‘পায়ের তলায় মাটি নাই’ দেখে মুগ্ধ মেহজাবীন

‘পায়ের তলায় মাটি নাই’ সিনেমার বিশেষ প্রদর্শনীতে মেহজাবীন চৌধুরী । ছবি: অ্যাডফা
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবে প্রশংসিত বাংলাদেশের স্বাধীন চলচ্চিত্র ‘পায়ের তলায় মাটি নাই’-এর বিশেষ প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছে। গত শুক্রবার রাজধানীর নিকেতনে অ্যাডভার্টাইজিং অ্যান্ড ফিল্মমেকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (অ্যাডফা) কার্যালয়ে আয়োজিত এই প্রদর্শনীতে চলচ্চিত্রপ্রেমী, নির্মাতা, অভিনয়শিল্পী এবং বিজ্ঞাপন ও চলচ্চিত্র অঙ্গনের বিভিন্ন ব্যক্তিত্ব অংশ নেন। মাত্র ১০০ টাকা নিবন্ধন ফি দিয়ে দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত ছিল এই আয়োজন।
সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় চলচ্চিত্রটির প্রদর্শনী শুরু হয়। প্রদর্শনী শেষে অনুষ্ঠিত হয় প্রশ্নোত্তর ও উন্মুক্ত আলোচনা পর্ব। এতে অংশ নেন চলচ্চিত্রটির পরিচালক মোহাম্মদ রাব্বি মৃধা, প্রযোজক আবু শাহেদ ইমন এবং অভিনেতা মোস্তফা মনওয়ার। পুরো আলোচনা সঞ্চালনা করেন অ্যাডফা সদস্য নির্মাতা তানভীর আহসান।
আয়োজকদের ভাষ্য, প্রদর্শনীজুড়ে হলজুড়ে ছিল ‘পিন-ড্রপ সাইলেন্স’। দর্শকরা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত গভীর মনোযোগ দিয়ে সিনেমাটি উপভোগ করেন। প্রদর্শনী শেষে গল্প, চরিত্র, নির্মাণশৈলী, প্রতীকী উপস্থাপনা এবং নির্মাণ-প্রক্রিয়া নিয়ে নির্মাতাদের সঙ্গে প্রাণবন্ত আলোচনা করেন উপস্থিত দর্শকরা।
বিশেষ প্রদর্শনীতে সিনেমাটি দেখে নিজের অনুভূতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করেছেন অভিনেত্রী মেহজাবীন চৌধুরী। তার মতে, ‘পায়ের তলায় মাটি নাই’ এমন একটি চলচ্চিত্র, যা শুধু গল্প বলে না, বরং দর্শককে নিজের জীবন ও সিদ্ধান্ত নিয়েও ভাবতে বাধ্য করে। মেহজাবীন লিখেছেন, কিছু সিনেমা কেবল গল্প শোনায়, আর কিছু সিনেমা মানুষকে নিজের ভেতরে তাকাতে শেখায়। তার কাছে ‘পায়ের তলায় মাটি নাই’ ঠিক তেমনই একটি সিনেমা।
চলচ্চিত্রের কেন্দ্রীয় চরিত্র সাইফুল প্রসঙ্গে মেহজাবীন বলেন, তাকে এখানে নায়ক কিংবা খলনায়ক– কোনো একক পরিচয়ে তুলে ধরা হয়নি। বরং তিনি একজন খুব সাধারণ মানুষ, যার লোভ, দুর্বলতা এবং একের পর এক ভুল সিদ্ধান্ত তাকে ধীরে ধীরে এমন এক অবস্থায় নিয়ে যায়, যেখানে সে প্রথম স্ত্রী মিনা এবং দ্বিতীয় স্ত্রী– দুজনকেই ধরে রেখে নিজের জীবন চালিয়ে যেতে চায়।
মেহজাবীনের ভাষায়, এটি যেন একসঙ্গে দুই নৌকায় পা রেখে চলার চেষ্টা। কিন্তু বাস্তব জীবন এভাবে চলে না। একসময় দুই নৌকাই আলাদা হয়ে যায়, আর তখন সাইফুলের দাঁড়িয়ে থাকার মতো কোনো জায়গা অবশিষ্ট থাকে না। সিনেমার নামের ব্যাখ্যাও নিজের দৃষ্টিভঙ্গিতে তুলে ধরেছেন তিনি। তার মতে, ‘পায়ের তলায় মাটি নাই’ শুধু অর্থনৈতিক কিংবা সামাজিক অনিশ্চয়তার প্রতীক নয়। একজন মানুষ যখন নিজের ভুল সিদ্ধান্তের কারণে মানসিকভাবে, নৈতিকভাবে এবং আত্মিকভাবেও দাঁড়ানোর জায়গা হারিয়ে ফেলে, তখনই প্রকৃত অর্থে তার পায়ের তলায় আর মাটি থাকে না।
