জন্মশতবর্ষে হ্যারি ডিন স্ট্যান্টন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ভিম
ভেন্ডার্সের যুগান্তকারী রোড মুভি ‘প্যারিস,
টেক্সাস’-এ কেন্দ্রীয় চরিত্রে
অভিনয় করলেও হ্যারির ৯১ বছরের আয়ুষ্কালের
ক্যারিয়ার মূলত কেটেছে পার্শ্বচরিত্রে।
তবু দাপুটে অভিনেতা হিসেবে তিনি স্মরণীয়
হ্যারির সঙ্গে এক মুহূর্ত
অসামান্য ক্যারেক্টার অ্যাক্টররা চলচ্চিত্রের তারকা অভিনেতাকে যেভাবে সমর্থন জোগানোর মাধ্যমে একটি দৃশ্যকে দর্শকের সামনে বাস্তব করে তোলেন, সেটি আমরা হয়তো উপলব্ধি করতে পারি না। তবে সমকক্ষদের কাছ থেকে হ্যারি ডিন স্ট্যান্টনকে যা আলাদা করে দিয়েছে, তা হলো, পার্শ্বচরিত্রের সীমানা ছাড়িয়ে তিনি নিজের অভিনীত প্রতিটি চরিত্রের ভেতর গভীর অকৃত্রিমতা ও হৃদয়বিদারক অনুভূতি এনে দিতে পেরেছেন। সঙ্গে একধরনের অনির্দেশ্য উন্মত্ততাও।
হ্যারির সঙ্গে আমার প্রথম দেখা ‘প্যারিস, টেক্সাস’ চলচ্চিত্রের সেটে, যেখানে ভিম ভেন্ডার্সের অধীনে পাঠ নিচ্ছিলাম। আনুষ্ঠানিকভাবে আমি ছিলাম প্রোডাকশন অ্যাসিস্ট্যান্ট; কিন্তু হাতে ওয়াকিটকি নিয়ে হতোদ্যম হয়ে পড়েছিলাম। কোনো তাড়না পাচ্ছিলাম না। কিন্তু স্বর্ণালি মুহূর্তটি তখনই এলো, যখন ভিম আমাকে চলচ্চিত্রটির তারকা হ্যারি ডিনের কাছে সংলাপ পৌঁছানোর দায়িত্ব দিলেন।
হ্যারি ও আমার— উভয়েরই শিকড় কেন্টাকিতে হলেও আমরা দুজনই বহু বছর আগে সেখান থেকে চলে এসেছি। তবু ওই জায়গার প্রতি আমাদের এক গভীর অনুরাগ, যা শুধু কেন্টাকিবাসীরাই বুঝতে পারবে। আমার দায়িত্বভারের দিনকয়েক হ্যারি ও তার সহশিল্পী ডিন স্টকওয়েলকে তাদের সংলাপ শোনাতাম। নিজের অভিনীত চরিত্র ট্র্যাভিস কেন এ চলচ্চিত্রের বেশিরভাগ অংশেই কোনো কথা না বলে কাটিয়ে দেবে— এ নিয়ে হ্যারি একদিন হতাশায় ডিনের কাছে অসন্তোষ প্রকাশ করলেন। ‘তার মানে কি চরিত্রটি বোবা? অসাড়?’— বললেন তিনি।
তাদের আলাপে নাক গলাতে চাইনি; তবু একটু কেশে, ভীরুভাবে বলেছিলাম, ‘আমার ধারণা, আমিও একবার অসাড় হয়ে পড়েছিলাম।’ মুহূর্তেই ওই দুই পুরুষ আমার দিকে ঘুরে তাকালেন। বললাম, ‘তখন আমার বয়স ছিল পনেরো। এ নিয়ে একটি কবিতাও লিখেছিলাম।’
ডিন জানতে চাইলেন, ‘কবিতাটি সঙ্গে আছে?’
কী কারণে জানি না, তবে কবিতাটি লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে সঙ্গে নিয়ে এসেছিলাম। তাদেরকে দেখানোর পর আমার সেই অভিজ্ঞতা সম্পর্কে একের পর এক প্রশ্ন করলেন হ্যারি।
‘লোকজনের কথা শুনতে পাচ্ছিলে?’
‘হ্যাঁ,’ দিলাম জবাব।
‘কথাগুলো স্বাভাবিক লাগছিল?’
‘তারা আমার সম্পর্কে কী বলছিল, তা-ও শুনতে পাচ্ছিলাম!’
‘অবশেষে যখন কথা বলতে পারলে, তোমার গলা কাঁপছিল?’
‘মোটেই না। গলা একদম স্বাভাবিক ছিল।’
‘লোকগুলোর প্রতিক্রিয়া তখন কেমন ছিল?’
