কারণে মারা যান। মদ না ছাড়লে প্যানেটিয়ার নিজেও আর মাত্র পাঁচ বছর বাঁচবেন এমনটাই বলেছিলেন চিকিৎসক। পরবর্তীতে ২০২৪ সালে তিনি মদ ও মাদক ছেড়ে সুস্থ জীবনে ফেরার কথা জানান। কিন্তু সে কথা রাখতে পারেনি হেইডেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আসক্তি এমন এক দীর্ঘস্থায়ী ব্যাধি যা পুরোপুরি দূর হওয়া কঠিন এবং যেকোনো সময় মানুষ আবারও এতে আক্রান্ত হতে পারে। তাই শতভাগ নিখুঁত হওয়ার চাপ না নিয়ে প্রতিনিয়ত চেষ্টা চালিয়ে যাওয়াই আসল কথা।
হলিউড হয়তো শিশু তারকাদের পর্দায় অসাধারণ শৈশব ও বিনোদন উপহার দেয়, কিন্তু তার বিনিময়ে কেড়ে নেয় তাদের নিজস্ব শৈশব, মানসিকভাবে সুস্থ থাকার অধিকার এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রাণও।
হেইডেন প্যানেটিয়ারের এই মৃত্যু তাই কেবল একজন তারকার বিদায় নয়, বরং গ্ল্যামার জগতের ভেতরের কঙ্কালসার বিষাক্ত সংস্কৃতির এক নির্মম স্মারক।








