বিশ্বমঞ্চের স্বীকৃতি পেল চলনবিলের ‘ভাসমান স্কুল’

ছবি: আগামীর সময়
বর্ষার দিনে চারদিকে শুধু পানি আর পানি। গ্রামের মেঠোপথ, স্কুলে যাওয়ার রাস্তা, বাজারের সংযোগ—সবই ডুবে যায় অথৈ জলে। এমন বাস্তবতায় বছরের পর বছর শিক্ষার বাইরে থেকে যেত চলনবিল অঞ্চলের হাজারো শিশু। কিন্তু সেই জলাবদ্ধতাকেই সুযোগে পরিণত করে একদল স্বপ্নবাজ মানুষ তৈরি করেছেন ভাসমান স্কুল। আর সেই ব্যতিক্রমী উদ্যোগই এবার এনে দিল বিশ্বস্বীকৃতি।
বাংলাদেশের চলনবিল অঞ্চলে শিক্ষা পৌঁছে দেওয়ার অনন্য উদ্যোগের জন্য সিধুলাই স্বনির্ভর সংস্থা পেয়েছে মর্যাদাপূর্ণ ইউনেসকো কনফুসিয়াস সাক্ষরতা পুরস্কার-২০২৫।
শিক্ষা, প্রযুক্তি ও স্থানীয় বাস্তবতাকে একসূত্রে গেঁথে গড়ে তোলা এই উদ্যোগকে বিশ্বের অন্যতম উদ্ভাবনী সাক্ষরতা কর্মসূচি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেসকো।
ইউনেসকোর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বুধবার রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে তরুণ দলের কাছে পুরস্কারটি তুলে দেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ।
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, দেশের বৃহত্তম জলাভূমি চলনবিলে বর্ষাকালে কয়েক মাস ধরে যোগাযোগব্যবস্থা কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। অনেক শিশু নিয়মিত বিদ্যালয়ে যেতে পারে না, ফলে ঝরে পড়ার হারও বেড়ে যায়। এই বাস্তবতা থেকে জন্ম নেয় ভিন্নধর্মী এক ধারণা, স্কুলে না গিয়ে যদি স্কুলই শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছে যায়। সেই ভাবনা থেকেই তৈরি হয় সৌরশক্তিচালিত ভাসমান বিদ্যালয়। স্থানীয় কারিগরদের তৈরি বিশেষ নৌকাগুলোই হয়ে ওঠে শ্রেণিকক্ষ, গ্রন্থাগার, কম্পিউটার ল্যাব ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র।
চলনবিলের বুকে শিক্ষার আলো ‘সিধুলাইয়ের ৫৬টি’ নৌকা
বর্তমানে সিধুলাইয়ের বহরে রয়েছে ৫৬টি নৌকা। এর মধ্যে ২৬টি ভাসমান শ্রেণিকক্ষ, ১০টি ভাসমান গ্রন্থাগার ও কম্পিউটার ল্যাব, ৮টি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং অন্যান্য নৌকা স্বাস্থ্যসেবা, খেলাধুলা ও পরিবহন কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রতিদিন এসব নৌকা জলপথে ঘুরে ঘুরে শিশুদের শিক্ষা, বই, প্রযুক্তি ও নানা সেবার সুযোগ পৌঁছে দেয়। ফলে বর্ষা আর শিক্ষার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না।
সিধুলাই স্বনির্ভর সংস্থার নির্বাহী পরিচালক স্থপতি মোহাম্মদ রেজোয়ান জানালেন, যে সমস্যার মুখোমুখি একটি সম্প্রদায় প্রতিদিন হয়, সেই সমস্যার সবচেয়ে কার্যকর সমাধানের ধারণাও প্রায়শই সেই সম্প্রদায়ের মধ্য থেকেই আসে। এই স্বীকৃতি ভবিষ্যতে আরও মানুষের কাছে পৌঁছানোর অনুপ্রেরণা।
ইউনেসকো কনফুসিয়াস পুরস্কার
১৯৬৭ সাল থেকে ইউনেসকো সাক্ষরতা ক্ষেত্রে উৎকর্ষের জন্য এই আন্তর্জাতিক পুরস্কার দিয়ে আসছে। চীন সরকারের আর্থিক সহায়তায় গঠিত ‘ইউনেসকো কনফুসিয়াস সাক্ষরতা পুরস্কার’র অর্থমূল্য ৩০ হাজার মার্কিন ডলার (৩৬ লাখ ৮৪ হাজার টাকা)। ২০২৫ সালে বাংলাদেশের সিধুলাই ছাড়াও আয়ারল্যান্ডের ‘ন্যাশনাল অ্যাডাল্ট লিটারেসি এজেন্সি (নালা)’ এবং মরক্কোর শিক্ষা মন্ত্রণালয় এই পুরস্কার লাভ করে।
বাংলাদেশ থেকে এর আগে ২০১৩ সালে ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন এবং ২০২৩ সালে ফ্রেন্ডশিপ এই মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক পুরস্কার অর্জন করেছিল।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ পুরস্কার তুলে দেন। অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ব্যুরো অব নন-ফরমাল এডুকেশনের (বিএনএফই) মহাপরিচালক দেবব্রত চক্রবর্তী, ক্যাম্পের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী এবং ইউনেসকো ঢাকার শিক্ষা প্রধান নোরিহিদে ফুরুকাওয়া।
ববি হাজ্জাজের ভাষ্য, জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ ও দুর্গম এলাকায় শিক্ষা পৌঁছে দিতে এ ধরনের কার্যক্রম শুধু শিক্ষায় অন্তর্ভুক্তিই বাড়ায় না, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আরও সক্ষম ও আত্মবিশ্বাসী করে তুলতে সহায়তা করে। সরকার এ ধরনের কার্যকর উদ্যোগকে উৎসাহিত ও সম্প্রসারণে কাজ করছে।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে ইউনেসকোর প্রতিনিধি ও অফিসপ্রধান ড. সুসান ভাইজ বললেন, সাক্ষরতা শুধু পড়তে ও লিখতে শেখার বিষয় নয়, এটি মানুষকে তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সমাজে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের সক্ষমতা দেয়।