চলচ্চিত্রটির সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হিসেবে মেহজাবীন উল্লেখ করেছেন দুটি সমান্তরাল সংগ্রামের গল্পকে। একদিকে মিনা প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকার চেষ্টা করে, অন্যদিকে সাইফুল লড়াই করে নিজের ভেতরের লোভ, আকাঙ্ক্ষা এবং দুর্বলতার সঙ্গে। কিন্তু সেই আত্মসংগ্রামে সে শেষ পর্যন্ত জয়ী হতে পারে না। তিনি আরও বলেন, ‘প্রকৃতির ডাককে যতবারই সাইফুল উপেক্ষা করতে চেয়েছে, ততবারই তাকে বিব্রতকর পরিস্থিতি ও অপমানের মুখোমুখি হতে হয়েছে। তার কাছে এই দুই গল্প একই মুদ্রার দুই পিঠের মতো মনে হয়েছে।’
অভিনয় প্রসঙ্গে মেহজাবীন বিশেষভাবে প্রশংসা করেছেন মোস্তফা মনোয়ারের। তার ভাষায়, সাইফুল চরিত্রে তিনি এতটাই স্বাভাবিক অভিনয় করেছেন যে কোথাও মনে হয়নি তিনি অভিনয় করছেন। একইভাবে মিনা চরিত্রে প্রিয়ম আর্চি এবং সাইফুলের দ্বিতীয় স্ত্রীর চরিত্রে দীপান্বিতা মার্টিনের অভিনয়ও তাকে মুগ্ধ করেছে। অনেক অনুভূতি তারা সংলাপ ছাড়াই শুধু চোখের ভাষায় প্রকাশ করেছেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি। নির্মাতা মোহাম্মদ রাব্বি মৃধার প্রশংসা করে মেহজাবীন লিখেছেন, এমন সৎ, সংযত এবং মানুষের জীবনের খুব কাছাকাছি থাকা গল্প আরও নির্মাণ করা উচিত। কারণ এ ধরনের চলচ্চিত্র শেষ হয়ে যাওয়ার পরও দীর্ঘ সময় দর্শকের মনে রয়ে যায়।
সবশেষে বিশেষ প্রদর্শনীর আয়োজনের জন্য অ্যাডফাকে ধন্যবাদ জানিয়ে মেহজাবীন বলেন, যারা এখনো ‘পায়ের তলায় মাটি নাই’ দেখেননি, তারা আইস্ক্রিন অ্যাপে সিনেমাটি দেখতে পারেন। তার বিশ্বাস, এই গল্প দর্শকদেরও ভাবাবে এবং অনেক দিন মনে থেকে যাবে।
অভিনেতা মোস্তফা মনওয়ার বলেন, ‘এই সিনেমায় কাজ করার অভিজ্ঞতা ছিল তার জন্য সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী।’ অন্যদিকে প্রযোজক আবু শাহেদ ইমন বলেন, ‘স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাণ থেকে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব পর্যন্ত পৌঁছানোর পথটি ছিল অত্যন্ত কঠিন।’ তার ভাষায়, পরিচালক মোহাম্মদ রাব্বি মৃধার একাগ্রতা, পরিশ্রম ও সিনেমার প্রতি ভালোবাসাই সিনেমাটিকে আজকের অবস্থানে নিয়ে এসেছে।
অনুষ্ঠান শেষে অ্যাডফার পক্ষ থেকে পরিচালক, প্রযোজক ও অভিনেতাকে সম্মাননা প্রদান করা হয়। অ্যাডফার ওয়ার্কিং মেম্বার মাহমুদুল হাসান আদনান জানান, এই বিশেষ প্রদর্শনী সংগঠনটির নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ। তিনি বলেন, ‘আমরা প্রতি মাসে অন্তত একটি বা দুটি বিশেষ স্ক্রিনিং আয়োজনের চেষ্টা করি। শুধু সিনেমা প্রদর্শন নয়, নির্মাতা, শিল্পী, কলাকুশলী এবং নতুন চলচ্চিত্রকর্মীদের মধ্যে যোগাযোগ তৈরি, চলচ্চিত্র নিয়ে আলোচনা এবং সৃজনশীল চর্চার পরিবেশ গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য।’
