এসএসসি থেকে এইচএসসি
মাঝপথেই হারিয়ে যাচ্ছে ৪৭ শতাংশ শিক্ষার্থী
- কারণ উদ্ঘাটনে নামছে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড ও বেডু
- চলতি বছর রেকর্ডসংখ্যক ঝরেছে সর্বোচ্চ ৩৬ শতাংশ
- পাইলট জরিপে ঝরে পড়ার প্রধান কারণ বাল্যবিয়ে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
২০২৪ সালে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও চলতি বছরে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেননি ৭ লাখ ২৪ হাজার ২১০ শিক্ষার্থী, যা মোট উত্তীর্ণের ৪৩ দশমিক ৩১ শতাংশ। ২০১৭ থেকে ২০২৬ সাল— এই ১০ বছরে এ স্তরে নিবন্ধিত ১ কোটি ৪৫ লাখ শিক্ষার্থীর মধ্যে চূড়ান্ত পরীক্ষা থেকে ছিটকে গেছে ৩৬ লাখ ৪০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী। অর্থাৎ এসএসসি থেকে এইচএসসির গণ্ডি পার হতে পারেনি— এমন সংখ্যা গড়ে ২৫ শতাংশের বেশি। চলতি বছর ৩৬ শতাংশ ঝরে পড়ার রেকর্ড গড়েছে সর্বোচ্চ। প্রাথমিক সমাপনীর পর ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত ছিটকে পড়ার হার ৫২ দশমিক ২২ শতাংশ।
এটি শুধু এইচএসসির চিত্র নয়, নবম থেকে এসএসসিতেও একই চিত্র। টানা ১০-১২ বছর পড়ার টেবিলে থেকে পাবলিক পরীক্ষার রেজিস্ট্রেশন করেও অজানা কারণে পরীক্ষার হলে লাখো শিক্ষার্থী ‘অদৃশ্য’। এ ঘটনার কারণ উদ্ঘাটনে দেশব্যাপী অনুসন্ধানী জরিপ ও গবেষণায় নামছে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড। বাংলাদেশ পরীক্ষা উন্নয়ন ইউনিটের (বেডু) মাধ্যমে ঝরে পড়া ও ছিটকে যাওয়া শিক্ষার্থীর হার, এর কারণ ও প্রতিরোধে ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ করবে সংস্থাটি।
এ নিয়ে জরিপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, অতীতে ঝরে পড়ার প্রধান কারণ হিসেবে ঢালাওভাবে শুধু আর্থিক অসচ্ছলতাকে দায়ী করা হতো। কিন্তু ২০২৫ সালে এসএসসিতে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের ওপর একটি পাইলট জরিপ চালায় ঢাকা শিক্ষা বোর্ড। সেখানে দেখা যায়, পরীক্ষায় অনুপস্থিত ৪২ শতাংশ শিক্ষার্থীর পড়াশোনা বন্ধই হয়েছে বাল্যবিয়ের কারণে, যার ৯৭ শতাংশই মেয়ে। এরপর রয়েছে পারিবারিক অসচ্ছলতার জন্য কাজে যোগদান করাসহ অন্যান্য। সেই জরিপের সূত্র ধরেই চলতি বছর সারা দেশে জরিপ চালানোর উদ্যোগ নিয়েছে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সচিব অধ্যাপক এস এম কামাল উদ্দিন হায়দার আগামীর সময়কে বললেন, ‘১০-১২ বছর পড়াশোনা করে পরীক্ষায় এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর হারিয়ে যাওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এ নিয়ে এর আগে কোনো জাতীয় পর্যায়ের অনুসন্ধান হয়নি। শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার প্রকৃত কারণ বের করে কী ধরনের পদক্ষেপ নিলে এ হার কমিয়ে আনা যাবে, তার জন্য সুপারিশ করে সরকারের কাছে পাঠানো হবে।’
১০ বছরে ঝরে গেল ৩৬ লাখ শিক্ষার্থী: ২০১৭ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত এইচএসসি পরীক্ষার নিবন্ধন করেও চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ নেননি, এমন শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩৬ লাখ ৪০ হাজার ৯৮৫। বোর্ডের তথ্য বলছে, তারা নিয়মিত শিক্ষার্থী হলেও পরীক্ষা থেকে ছিটকে পড়েছে। ২০১৭ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত সময়ে নিবন্ধিত ১ কোটি ৪৫ লাখ ১১ হাজার ৪৩ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে গড় ঝরে পড়ার হার ২৫ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ। ১০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ঝরেছে চলতি বছর, মোট ৩৬ শতাংশ। এর আগে ২০২৩ সালে ২৯ দশমিক ৮৬ শতাংশ নিয়ে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ছিল। বাকি বছরগুলোয় ঝরে পড়ার হার ছিল ২০ শতাংশের ঘরে।
