ভেঙে পড়ল এক কৃষ্ণচূড়া, নুয়ে পড়ল হাজারো স্মৃতি

কিছু গাছ শুধু গাছ নয়, তারা একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নীরব ইতিহাস। শত শত ক্লাস, অপেক্ষা, প্রেম, আড্ডা, আন্দোলন আর অসংখ্য ছবির পটভূমি হয়ে তারা প্রজন্মের পর প্রজন্মকে আগলে রাখে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সত্যেন্দ্রনাথ বসু বিজ্ঞান ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সেই বিশাল কৃষ্ণচূড়া ছিল ঠিক তেমনই এক জীবন্ত স্মৃতিস্তম্ভ।
গতকাল রবিবার গভীর রাতে হঠাৎ দুমড়ে-মুচড়ে ভেঙে পড়ে গাছটি। ভোরের আলো ফুটতেই শিক্ষার্থীরা দেখেন, যে গাছের ছায়ায় তারা অসংখ্য দুপুর কাটিয়েছেন, সে আজ নিথর হয়ে মাটিতে শুয়ে আছে। মুহূর্তেই সামাজিকমাধ্যম ভরে ওঠে শোক, বিস্ময় আর স্মৃতিচারণে।
চৈত্রের প্রখর রোদে ক্লান্ত পথিককে শীতল ছায়া দিত এই কৃষ্ণচূড়া। আবার জ্যৈষ্ঠ এলে সবুজ পাতার ভিড়ে লাল ফুলের উচ্ছ্বাসে যেন পুরো ক্যাম্পাস রাঙিয়ে তুলত। অনেকের কাছে এটি ছিল দেখা করার ঠিকানা, কারও কাছে নির্জন বসে থাকার আশ্রয়, আবার কারও কাছে বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের সবচেয়ে প্রিয় দৃশ্য।
সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক সালেহ হাসান নকীব লিখেছেন, ‘প্রায় সাইত্রিশ বছরের স্মৃতি। আজ ভেঙে পড়ল। খুব মিস করব।’
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী কামরুল হাসান লিখেছেন, ‘তুমি শতবর্ষী হও বা চিরযৌবনা। এক দিন ঠিকই মাটিতে নুয়ে পড়তে হবে।’
রাকসুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক তোফায়েল আহমেদ তোফা বললেন, ‘প্রচারের সময় এই গাছই আমাকে ছায়া দিত। আজ মনে হচ্ছে গোটা ক্যাম্পাসই যেন শোকে মলিন।’
উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এ এইচ এম মাহবুবুর রহমান জানালেন, গাছটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার শুরুর দিকেই রোপণ করা হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। দীর্ঘ বয়সের কারণে এর মূল দুর্বল হয়ে পড়ে। ওপরের বিস্তৃত শাখা-প্রশাখার অতিরিক্ত ভার আর কাণ্ডের ভেতরে পোকামাকড়ের ক্ষয়ের ফলে শেষ পর্যন্ত সেটি ভেঙে যায়।
তিনি বললেন, অনুকূল পরিবেশ ও সঠিক পরিচর্যা পেলে একটি কৃষ্ণচূড়া ১০০-২০০ বছর পর্যন্তও বেঁচে থাকতে পারে।
আজ গাছটি নেই। কিন্তু তার ছায়ায় লেখা গল্পগুলো রয়ে গেছে। রয়ে গেছে পুরনো অ্যালবামের ছবিতে, বন্ধুদের আড্ডায়, প্রেমের স্মৃতিতে এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের হৃদয়ে। কিছু অনুপস্থিতি কখনো শূন্য হয় না, তারা স্মৃতি হয়ে আরও গভীরভাবে বেঁচে থাকে।