অ্যাডফা জানায়, এটি বিজ্ঞাপন ও চলচ্চিত্র নির্মাতাদের একটি পেশাদার সংগঠন, যা নির্মাতাদের দক্ষতা উন্নয়ন, সৃজনশীল বিনিময় এবং চলচ্চিত্র সংস্কৃতির বিকাশে নিয়মিত কাজ করছে। সংগঠনটির কনভেনার আদনান আল রাজীব। ওয়ার্কিং মেম্বার হিসেবে রয়েছেন রাসেল শিকদার, শঙ্খ দাস গুপ্ত, মুস্তাফি শিমুল, সামিউর রহমান, সাবরিনা আইরিন, নিশান মাহমুদ এবং মাহমুদুল হাসান আদনান। সংগঠনের বিভিন্ন কার্যক্রম তারা সম্মিলিতভাবে পরিচালনা করছেন। পরিচালক আদনান আল রাজীব বলেন, ‘নতুন চলচ্চিত্র নির্মাতা বা চলচ্চিত্র-সংশ্লিষ্ট কাজে আগ্রহীদের জন্যও অ্যাডফা একটি উন্মুক্ত প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করছে। এখানে চলচ্চিত্র নিয়ে মতবিনিময়, নেটওয়ার্কিং এবং নতুন উদ্যোগ বাস্তবায়নের সুযোগ রয়েছে।’
অ্যাডফার সদস্যদের মধ্যে বিজ্ঞাপন ও চলচ্চিত্র অঙ্গনের পরিচিত নির্মাতারাও রয়েছেন। তাদের মধ্যে অনম বিশ্বাস, অমিতাভ রেজা চৌধুরী, নুহাশ হুমায়ূনসহ আরও অনেক নির্মাতা সংগঠনটির সঙ্গে যুক্ত থেকে বিভিন্ন কার্যক্রমে পৃষ্ঠপোষকতা ও সহযোগিতা করে থাকেন।
আয়োজকদের প্রত্যাশা, এ ধরনের বিশেষ প্রদর্শনীর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানের বাংলাদেশি চলচ্চিত্র আরও বেশি দর্শকের কাছে পৌঁছাবে, স্বাধীন নির্মাতারা নতুন উৎসাহ পাবেন এবং দেশে বিকল্পধারার চলচ্চিত্রচর্চা আরও সমৃদ্ধ হবে। ভবিষ্যতেও নিয়মিত বিশেষ স্ক্রিনিং, নির্মাতাদের সঙ্গে মুক্ত আলোচনা এবং চলচ্চিত্র উদযাপনের আয়োজন অব্যাহত রাখার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন তারা।
বিশ্বের বিভিন্ন মর্যাদাপূর্ণ চলচ্চিত্র উৎসবে প্রশংসা কুড়ানোর পর গত ৩০ মে ঈদুল আজহা উপলক্ষে আইস্ক্রিনে বিশ্বব্যাপী মুক্তি পায় মোহাম্মদ রব্বী মৃধা পরিচালিত সিনেমাটি। ২০২১ সালে বুসান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে বিশ্ব প্রিমিয়ারের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক যাত্রা শুরু করে এটি। এরপর ভারতের আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব, বেঙ্গালুরু আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব, ওসাকা এশিয়ান চলচ্চিত্র উৎসব, নেপাল আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব ও লন্ডন ইন্ডিয়ান চলচ্চিত্র উৎসবসহ বিশ্বের বিভিন্ন উৎসবে প্রদর্শিত হয় সিনেমাটি।
দীর্ঘ উৎসবযাত্রায় ‘পায়ের তলায় মাটি নাই’ অর্জন করেছে একাধিক আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। জাফনা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে জুরি স্পেশাল মেনশন, নেপাল আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ‘গৌতম বুদ্ধ পুরস্কার’ এবং কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবে ফিপরেসি পুরস্কার জিতে নেয় এই সিনেমা। ২০২৩ সালে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডসে জমা দেওয়া হয়েছিল এটি।








