নবম থেকে এসএসসি, মাঝপথে উধাও লাখো শিক্ষার্থী!

ছবি: আগামীর সময়
নবম থেকে এসএসসিতে টানা ১০-১২ বছর পড়ার টেবিলে থেকে পাবলিক পরীক্ষার রেজিস্ট্রেশন করেও অজানা কারণে পরীক্ষার হলে লাখো শিক্ষার্থী ‘অদৃশ্য’। এ ঘটনার কারণ উদ্ঘাটনে দেশব্যাপী অনুসন্ধানী জরিপ ও গবেষণায় নামছে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড। বাংলাদেশ পরীক্ষা উন্নয়ন ইউনিটের (বেডু) মাধ্যমে ঝরে পড়া ও ছিটকে যাওয়া শিক্ষার্থীর হার, এর কারণ ও প্রতিরোধে ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ করবে সংস্থাটি।
শিক্ষা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীন দুই বছর আগে (২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষ) নিয়মিত শিক্ষার্থী হিসেবে নিবন্ধন করে ১৩ লাখ ৩৪ হাজার ৩৩৩ জন। এবারের এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার জন্য ফরম পূরণ করেছে ১১ লাখ ৫ হাজারের বেশি। সে অনুযায়ী, ২ লাখ ২৮ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী এবার পরীক্ষা দিচ্ছে না। তারা ঝরে যাওয়া বা আগের ক্লাসে থেকে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে দুই বছর আগে নিয়মিত শিক্ষার্থী হিসেবে নিবন্ধন করে ৩ লাখ ৭৮ হাজার শিক্ষার্থী। পরীক্ষা দিচ্ছে ২ লাখ ৩৬ হাজারের বেশি। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে ২ বছর আগে নিবন্ধন করে ১ লাখ ৮৩ হাজার শিক্ষার্থী। তবে তাদের মধ্যে পরীক্ষা দিচ্ছে এক লাখ ছয় হাজারের বেশি।
অতীতে ঝরে পড়ার প্রধান কারণ হিসেবে ঢালাওভাবে শুধু আর্থিক অসচ্ছলতাকে দায়ী করা হতো। কিন্তু ২০২৫ সালে এসএসসিতে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের ওপর একটি পাইলট জরিপ চালায় ঢাকা শিক্ষা বোর্ড। সেখানে দেখা যায়, পরীক্ষায় অনুপস্থিত ৪২ শতাংশ শিক্ষার্থীর পড়াশোনা বন্ধই হয়েছে বাল্যবিয়ের কারণে, যার ৯৭ শতাংশই মেয়ে। এরপর রয়েছে পারিবারিক অসচ্ছলতার জন্য কাজে যোগদান করাসহ অন্যান্য। সেই জরিপের সূত্র ধরেই চলতি বছর সারা দেশে জরিপ চালানোর উদ্যোগ নিয়েছে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড।
২০২৫ সালে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এসএসসিতে পরীক্ষা না দেওয়ার কারণ হিসেবে ‘বিয়ে’ এসেছে এক জরিপে। ১৩টি জেলায় জরিপ চালিয়ে দেখা যায়, ৪২ শতাংশ শিক্ষার্থী অনুপস্থিত ছিল বিয়ে হয়ে যাওয়ার কারণে। এর মধ্যে ৯৭ শতাংশই মেয়ে, যার ৮৭ শতাংশ গ্রামাঞ্চলের, বাকি ১৩ শতাংশ শহর অঞ্চলের। এই জরিপ সবার চোখ খুলে দেয়।
অতীতে আর্থিক অসচ্ছলতাকে ঝরে পড়ার কারণ বলা হলেও বিয়ের কারণটি সামনে এসেছে। বিভাগীয় ঝরে পড়ার হারে শীর্ষে মানবিক বিভাগ, ৬৮ শতাংশ। ব্যবসায় ২৪ এবং বিজ্ঞান বিভাগে ১০ শতাংশ। বাল্যবিয়ের ঝুঁকিতে মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীরাই এগিয়ে। ১ হাজার ৩৫০ অনুপস্থিত পরীক্ষার্থীর কাছে জানতে চাওয়া হয় পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী? তাদের প্রায় ৫১ শতাংশ বলেছেন, আর পড়াশোনা করবেন না। যারা বলেছেন আর পড়াশোনা করবেন না, তাদের মধ্যে ৭৪ শতাংশ হচ্ছে মেয়ে শিক্ষার্থী।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সচিব অধ্যাপক এস এম কামাল উদ্দিন হায়দার আগামীর সময়কে বললেন, ‘১০-১২ বছর পড়াশোনা করে পরীক্ষায় এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর হারিয়ে যাওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এ নিয়ে এর আগে কোনো জাতীয় পর্যায়ের অনুসন্ধান হয়নি। শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার প্রকৃত কারণ বের করে কী ধরনের পদক্ষেপ নিলে এ হার কমিয়ে আনা যাবে, তার জন্য সুপারিশ করে সরকারের কাছে পাঠানো হবে।’
তবে এ সংখ্যাকে পুরোপুরি ঝরে পড়া হিসেবে দেখতে নারাজ ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান ও আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান। তিনি আগামীর সময়কে বললেন, নিবন্ধিত সব শিক্ষার্থীই ঝরে পড়ে না। অনেকে ব্যক্তিগত বা অ্যাকাডেমিক কারণে এক বছর বিরতি (গ্যাপ) দিয়ে পরের বছর পরীক্ষায় অংশ নেন।
এত অল্প সময়ের মধ্যে শিক্ষা থেকে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়াকে দেশের জন্য ‘অশনিসংকেত’ হিসেবে আখ্যা দিলেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক মনজুর আহমেদ। তিনি এ সামাজিক ব্যাধি থেকে শিক্ষাব্যবস্থা রক্ষায় সবাইকে একজোট হয়ে কাজ করতে পরামর্শ দেন।
বিস্তারিত প্রতিবেদন পড়ুন আজকের আগামীর সময়ে প্রকাশিত প্রতিবেদন





