বাংলাদেশে শিক্ষাব্যবস্থায় নারীবান্ধব পরিবেশ: একটি পর্যালোচনা

অধ্যাপক তাহমিনা আখতার
বাংলাদেশে নারীশিক্ষার অগ্রগতি আমাদের নিঃসন্দেহে এমন এক নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখায়— যেখানে শিক্ষিত, দক্ষ ও আত্মনির্ভর নারীরা দেশের অর্থনীতি, সমাজ ও নেতৃত্বে সমান অংশীদার হয়ে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন। কয়েক দশক আগেও অনেক পরিবারে মেয়েদের উচ্চশিক্ষা ছিল দূরের স্বপ্ন। সেই বাস্তবতা অনেকটাই বদলেছে। এখন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নারীদের উপস্থিতি দৃশ্যমান; তারা চিকিৎসা, প্রকৌশল, বিজ্ঞান, ব্যবসা, আইনসহ প্রায় সব ক্ষেত্রেই নিজেদের অবস্থান তৈরি করছেন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাওয়া আর নিরাপদ, বৈষম্যহীন ও সমান সুযোগের পরিবেশে উচ্চশিক্ষা শেষ করতে পারা এক বিষয় নয়।
ইউনেস্কো ইনস্টিটিউট ফর স্ট্যাটিস্টিকের ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষায় মোট গ্রস অংশগ্রহণের অনুপাত ২৩ দশমিক ৭ শতাংশ আর নারীদের ক্ষেত্রে তা ২০ দশমিক ৮ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে নারীশিক্ষায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও, উচ্চশিক্ষায় পৌঁছানো এবং সেখানে টিকে থাকার পথে এখনো অনেক বাধা রয়েছে। এই বাধার শুরুটা অনেক সময় হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের দরজায় পৌঁছানোর আগেই। দরিদ্র ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য উচ্চশিক্ষার ব্যয় শুধু ভর্তি বা টিউশন ফি নয়। এর সঙ্গে রয়েছে আবাসন, যাতায়াত, খাবার, বই, ইন্টারনেট, ল্যাপটপ ও অন্যান্য শিক্ষা উপকরণের ব্যয়। সীমিত আয়ের পরিবারে আজও কোনো কোনো ক্ষেত্রে ছেলের উচ্চশিক্ষাকে ভবিষ্যতের ‘বিনিয়োগ’ হিসেবে দেখা হলেও, মেয়ের ক্ষেত্রে বিয়ে ও পারিবারিক দায়িত্ব পালনের বিষয়টি সামনে চলে আসে। ফলে মেধা ও আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও অনেক নারী উচ্চশিক্ষার সুযোগ থেকে পিছিয়ে পড়েন। এর সঙ্গে রয়েছে বাল্যবিয়ের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব। বাংলাদেশ মাল্টিপল ইনডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে-২০২৫ অনুযায়ী, ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের ৪৭ দশমিক ২ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই আর ১৩ দশমিক ৪ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৫ বছরের আগে। যে বয়সে একজন তরুণীর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের প্রস্তুতি নেওয়া, নিজের বিষয় নির্বাচন করা এবং ভবিষ্যৎ পেশার স্বপ্ন গড়ার কথা— সেই বয়সেই অনেকে সংসার ও পারিবারিক দায়িত্বের মধ্যে আটকে পড়ছেন। বিয়ের পর পড়াশোনার সুযোগ থাকলেও সন্তান, পরিবার ও সামাজিক প্রত্যাশা অনেক নারীর উচ্চশিক্ষার ধারাবাহিকতাকে কঠিন করে তোলে।
বাংলাদেশে নারীশিক্ষার বিস্তারে যিনি অপরিসীম ও অসামান্য অবদান রেখেছেন, তিনি হলেন গণতন্ত্রের অতন্দ্র প্রহরী, আপসহীন নেত্রী প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়া। তিনি ১৯৯০ সালে সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা প্রবর্তনের লক্ষ্যে আইন প্রণয়ন করেন এবং ১৯৯২ সাল থেকে তা কার্যকর হয়। নারীশিক্ষা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এবং স্কুল থেকে ঝরে যাওয়ার প্রবণতা বন্ধের লক্ষ্যে উপবৃত্তি কার্যক্রম গ্রহণ করেন। শিক্ষা উপকরণ প্রদান, কাজের বিনিময়ে শিক্ষা কর্মসূচি বিশেষ সুযোগ-সুবিধাসহ নানাবিধ প্রণোদনামূলক কার্যক্রম গ্রহণ করেছিলেন।
লেখক : উপাচার্য, রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ।



