খেলা জীবনের চেয়ে বড় নয়

জিয়াউল ফারুক অপূর্ব ও নিলয় আলমগীর
ফুটবল বিশ্বকাপ মানেই আবেগ, উন্মাদনা আর চিরচেনা আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল সমর্থকদের লড়াই। প্রিয় দলের জয় যেমন কোটি সমর্থকের মুখে হাসি ফোটায়, তেমনি পরাজয় ডেকে আনে হতাশা। আর সেই আবেগকে ঘিরেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় ট্রল, কটাক্ষ আর ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের বন্যা। তবে এবারের বিশ্বকাপে ব্রাজিলের বিদায়ের পর যখন অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিপক্ষকে বিদ্রূপ করতে ব্যস্ত, তখন সম্পূর্ণ ভিন্ন বার্তা দিয়েছেন দেশের কয়েকজন জনপ্রিয় অভিনয়শিল্পী। তাদের ভাষ্য, খেলাকে খেলার জায়গাতেই রাখা উচিত; প্রতিপক্ষের কষ্ট নিয়ে উল্লাস নয়, বরং সহমর্মিতা দেখানোই একজন প্রকৃত ক্রীড়াপ্রেমীর পরিচয়।
আর্জেন্টিনার সমর্থক হিসেবে পরিচিত অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরী বলেছেন, ‘কারও পরাজয়ে উন্মাদের মতো উল্লাস করতে হয় না। একজন সত্যিকারের ক্রীড়াপ্রেমী প্রতিপক্ষের কষ্টও উপলব্ধি করতে জানে। সমব্যথী হতে হয়। অন্তত সেটি না পারলে শান্ত থাকতে হয় অথবা সান্ত্বনা দিতে হয়। যেমন ব্রাজিলের পরাজয়ে সত্যিই আমি মর্মাহত হয়েছি। বিন্দুমাত্র উল্লাস করিনি।’
চঞ্চল আরও মনে করেন, বর্তমান প্রজন্মের ফুটবলপ্রেমীরা অত্যন্ত সৌভাগ্যবান। কারণ একই সময়ে নেইমার, ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো, কিলিয়ান এমবাপ্পে ও লিওনেল মেসির মতো কিংবদন্তিদের বিশ্বকাপের মঞ্চে খেলতে দেখার সুযোগ পেয়েছে তারা। তার ভাষায়, হয়তো আগামী বিশ্বকাপে এই তারকাদের অনেককেই আর দেখা যাবে না, কিন্তু তাদের ফুটবলশৈলী এবং অসংখ্য স্মরণীয় মুহূর্ত চিরকাল ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে বেঁচে থাকবে।
এদিকে ব্রাজিলের বিদায়ের পর কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার কয়া ইউনিয়নের ঘোড়াইঘাট এলাকার রতনের মৃত্যুর খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। পরিবারের দাবি, প্রিয় দলের পরাজয় এবং তা নিয়ে চারপাশের কটাক্ষে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন ২১ বছর বয়সী এই তরুণ। ঘটনাটি সামনে আসতেই গভীর শোক প্রকাশ করেন জনপ্রিয় অভিনেতা জিয়াউল ফারুক অপূর্ব। ‘বড় ছেলে’ খ্যাত অভিনেতা বলেন, ‘ব্রাজিল হারায় কুষ্টিয়ার একটা ছেলে আত্মহত্যা করেছে, রেখে গেছে দুই মাসের শিশুসন্তান। এই নিউজটা দেখে ভীষণ কষ্ট পেয়েছি। আপনারা খেলাকে বিনোদন হিসেবে নিন। এখানে হার-জিত থাকবেই। প্রিয় দল জিতলে ভালো লাগবে, হারলে খারাপ লাগবে। তবে সেটি জীবনের থেকে যেন বড় না হয়। কারণ দিনশেষে এটি শুধু একটি খেলা।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত ট্রল ও অপমানজনক আচরণ নিয়েও সতর্ক করেন এই অভিনেতা। তার মতে, ট্রল খেলাধুলার সংস্কৃতির একটি অংশ হতে পারে, কিন্তু সেটি যেন কখনোই কাউকে মানসিকভাবে ভেঙে দেওয়ার কারণ না হয়। তিনি লেখেন, ‘ট্রল খেলার অংশ। তবে অতিরিক্ত ট্রল, অপমান বা হেয় করাও বন্ধ করুন। আপনার কাছে এটি মজা হতে পারে, কিন্তু অন্য কারও জন্য সেটি মানসিকভাবে অনেক কষ্টের কারণ হতে পারে। একটা দল হারলে আবার জিতবে। আজ ট্রফি না পেলে সামনে আবার পাবে। কিন্তু একটি জীবন চলে গেলে সেটি আর কখনো ফিরে আসে না।’
একই বিষয়ে কথা বলেছেন অভিনেতা নিলয় আলমগীর। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ব্রাজিলের পরাজয়ের পর রতনের মৃত্যুর খবর যেমন তাকে ব্যথিত করেছে, তেমনি কিছু মানুষের আচরণও হতাশ করেছে। তিনি উল্লেখ করেন, কোথাও একটি কুকুরকে ব্রাজিলের জার্সি পরিয়ে বিদ্রূপ করা হয়েছে, আবার কোথাও একটি গরুর শরীরে ব্রাজিলের পতাকা এঁকে সেটি নিয়ে উপহাস করা হয়েছে।
নিলয়ের ভাষ্য, ‘আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল সমর্থকদের মধ্যে ট্রল বহুদিনের সংস্কৃতি এবং সেটি আনন্দের অংশও হতে পারে। তবে সেই আনন্দ যেন সীমা অতিক্রম না করে। তিনি মনে করেন, খেলাকে কেন্দ্র করে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক, কিন্তু সেই আনন্দ যদি কাউকে অপমান, হেয় বা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে, তাহলে সেটি আর সুস্থ সমর্থনের মধ্যে পড়ে না।’





