শরীফ কমিশন থেকে শিক্ষানীতি ২০১০
শিক্ষার দরজা খুলেছে সমান সুযোগ কি মিলেছে
- শিক্ষার বিস্তার হলেও কাটেনি বৈষম্য

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
শিক্ষায় অধিকার কি সবার, নাকি তা শুধু সামর্থ্যবানদের জন্য? বাংলার মাটিতে প্রশ্নটি উঠেছিল ১৯৬২ সালে। এরপর পেরিয়েছে ছয় দশকের বেশি সময়। কিন্তু পুরোপুরি হারায়নি প্রশ্নটি। তখন আপত্তি ছিল শিক্ষার ব্যয় বাড়ানোর বিরুদ্ধে, দাবি ছিল গণমুখী ও বৈষম্যহীন শিক্ষার। আজ শিক্ষার দরজা অনেক বেশি মানুষের জন্য খুলেছে, বিনামূল্যে বই ও উপবৃত্তি মিলছে, বেড়েছে বিদ্যালয় ও শিক্ষার্থীর সংখ্যা, এসেছে প্রযুক্তির ব্যবহারও। কিন্তু মানসম্মত শিক্ষা পাওয়ার সেই সুযোগ কি সবার সমান হয়েছে? সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ব্যবধান, শহর-গ্রামের বৈষম্য, কোচিং-নির্ভরতা, শিক্ষক সংকট, প্রশিক্ষণের ঘাটতি, শিক্ষার সঙ্গে কর্মসংস্থানের অসামঞ্জস্য এবং নানা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ— সে প্রশ্নটিই আবার সামনে আনছে। ফলে শিক্ষা আন্দোলনের ৬৪ বছর পরও শিক্ষা দিবসকে শুধু কাগজে দিবস নয়, বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার আয়নায় দেখার পরামর্শ শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের।
তৎকালীন পাকিস্তানে শিক্ষার ব্যয়, বৈষম্য ও শরীফ শিক্ষা কমিশনের বিভিন্ন সুপারিশের বিরুদ্ধে পথে নামেন শিক্ষার্থীরা। ১৯৬২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর তাদের ডাকা হরতাল, মিছিল ও প্রতিবাদ কর্মসূচিতে গুলি চালায় পুলিশ। শহীদ হন নবকুমার স্কুলের ছাত্র বাবুলসহ তিনজন। তাদের আত্মত্যাগের স্মরণে বাংলাদেশে দিনটি পালিত হয় ‘শিক্ষা দিবস’ হিসেবে।
কোথা থেকে শুরু এই ক্ষোভের, তা জানতে যেতে হবে ১৯৫৮ সালে। পাকিস্তানের সামরিক শাসক আইয়ুব খান শিক্ষা সচিব এস এম শরীফের নেতৃত্বে গঠন করে শিক্ষা কমিশন। ১৯৫৯ সালে প্রকাশিত কমিশনের প্রতিবেদনে শিক্ষার ব্যয় নিয়ে এমন কিছু সুপারিশ ছিল, যা সাধারণ মানুষের জন্য শিক্ষাকে আরও ব্যয়বহুল করে তুলতে পারে— এমন আশঙ্কা তৈরি হয়। প্রতিবেদনে শিক্ষা সস্তায় পাওয়া সম্ভব নয় এবং অবৈতনিক শিক্ষার ধারণাকে অবাস্তব কল্পনা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষায় ফি বাড়ানোর প্রস্তাবের পাশাপাশি দুই বছরের ডিগ্রি কোর্সকে তিন বছর করার সুপারিশও শিক্ষার্থীদের ক্ষুব্ধ করে। এর প্রতিবাদে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামেন।
সেই উত্তাল দিনে কথা স্মরণ করে ৬২-এর শিক্ষা আন্দোলনের সংগঠক ও জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০ প্রণয়ন কমিটির সদস্য অধ্যক্ষ কাজী ফারুক আহমেদ বললেন, ‘সেই শিক্ষানীতির প্রতিবাদে রাজপথে নেমে আমরা সেই নীতি রুখে দিয়েছিলাম। কিন্তু ৬৪ বছর পর স্বাধীন বাংলাদেশে গণমুখী শিক্ষার প্রসার, শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ বন্ধ, বৈষম্যবঞ্চনা নিরসন এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের স্বার্থ সংরক্ষণে আমরা কতটা সফল হয়েছি— সে প্রশ্নই এখন সামনে আসছে। এখনো শিক্ষাক্ষেত্রে মোটাদাগে ১৩ ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এসব চ্যালেঞ্জ দ্রুত সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।’
বাংলাদেশ কলেজ শিক্ষক সমিতি ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট টেনে বর্তমান দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় বিরাজমান ১৩টি মুখ্য চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করেছে।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক বলছিলেন, ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলনের সময়কার শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে বর্তমান বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার তুলনা করলে ব্যাপক পরিবর্তন দেখতে পাবেন। শিক্ষার সুযোগ, অবকাঠামো, পাঠ্যপুস্তক ও প্রযুক্তির ব্যবহারসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে। তবে পরিবর্তনের পাশাপাশি শিক্ষার মানোন্নয়ন ও বিদ্যমান সমস্যাগুলো সমাধানে আমাদের আরও কাজ করতে হবে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, স্বাধীন বাংলাদেশে শিক্ষায় বড় দাগে কাজ হয়েছে ৯০-এর দশকের পর। প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার হাত ধরে প্রথমবারের মতো নারী শিক্ষার ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। এরপর ২০১০ সাল থেকে প্রথম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত সব শিক্ষার্থীকে বছরের প্রথম দিনে বই দেওয়ার উদ্যোগ ছিল প্রশংসনীয়। তারপরও শিক্ষার মান, শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, পাঠদানের দক্ষতা, মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। আরেকটি বড় সংকট শিক্ষার সঙ্গে কর্মসংস্থানের সম্পর্ক। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, কারিগরি ও কর্মমুখী শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের আগ্রহ ধরে রাখা এবং পরিবর্তনশীল কর্মবাজারের সঙ্গে পাঠ্যক্রমের সমন্বয় করতে পারছে না শিক্ষার্থীরা। একইভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনিয়ম, দুর্নীতি, রাজনৈতিক প্রভাব, স্বজনপ্রীতি কিংবা প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতার অভিযোগও শিক্ষার পরিবেশকে প্রশ্নের মুখে ফেলে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি ড. মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর মতে, ‘শিক্ষা দিবস শুধু অতীতের তিন শহীদের স্মরণ করার দিন নয়, এটি বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থাকে আয়নায় দেখারও দিন। আজকের বাংলাদেশে শিক্ষার্থীর হাতে বই আছে, প্রযুক্তি আছে, বিদ্যালয়ে যাওয়ার সুযোগ আগের চেয়ে বেশি। কিন্তু সেই শিক্ষা তাকে কতটা চিন্তাশীল, দক্ষ, সৃজনশীল ও কর্মক্ষম করে তুলছে সেটিই এখন মূল প্রশ্ন।’



