নায়ক-প্রযোজক মিলে বানালেন ভারতের সর্ববৃহৎ অ্যানিমেশন স্টুডিও

স্টুডিওতে কলাকুশলীদের সঙ্গে এস এস রাজামৌলি
হায়দ্রাবাদের অন্নপূর্ণা স্টুডিওতে ‘এ অ্যান্ড এম মোক্যাপ ল্যাব’ নতুন করে চালু হয়েছে। এটি বর্তমানে ভারতের সর্ববৃহৎ এবং সবচেয়ে আধুনিক গতিবিধি ধারণ (মোশন ক্যাপচার) সুবিধা হিসেবে পরিচিত। এখানে শিল্পীরা বিশেষ ধরনের পোশাক পরেন, যার সঙ্গে ছোট ছোট চিহ্ন সংযুক্ত থাকে। তারা স্টান্টসহ নানা শারীরিক ভঙ্গি ও চলন প্রদর্শন করেন। সেই সব নড়াচড়া উচ্চমানের ক্যামেরার মাধ্যমে ধারণ করা হয় এবং সরাসরি ত্রিমাত্রিক কম্পিউটার সৃষ্ট চরিত্রের ওপর স্থানান্তর করা হয়। এরপর চলচ্চিত্র নির্মাতারা প্রয়োজন অনুযায়ী তা ব্যবহার করতে পারেন।
মুখভঙ্গি ধারণ প্রযুক্তির মাধ্যমে অ্যানিমেশন ও গেম শিল্পেও চরিত্রগুলোকে জীবন্ত অভিব্যক্তি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। ভারতে আধুনিক গতিবিধি ধারনের সুবিধা আগে মূলত বেঙ্গালুরু ও মুম্বাইয়ে সীমাবদ্ধ ছিল, যেখানে প্রধানত অ্যানিমেশন ও গেম শিল্পের কাজ হতো। তবে বৃহৎ পরিসরের চলচ্চিত্র, যেমন যুদ্ধদৃশ্য বা ২০-৩০ জনের একসঙ্গে স্টান্ট দৃশ্য ধারনের জন্য প্রয়োজনীয় বিশাল ফ্লোরস্পেস, একাধিক ক্যামেরা ও উন্নত সফটওয়্যার এতদিন দেশে ছিল না।
এই ল্যাব মূলত শুটিং শুরুর আগের পরিকল্পনা পর্যায়ে ব্যবহৃত হয়, যাকে প্রাক-চিত্রায়ণ পরিকল্পনা বলা যায়। এর মাধ্যমে পরিচালনা, অ্যাকশন কোরিওগ্রাফি ও চিত্রগ্রহণের সমন্বয় আগেভাগেই নির্ভুলভাবে করা সম্ভব হয়। ফলে সময় ও ব্যয় দুটোই কমে। আগে এ ধরনের পরিকল্পনায় হাতে আঁকা দৃশ্যপট ব্যবহার করা হতো, এখন কম্পিউটারভিত্তিক প্রযুক্তি কাজটিকে অনেক সহজ ও কার্যকর করেছে।
ল্যাবটি আনুষ্ঠানিকভাবে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে উদ্বোধন করেন নির্মাতা এস এস রাজামৌলি। যদিও ২০২৫ সালের মধ্যভাগ থেকেই এটি কার্যক্রম শুরু করেছিল। স্টুডিওটি যৌথভাবে গড়ে তুলেছে অভিনেতা-প্রযোজক নাগার্জুনা আক্ষিণীর অন্নপূর্ণা স্টুডিও, ‘বাহুবলী’ প্রযোজক শোবু ইয়ারলাগাড্ডার মিহির ভিজ্যুয়াল ল্যাব এবং অ্যানিম্যাট্রিক ফিল্ম ডিজাইন। অ্যানিম্যাট্রিক সেই প্রতিষ্ঠান, যারা হলিউডের ‘অ্যাভেঞ্জার্স’ ও ‘স্পাইডারম্যান: নো ওয়ে হোম’ ছবিতে প্রযুক্তিগত সহযোগিতা করেছে।
৬০ ফুট দৈর্ঘ্য, ৪০ ফুট প্রস্থ ও ৩০ ফুট উচ্চতার এই ল্যাবে রয়েছে ৬০টিরও বেশি উচ্চনির্ভুল গতিবিধি ধারণ ক্যামেরা। এতে তাৎক্ষণিক তথ্য প্রবাহ, ধারণ-পরবর্তী প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থা এবং সরাসরি ত্রিমাত্রিক পূর্বরূপ দেখার সুবিধা রয়েছে। ফলে শিল্পী ও ডিজিটাল পরিবেশের মধ্যে তাৎক্ষণিক সমন্বয় সম্ভব হয়। মাথায় স্থাপনযোগ্য দ্বৈত ক্যামেরা ব্যবস্থার মাধ্যমে মুখের অভিব্যক্তিও উচ্চমানের রেজোলিউশনে ধারণ করা যায়।
শোবু ইয়ারলাগাড্ডা ও রাজামৌলি এর আগে বেঙ্গালুরুতে এই প্রযুক্তি নিয়ে পরীক্ষা চালিয়েছিলেন। ‘বাহুবলী’ ছবির সময় একজন শিল্পীকে গতিবিধি ধারণের জন্য লস অ্যাঞ্জেলেসে পাঠাতে হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই তাঁদের মনে দেশে বড় পরিসরের এমন একটি ল্যাব গড়ে তোলার পরিকল্পনা আসে।
ভারতে প্রথম বাস্তবঘন গতিবিধি ধারণভিত্তিক চলচ্চিত্র ছিল কোচাদাইয়ান, যেখানে অভিনয় করেছিলেন রজনীকান্ত। শোবুর মতে, 'সেই সময় প্রযুক্তি একেবারেই নতুন ছিল। এখন এ ধরনের চলচ্চিত্র অনেক সহজে তৈরি করা সম্ভব।' আন্তর্জাতিকভাবে স্টিভেন স্পিলবার্গ পরিচালিত ‘দ্য অ্যাডভেঞ্চার অব টিনটিন’, পাশাপাশি ‘লাভ, ডেথ অ্যান্ড রোবোটস’ ও ‘সিক্রেট লেভেল’-এ ধরনের কাজের উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
তেলুগুসহ ভারতের অন্যান্য চলচ্চিত্র শিল্পেও গতিবিধি ধারণ প্রযুক্তি নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে। শোবু বলেন, 'মহাবতার নারসিংহর সাফল্য ভারতীয় অ্যানিমেশনের সম্ভাবনা দেখিয়েছে। এখন দেশে উন্নত প্রযুক্তি থাকায় আরও নির্মাতা এটি ব্যবহার করতে আগ্রহী হবেন।'
এই ল্যাবের মাধ্যমে ভারতীয় চলচ্চিত্র ও গেম শিল্পে স্টান্ট, যুদ্ধদৃশ্য, অ্যানিমেশন চরিত্রের জীবন্ত অভিব্যক্তি ও গতিশীলতা তুলে ধরার ক্ষেত্রে বড় এক প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ঘটেছে। এর ফলে নির্মাতারা শুটিংয়ের আগেই আরও নিখুঁত পরিকল্পনা করতে পারবেন এবং ভারতীয় চলচ্চিত্র প্রযোজনায় নতুন মানদণ্ড স্থাপিত হবে।