প্রাথমিক থেকে দ্বাদশ পর্যন্ত ঝরে গেল ১৩ লাখ শিক্ষার্থী: একজন শিক্ষার্থীর আনুষ্ঠানিক অ্যাকাডেমিক রেকর্ড শুরু হয় পঞ্চম শ্রেণি থেকে। চলতি বছর যারা এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন, তারা প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় (পিইসি) উত্তীর্ণ হন ২০১৮ সালে। ওই বছর ২৬ লাখ ৫২ হাজার ৬০৯ শিক্ষার্থী পাস করলেও ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন ১২ লাখ ৬৭ হাজার ৪৮৬ জন। অর্থাৎ অাট বছরের শিক্ষাযাত্রায় ঝরে গেছে ১৩ লাখ ৮৫ হাজার ১২৩ শিক্ষার্থী, যা ২০১৮ সালের প্রাথমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর ৫২ দশমিক ২২ শতাংশ। এ ঘটনা উদ্বেগের বিষয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে ঝরে পড়ার মূলে রয়েছে শিখন ঘাটতিসহ নানা অসংগতি, যা সরকার মুখে স্বীকার করতে চায় না— এমনটাই মনে করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) অধ্যাপক মজিবুর রহমান। তিনি আগামীর সময়কে বললেন, সরকার বাল্যবিয়ে বা বিদেশ যাওয়ার দোহাই দিয়ে মূলত সেই ব্যর্থতা আড়াল করতে চাচ্ছে। তার মতে, বিদ্যালয়ে শিক্ষার পরিবেশ নেই, আনন্দ নেই। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোয় দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা বাধ্যতামূলক করলেও আমাদের দেশে মাধ্যমিক স্তরটি সবচেয়ে বেশি অবহেলিত। শিক্ষক সংকট থেকে শুরু করে এই স্তরে রয়েছে নানামুখী ঘাটতি ও উদাসীনতা। তিনি আরও বললেন, কোন স্তরে ঠিক কী কারণে শিক্ষার্থীরা ঝরে পড়ছে, তা নিখুঁতভাবে জানার জন্য এক দশক আগে ‘ইউনিক আইডি’ প্রকল্প নেওয়া হলেও তা পুরোপুরি আলোর মুখ দেখেনি। ফলে প্রকৃত কারণ ট্র্যাক করা যাচ্ছে না এবং শিক্ষা প্রশাসন সবকিছু অনুমাননির্ভর তথ্য দিয়ে চালাচ্ছে।
ঝরে পড়ার ৯৭ শতাংশই মেয়ে, শীর্ষে বাল্যবিয়ে: ২০২৫ সালে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এসএসসিতে পরীক্ষা না দেওয়ার কারণ হিসেবে ‘বিয়ে’ এসেছে এক জরিপে। ১৩টি জেলায় জরিপ চালিয়ে দেখা যায়, ৪২ শতাংশ শিক্ষার্থী অনুপস্থিত ছিল বিয়ে হয়ে যাওয়ার কারণে। এর মধ্যে ৯৭ শতাংশই মেয়ে, যার ৮৭ শতাংশ গ্রামাঞ্চলের, বাকি ১৩ শতাংশ শহর অঞ্চলের। এই জরিপ সবার চোখ খুলে দেয়। অতীতে আর্থিক অসচ্ছলতাকে ঝরে পড়ার কারণ বলা হলেও বিয়ের কারণটি সামনে এসেছে। বিভাগীয় ঝরে পড়ার হারে শীর্ষে মানবিক বিভাগ, ৬৮ শতাংশ। ব্যবসায় ২৪ এবং বিজ্ঞান বিভাগে ১০ শতাংশ। বাল্যবিয়ের ঝুঁকিতে মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীরাই এগিয়ে। ১ হাজার ৩৫০ অনুপস্থিত পরীক্ষার্থীর কাছে জানতে চাওয়া হয় পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী? তাদের প্রায় ৫১ শতাংশ বলেছেন, আর পড়াশোনা করবেন না। যারা বলেছেন আর পড়াশোনা করবেন না, তাদের মধ্যে ৭৪ শতাংশ হচ্ছে মেয়ে শিক্ষার্থী।
দুই বছরে ঝরে গেল ৭ লাখ ২৪ হাজার শিক্ষার্থী: আন্তঃশিক্ষা বোর্ডের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয় ১৬ লাখ ৭২ হাজার ১৫৩ শিক্ষার্থী; যার মধ্যে একাদশে নিয়মিত শিক্ষার্থী হিসেবে নিবন্ধন (রেজিস্ট্রেশন) করেন ১৪ লাখ ৯১ হাজার ৮৭২ জন। অর্থাৎ এসএসসি পাস করেও একাদশে ভর্তি হননি ১ লাখ ৮০ হাজার ২৮১ জন। নিবন্ধিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে এইচএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণ করেছেন ৯ লাখ ৪৭ হাজার ৯৪৩ জন। এসএসসি থেকে এইচএসসি— এই দুই বছরে শিক্ষার মূল স্রোতধারা থেকে ছিটকে গেছেন ৭ লাখ ২৪ হাজার ২১০ জন, যা মোট উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর ৪৩ দশমিক ৩১ শতাংশ।
তবে এ সংখ্যাকে পুরোপুরি ঝরে পড়া হিসেবে দেখতে নারাজ ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান ও আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান। তিনি আগামীর সময়কে বললেন, নিবন্ধিত সব শিক্ষার্থীই ঝরে পড়ে না। অনেকে ব্যক্তিগত বা অ্যাকাডেমিক কারণে এক বছর বিরতি (গ্যাপ) দিয়ে পরের বছর পরীক্ষায় অংশ নেন।
এত অল্প সময়ের মধ্যে শিক্ষা থেকে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়াকে দেশের জন্য ‘অশনিসংকেত’ হিসেবে আখ্যা দিলেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক মনজুর আহমেদ। তিনি এ সামাজিক ব্যাধি থেকে শিক্ষাব্যবস্থা রক্ষায় সবাইকে একজোট হয়ে কাজ করতে পরামর্শ দেন।




