চাঁদনীর ৩৫ বছর, কী ছিল এহতেশাম ম্যাজিক?

সিনেমার পোস্টার
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এহতেশাম এক ব্যতিক্রমী নাম। নতুন মুখ আবিষ্কার, দর্শকের রুচি বুঝে গল্প নির্বাচন এবং সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণে তার দক্ষতা তাকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে। শবনম, শাবানা, শাবনাজ ও শাবনূরের মতো অভিনেত্রীদের চলচ্চিত্রজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তার নাম। আর ১৯৯১ সালে মুক্তি পাওয়া ‘চাঁদনী’ বাংলা চলচ্চিত্রে তারুণ্যনির্ভর প্রেমের গল্প ও নতুন জুটির জনপ্রিয়তার ক্ষেত্রে তৈরি করেছিল নতুন আলোচনার ক্ষেত্র।
এহতেশামের পুরো নাম আবু নূর মোহাম্মদ এহতেশামুর রহমান। ১৯২৫ সালের ১২ অক্টোবর ঢাকার বংশালে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার ছোট ভাই চলচ্চিত্র পরিচালক ও প্রযোজক মুস্তাফিজ। চলচ্চিত্র পরিচালক ই আর খান ছিলেন তার মামা।
এহতেশাম সেন্ট গ্রেগরি স্কুলে পড়াশোনা শুরু করেন। পরে আরমানিটোলা স্কুলে লেখাপড়া করেন। এরপর ভারতে সিনিয়র ক্যামব্রিজ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। কর্মজীবনের শুরুতে জিআইপি রেলওয়েতে ট্রাফিক কন্ট্রোলার হিসেবে যোগ দেন। পরে কিংস কমিশনের মাধ্যমে ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে ক্যাপ্টেন পদে যোগ দিয়েছিলেন বলে বিভিন্ন জীবনীমূলক সূত্রে উল্লেখ পাওয়া যায়।
পাকিস্তানের করাচিতে অবস্থানকালে আশিক মল্লিকের ‘বাঘী’ চলচ্চিত্রের শুটিং দেখতে গিয়ে সিনেমা নির্মাণের জগৎ সম্পর্কে তার আগ্রহ তৈরি হয়। পরে চলচ্চিত্র প্রদর্শন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হন তিনি। লালমনিরহাট রেলওয়ে ইনস্টিটিউটের হল ইজারা নিয়ে সিনেমা প্রদর্শনের ব্যবসা শুরু করেন। এরপর নাটোর ও সান্তাহারে প্রেক্ষাগৃহ নির্মাণ করেন। ১৯৫৬-৫৭ সালের দিকে গড়ে তোলেন চলচ্চিত্র পরিবেশনা সংস্থা লিও ফিল্মস। পরে পরিচালক, প্রযোজক ও পরিবেশক হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি কাহিনি, চিত্রনাট্য ও সংলাপও লিখেছেন।
চলচ্চিত্র নির্মাণে যাত্রা
১৯৫৯ সালে এহতেশাম পরিচালনা করেন তার প্রথম চলচ্চিত্র ‘এ দেশ তোমার আমার’। ছবিটিতে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করেছিলেন জহির রায়হান ও কামাল আহমেদ। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের চলচ্চিত্রাঙ্গনে ছবিটি উল্লেখযোগ্য সাড়া ফেলে। পরের বছর মুক্তি পায় ‘রাজধানীর বুকে’। এ দুটি চলচ্চিত্রের সাফল্য তাকে পরিচালক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে সহায়তা করে।
এরপর একের পর এক চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন এহতেশাম। তার উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে ‘হারানো দিন’ (১৯৬১), ‘চান্দা’ (১৯৬২), ‘নতুন সুর’ (১৯৬২), ‘তালাশ’ (১৯৬৩), ‘সাগর’ (১৯৬৫), ‘চকোরি’ (১৯৬৭), ‘পীচঢালা পথ’ (১৯৬৮), ‘চাঁদ আর চাঁদনী’ (১৯৬৮), ‘পায়েল’ (১৯৬৮), ‘আনাড়ি’ (১৯৬৯) ও ‘দাগ’ (১৯৬৯)।
‘চান্দা’কে বাংলাদেশের প্রথম উর্দু ভাষার চলচ্চিত্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়। অন্যদিকে ‘সাগর’ ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে নির্মিত প্রথম দিককার রঙিন চলচ্চিত্রগুলোর একটি। এসব কাজের মধ্য দিয়ে ভাষা, নির্মাণশৈলী ও বিষয়বৈচিত্র্যে এহতেশামের আগ্রহের পরিচয় পাওয়া যায়।
দীর্ঘ বিরতির পর ১৯৮৩ সালে মুক্তি পায় তার পরিচালিত ‘দূরদেশ’। বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত এ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন শশী কাপুর, নাদিম বেগ, শর্মিলা ঠাকুর, ববিতা ও রাজ বব্বর। এরপর ১৯৮৪ সালে মুক্তি পায় ‘শক্তি’।