‘ভীষণ শরমে পড়ে গিয়েছিল তারা।’
ডিন ও হ্যারি হো-হো করে হেসে উঠলেন। শেষ পর্যন্ত হ্যারি জানতে চাইলেন, ‘তুমি তাহলে এতক্ষণ চুপ ছিলে কেন?’
বললাম, ‘মনে হয়েছিল, বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে। বহু কিছু বলার ছিল আমার। যদি মুখ খুলতাম, তাহলে ওই অভিজ্ঞতা আসলেই পেতাম না।’
বিচ্ছেদের পর আক্ষেপ করে বলতেন, ‘টম ক্রুজের জন্য আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল রেবেকা’
কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে যখন ‘প্যারিস, টেক্সাস’-এর প্রথম প্রদর্শনী হলো (১৯ মে, ১৯৮৪), আমাকে আবেগাপ্লুত করে গণমাধ্যমের কাছে হ্যারি বলেছিলেন, “এই ফিল্মে এমন ‘একটি মেয়ে’ কাজ করেছিল, যে তার জীবনের এক গল্প আমাকে শুনিয়েছিল, যেটি ট্র্যাভিস চরিত্র গড়ে তুলতে আমাকে সাহায্য করেছে।” ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষায় তিনি আমার নাম নেননি। তবে আমাকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন তখন। এরপর আজীবনই এ কারণে ধন্যবাদ জানানো থামাননি। আমার একটি ব্যক্তিগত তথ্য শোনানোর মাধ্যমে তাকে এমন অকৃত্রিম অভিনয়ে সাহায্য করতে পেরেছি, এ কথা জানা আমার জন্য তখন ছিল বিস্ময়কর; এখনো তা-ই। এ ছিল এক বিরাট উপহার। হ্যারি সেই অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জানতে চাওয়ার এবং সেটিকে নিজের অভিনয়ে ব্যবহার করার আগপর্যন্ত ধারণাও করতে পারিনি, আমার কোনো সত্য একজন অভিনেতাকে তার অভিনীত চরিত্র বেছে নিতে সাহায্য করতে পারে।
যে জীবন তার
হ্যারি ডিন স্ট্যান্টনের জন্ম ১৪ জুলাই ১৯২৬, যুক্তরাষ্ট্রের কেন্টাকির ওয়েস্ট আরভিন শহরে কৃষক বাবা শেরিডান হ্যারি স্ট্যান্টন এবং গৃহিণী মা এর্সেলের সংসারে। এক বছর বয়সে তিনি গান গাইতে শুরু করেন। পরে মা-বাবার ঝগড়া এবং বাবার মারমুখী আচরণ থেকে মুক্তির উপায় হিসেবে বেছে নেন সংগীতকে। প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে একটি ব্যান্ডের প্রধান হিসেবে ওয়েস্টার্ন, মেক্সিকান, রক ও পপ ঘরানার গান পরিবেশন করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নৌবাহিনীতে দায়িত্ব পালনের পর কেন্টাকি ইউনিভার্সিটিতে তিন বছর কাটান এবং কয়েকটি নাটকে অভিনয় করেন। এরপর হলিউডে প্রতিষ্ঠা পেতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে পশ্চিমে পাড়ি জমান। ১৯৫৪ সালে টিভি সিরিজ ‘ইনার স্যাঙ্কটাম’-এ অভিনয়ের মাধ্যমে টেলিভিশনে অভিষেক ঘটে তার। বড় পর্দায় অভিনয় শুরু করেন ১৯৫৭ সালে, লেজলি সেলান্ডার পরিচালিত আমেরিকান ওয়েস্টার্ন ফিল্ম ‘টমাহক ট্রেইল’-এর মাধ্যমে। ১৯৮১ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত হলিউড তারকা রেবেকা ডি মোর্নের সঙ্গে ছিল প্রেমের সম্পর্ক। বিচ্ছেদের পর আক্ষেপ করে বলতেন, ‘টম ক্রুজের জন্য আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল রেবেকা।’ ব্যক্তিজীবনে হ্যারি ছিলেন চিরকুমার। ২০১২ সালে মুক্তি পাওয়া সোফি হুবার পরিচালিত তথ্যচিত্র ‘হ্যারি ডিন স্ট্যান্টন: পার্টলি ফিকশন’-এ ফিল্মমেকার ডেভিড লিঞ্চের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘আজীবন আমি নিঃসঙ্গই থেকে গেলাম।’ ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭, লস অ্যাঞ্জেলেসের সেডারর্স-সিনাই মেডিকেল সেন্টারে মারা যান তিনি।





