মাওরি গথিক সিনেমা

মারামা। চলচ্চিত্রকার: টোরাটোয়া স্ট্যাপার্ড
মাওরি। নিউজিল্যান্ডের আদিবাসী জনগোষ্ঠী। তাদের শিল্প-সংস্কৃতি ঘিরে সম্প্রতি গড়ে উঠেছে এক নতুন ধারার চলচ্চিত্রের চর্চা। নাম ‘মাওরি গথিক সিনেমা’। এটি মূলত ঐতিহ্যবাহী ভিক্টোরিয়ান গথিক হররকে ভেঙে সৃষ্টি হওয়া একটি উপধারা। এর অন্তর্গত চলচ্চিত্রে মাওরি চরিত্র, ঐতিহ্য এবং ঔপনিবেশিকীকরণের ভয়াবহ বাস্তবতাকে ঘিরে আবর্তিত হয় কাহিনি।
বৈশিষ্ট্য অনুসন্ধান: এই ধারার কেন্দ্রে থাকে উপনিবেশবাদের ভৌতিক রূপ সমকালীন দর্শককে দেখানোর প্রচেষ্টা। উপনিবেশকালে এই আদিবাসীদের নিজস্ব সংস্কৃতিকে কীভাবে পদ্ধতিগতভাবে ধ্বংস এবং তাদের পবিত্র নিদর্শনকে চুরি করা হয়েছে, মাওরি গথিক সিনেমার আখ্যানগত কাঠামোতে তা প্রকাশ পায়। পাশাপাশি ঐতিহাসিক বর্ণবাদকে বিবেচনা করা হয় একটি আক্ষরিক দুঃস্বপ্ন হিসেবে। কাহিনির পটভূমি প্রায়ই এমন কেন্দ্রীয় চরিত্রকে ঘিরে আবর্তিত হয়, যে নিজের পরিবারে লুকিয়ে থাকা গোপন তথ্যের ঘটায় উন্মোচন, পূর্বপুরুষদের মানসিক ট্রমার মুখোমুখি দাঁড়ায় এবং নিজের বংশধারা থেকে খুঁজে নেয় শক্তি। তা ছাড়া এ ধারার চলচ্চিত্রের কাহিনি ঐতিহ্যবাহী গথিক ঘরানার মতো নয়। কেননা সে ধরনের কাহিনিতে ভুক্তভোগীরা সম্পূর্ণ অসহায় থাকলেও মাওরি গথিক সিনেমা ঐতিহাসিক ক্ষোভ ও অন্যায়গুলোকে শক্তিশালী ও রক্তক্ষয়ী প্রতিশোধ এবং ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলে।
মারামা বিস্ময়: আর্মোগান ব্যালানটাইনের মিস্ট্রি ড্রামা ‘দ্য স্ট্রেন্থ অব ওয়াটার’ (২০০৯), জেরার্ড জনস্টোনের হরর কমেডি ‘হাউজবাউন্ড’ (২০১৪) কিংবা নিকি ক্যারোর ড্রামা ‘হোয়েল রাইডার’-এর মতো এই শতকের নিউজিল্যান্ডের বেশ কিছু গথিক চলচ্চিত্রে মাওরি লোককথা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়কে ফুটিয়ে তোলা হলেও মাওরি গথিক সিনেমা ধারার প্রথম ও প্রধান উদাহরণ হিসেবে গণ্য করা হয় ‘মারামা’কে। গত বছরের ৫ সেপ্টেম্বর টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রথম প্রদর্শিত এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্ব জুড়ে এ বছরের ১৭ এপ্রিল বাণিজ্যিকভাবে মুক্তি পেয়েছে এটি। টোরাটোয়া স্ট্যাপার্ডের এই চলচ্চিত্রের কেন্দ্রীয় চরিত্র মেরি, যে নিউজিল্যান্ড থেকে ইংল্যান্ডের নর্থ ইয়র্কশায়ারের একটি প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রাসাদে আসে গৃহশিক্ষিকা হিসেবে কাজ করতে। দ্রুতই সে বুঝতে পারে, তার ধনী ইংরেজ নিয়োগকর্তা আসলে মাওরি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের একজন অন্ধ সংগ্রাহক, যার সঙ্গে মেরির পূর্বপুরুষদের একটি রহস্যময় সংযোগ রয়েছে। এই ভয়াবহ ইতিহাসের মুখোমুখি হয়ে সে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া নিজের অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন ক্ষমতাকে জাগিয়ে তোলে। মেরি নামে জড়িয়ে রয়েছে ঔপনিবেশিক পরিচয়; তাই এই নাম ত্যাগ করে ‘মারামা’রূপে আবির্ভূত হয় এবং ঔপনিবেশিকতাবাদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধের উদ্যোগ নেয়।
গথিক বা গা ছমছমে চলচ্চিত্রের অভ্যস্ত হালকা চালের গণ্ডি পেরিয়ে আত্মপরিচয় অনুসন্ধান এবং পূর্বপুরুষদের ওপর ঘটা অন্যায়ের প্রতিশোধ নেওয়ার পাশাপাশি ইতিহাসের সঙ্গে নতুনভাবে বোঝাপড়া করার প্রয়াস হিসেবে মাওরি গথিক সিনেমা বিস্ফোরক এক ধারা হয়ে ওঠার দারুণ আভাস দিচ্ছে, এমনই অভিমত চলচ্চিত্রবোদ্ধাদের।




