এইচএসসিতে ইংরেজি-গণিতে ফেলের পরীক্ষা ডিসেম্বরে

প্রতীকী ছবি
পাবলিক পরীক্ষায় এক বা দুই বিষয়ে ফেল করা শিক্ষার্থীদের জন্য দ্রুত পুনঃপরীক্ষার সুযোগ তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর অংশ হিসেবে চলতি বছরের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় ইংরেজি ও গণিতে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের ডিসেম্বরের মধ্যে আবার পরীক্ষা নেওয়ার পরিকল্পনা করছে শিক্ষা বোর্ডগুলো। আগামী নভেম্বর থেকে ফরম পূরণের প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। প্রাথমিকভাবে ফরম পূরণ থেকে শুরু করে পরীক্ষা নেওয়া, উত্তরপত্র মূল্যায়ন ও ফল প্রকাশ— পুরো প্রক্রিয়া এক মাসের মধ্যে শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ উদ্যোগ সফল হলে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ারও সুযোগ পেতে পারেন।
গতকাল সোমবার আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির এক সভায় এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে ইংরেজি ও গণিতের পাশাপাশি তৃতীয় কোনো বিষয়েও পুনঃপরীক্ষার সুযোগ দেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে আলোচনা হলেও হয়নি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত।
এ বিষয়ে কথা হলো আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয়ক ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আখতারুজ্জামানের সঙ্গে। তিনি আগামীর সময়কে বললেন, ‘আপাতত গণিত ও ইংরেজি— এ দুটি বিষয়ে পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তৃতীয় একটি বিষয় যুক্ত করার বিষয়ে আলোচনা হলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিন একটি গাইডলাইন দিয়েছেন। সেই আলোকে আমরা কাজ করছি।’
আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভায় ছিলেন এমন কয়েকজন জানিয়েছেন, নভেম্বর মাসে পুনঃপরীক্ষা আয়োজনের প্রক্রিয়া শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। সব শিক্ষা বোর্ড থেকে একযোগে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর ফরম পূরণের জন্য এক সপ্তাহ সময় দেওয়া হতে পারে। পরীক্ষার্থীর সংখ্যা বিবেচনায় প্রতিটি উপজেলায় একটি করে পরীক্ষাকেন্দ্র করার প্রাথমিক চিন্তা রয়েছে। তবে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি হলে কোনো কোনো উপজেলায় সর্বোচ্চ দুটি কেন্দ্র করা হতে পারে। ফরম পূরণ, পরীক্ষা গ্রহণ, উত্তরপত্র মূল্যায়ন ও ফল প্রকাশের পুরো প্রক্রিয়া সর্বোচ্চ এক মাসের মধ্যে শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
পুনঃপরীক্ষা দ্রুত আয়োজনের জন্য মূল পরীক্ষার প্রশ্নপত্র তৈরির সময়ই অতিরিক্ত এক সেট প্রশ্নপত্র তৈরি করে রাখার বিষয়টি বিবেচনায় রেখেছেন আন্তঃশিক্ষা বোর্ডসংশ্লিষ্টরা। মূল পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর অনুত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নতুন করে ফরম পূরণ করিয়ে সীমিতসংখ্যক কেন্দ্রে পরীক্ষা নেওয়া হতে পারে। এরপর দ্রুত উত্তরপত্র মূল্যায়ন করে ফল প্রকাশ করা হবে।
তবে পুনঃপরীক্ষায় অংশগ্রহণের যোগ্যতা, বিষয় নির্বাচন, পরীক্ষার সময়সূচি, ফল প্রকাশের পর পরবর্তী শিক্ষাবর্ষে ভর্তি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ কীভাবে সমন্বয় করা হবে— সেসব বিষয় চূড়ান্ত নীতিমালায় স্পষ্ট করতে হবে। শিক্ষা বোর্ডগুলোর কর্মপরিকল্পনা ও মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের পরই এ বিষয়ে বিস্তারিত জানা যাবে।
২০২৭ সাল থেকে তিন মাসের মধ্যে পুনঃপরীক্ষা
এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের জন্য তিন মাসের মধ্যে পুনঃপরীক্ষার সুযোগ চালুর নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এক্ষেত্রে সব বিষয়ে নয়, শুধু যে বিষয়ে বা বিষয়গুলোতে শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছেন, সেগুলোতেই পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে শিক্ষা বোর্ডগুলোর প্রস্তুতি, পরীক্ষা আয়োজনের সময়সূচি ও প্রয়োজনীয় নীতিমালা প্রণয়নের বিষয় বিবেচনায় নিয়ে সাধারণভাবে এ ব্যবস্থা ২০২৭ সাল থেকে চালুর চিন্তা করা হচ্ছে। এ বিষয়ে কর্মপরিকল্পনা তৈরি করে আগামী ১৫ অক্টোবরের মধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দিতে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটিকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কর্মপরিকল্পনার ভিত্তিতে পরবর্তী সময়ে নীতিমালা প্রণয়ন করা হতে পারে।
জানা গেল, শিক্ষা মন্ত্রণালয় চলতি বছর থেকেই তিন মাসের মধ্যে পুনঃপরীক্ষার ব্যবস্থা চালু করতে চেয়েছিল। তবে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি, পরীক্ষার সময় নির্ধারণ, ফরম পূরণ এবং ফল প্রকাশের জন্য পর্যাপ্ত সময় না থাকায় এ বছরই পুরো ব্যবস্থাটি কার্যকর করা কঠিন বলে মনে করছে শিক্ষা বোর্ডগুলো।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আখতারুজ্জামান বললেন, ‘যেহেতু চলতি বছর এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল হওয়ার পর কলেজে ভর্তি কার্যক্রমও শেষ হয়ে গেছে, তাই এবার এ স্তরে এই পদ্ধতি চালু সম্ভব হবে না। তবে আগামী বছর থেকে এসএসসি ও এইচএসসি দুই স্তরের শিক্ষার্থী পুনঃপরীক্ষার সুযোগ পাবে। অনুত্তীর্ণ শিক্ষার্থীরা যেন দুই-তিন মাসের মধ্যে আবার পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পায়, সে বিষয়ে তারাও উদ্যোগী। ১৫ অক্টোবরের মধ্যে কর্মপরিকল্পনা জমা দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।’
এর আগে গত শনিবার রাজধানীর এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিন বলেছিলেন, কোনো বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের এক বছর অপেক্ষা না করিয়ে তিন মাসের মধ্যে আবার পরীক্ষার সুযোগ দেওয়া যায় কি না, তা সরকার ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় এ বিষয়ে নতুন কর্মপদ্ধতি তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
এক বছর অপেক্ষায় থাকে ঝরে পড়ার শঙ্কা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মজিবুর রহমান এ উদ্যোগকে খুবই ভালো বলে উল্লেখ করলেন। তিনি বলছিলেন, ‘একজন শিক্ষার্থী যে কারণেই হোক, এক বা দুই বিষয়ে ফেল করার কারণে এক বছর অপেক্ষা করানো যুক্তিযুক্ত নয়। কারণ, এক বছর অপেক্ষা করতে গিয়ে অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। কেউ পড়াশোনা ছেড়ে দেয়, আবার কেউ কর্মজীবনে প্রবেশ করে। এতে ঝরে পড়ার ঝুঁকি বাড়ে। দ্রুত পুনঃপরীক্ষার সুযোগ চালু হলে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারবে।’
ইংরেজি ও গণিতে ফেল করা শিক্ষার্থীদের এক বছর অপচয় বা পড়াশোনা থেকে ঝরে পড়া থেকে রক্ষা করতে এর আগে ২০১৯ সালের দিকে তৎকালীন শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে পাবলিক পরীক্ষায় (বিশেষ করে এসএসসিতে এক বা দুটি বিষয়ে অকৃতকার্যদের জন্য) স্বল্পতম সময়ে মান উন্নয়ন বা সুনির্দিষ্ট বিষয়ে বিশেষ পরীক্ষা নেওয়ার নানা প্রস্তাব ও প্রাথমিক আলোচনা উঠেছিল। ওই সময় পূর্ণাঙ্গ রূপ না পেলেও বর্তমান সরকারের সময়ে এসে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা উপদেষ্টার নির্দেশনায় এটিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়ে স্থায়ী নীতিমালায় রূপান্তরের এই জোরালো প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে জানালেন শিক্ষা বোর্ডসংশ্লিষ্টরা।