‘চাঁদনী’ দিয়ে নতুন করে আলোচনায়
এহতেশামের দীর্ঘ চলচ্চিত্রজীবনের অন্যতম আলোচিত কাজ ‘চাঁদনী’। ১৯৯১ সালের ৪ অক্টোবর মুক্তি পাওয়া ছবিটি পরিচালনার সময় তার বয়স ছিল প্রায় ৬৬ বছর। ছবিটি নির্মাণের পরিকল্পনা ও শুটিং শুরু হয়েছিল এর আগে, ১৯৯০ সালের দিকে।
ছবিটিতে নবাগত শাবনাজ ও নাঈমকে জুটি হিসেবে উপস্থাপন করেন এহতেশাম। নতুন দুই মুখকে নিয়ে দর্শক কতটা সাড়া দেবেন, তা নিয়ে সংশয় থাকলেও মুক্তির পর ছবিটি দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। অজন্তা কথাচিত্র নিবেদিত এই চলচ্চিত্র নব্বইয়ের দশকে তরুণ-তরুণীদের প্রেমের গল্পনির্ভর সিনেমার জনপ্রিয়তা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
‘চাঁদনী’র সাফল্যের পর শাবনাজ ও নাঈম ঢালিউডের জনপ্রিয় জুটিতে পরিণত হন। তাদের ঘিরে একাধিক চলচ্চিত্র নির্মিত হয়। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মের অভিনয়শিল্পীদের নিয়ে সিনেমা নির্মাণের আগ্রহও বাড়ে। পরবর্তী সময়ে মৌসুমী, সালমান শাহ ও শাবনূরের মতো শিল্পীদের উত্থানে নব্বইয়ের দশকের এই পরিবর্তনশীল চলচ্চিত্র পরিবেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
কী ছিল এহতেশাম ম্যাজিক?
এহতেশামের চলচ্চিত্রের জনপ্রিয়তা বিশ্লেষণ করতে গেলে প্রথমেই আসে নতুন মুখ আবিষ্কারের প্রসঙ্গ। প্রচলিত তারকাদের বাইরে গিয়ে নতুন শিল্পীদের সুযোগ দেওয়া এবং তাদের দর্শকের সামনে গ্রহণযোগ্য করে তোলার ক্ষেত্রে তিনি বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন। শবনম, শাবানা, শাবনাজ ও শাবনূরের নাম তার সঙ্গে বিভিন্নভাবে যুক্ত। এই চারজনের নাম দিয়েছিলেন এহতেশাম।
চলচ্চিত্র সমালোচকদের মতে, এহতেশামের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল সময়ের দর্শকের চাহিদা অনুধাবন করা। ‘চাঁদনী’র ক্ষেত্রে তিনি তারুণ্যনির্ভর প্রেমের গল্পের সঙ্গে নতুন মুখকে যুক্ত করেছিলেন। এতে দর্শক পরিচিত মুখের বাইরে গিয়ে নতুন এক জুটিকে গ্রহণ করার সুযোগ পান। ছবিটির সাফল্য প্রমাণ করে, নতুন শিল্পীকে সামনে রেখে নির্মিত চলচ্চিত্রও বড় দর্শকগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাতে পারে।
নায়ক-নায়িকার জুটি তৈরির ক্ষেত্রেও তার দক্ষতার পরিচয় পাওয়া যায়। ‘চাঁদনী’তে শাবনাজ ও নাঈমের পর্দার উপস্থিতি এবং তাদের জুটির গ্রহণযোগ্যতা ছবিটির জনপ্রিয়তায় ভূমিকা রাখে। এর সঙ্গে গান, অভিনয়, সংলাপ ও আবেগঘন প্রেমের গল্পের সমন্বয়ও দর্শকের আকর্ষণ বাড়িয়েছিল।
এহতেশাম দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে চলচ্চিত্রের বিভিন্ন ধারায় কাজ করে তিনি সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। ষাটের দশকের চলচ্চিত্র থেকে আশির দশকের যৌথ প্রযোজনা, তারপর নব্বইয়ের দশকের তারুণ্যনির্ভর প্রেমের গল্প, তার কর্মজীবনে এই বৈচিত্র্য লক্ষ করা যায়।
উল্লেখযোগ্য কাজগুলোর সাফল্য বিচার করলে দেখা যায়, নতুন শিল্পী নির্বাচন, গল্পের ধরন, অভিনয়, সংগীত ও সময়োপযোগী উপস্থাপনার সমন্বয় তার চলচ্চিত্রের গ্রহণযোগ্যতায় ভূমিকা রেখেছিল।
এহতেশামের ‘ম্যাজিক’ ছিল নতুন সম্ভাবনা চিনতে পারা এবং সেই সম্ভাবনাকে পর্দায় তুলে ধরার সাহস। ‘চাঁদনী’ সেই দক্ষতার সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণগুলোর একটি। বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে ছবিটি আজও স্মরণীয় হয়ে আছে নতুন জুটি ও তারুণ্যনির্ভর প্রেমের গল্পের জনপ্রিয়তার প্রসঙ্গে।





