জবিতে ‘ধারকর্জের’ ক্লাসরুম
- ১৫ বছরেও নিজস্ব ক্লাসরুম পায়নি আইন ও বিচার বিভাগ
- তুলনামূলক সাহিত্য ও সংস্কৃতি ইনস্টিটিউটে ৭ ব্যাচের ক্লাস হয় দুই কক্ষে

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও গবেষণার পরিধি বাড়াতে একের পর এক নতুন বিভাগ এবং ইনস্টিটিউট চালু হলেও বাড়েনি প্রয়োজনীয় শ্রেণিকক্ষ ও শিক্ষকের সংখ্যা। দীর্ঘদিন ধরে এ অবস্থার মধ্যেই কষ্টেসৃষ্টে চলছে শিক্ষা কার্যক্রম। বিশ্ববিদ্যালয়ে হাজার কোটির নানা উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়া হলেও সংকটে থাকা বিভাগগুলোর জন্য কোনো অ্যাকাডেমিক ভবন বা কক্ষের জায়গা হয়নি।
৬ বিভাগে ক্লাসরুম সংকট: বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, আইন ও বিচার বিভাগ, তুলনামূলক সাহিত্য ও সংস্কৃতি ইনস্টিটিউট এবং ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের চারটি বিভাগেই এই সংকট প্রকট। কোথাও অন্য বিভাগের শ্রেণিকক্ষ ধার করে, আবার কোথাও দূরে অবস্থিত জহির রায়হান মিলনায়তনে নেওয়া হয় ক্লাস। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) নিয়মানুযায়ী প্রতি ২০ শিক্ষার্থীর অনুপাতে একজন শিক্ষক থাকার কথা থাকলেও বাস্তবতা নেই বেশিরভাগ বিভাগে। পর্যাপ্ত স্থায়ী শিক্ষকের অভাবে কোনো কোনো বিভাগকে পুরোপুরি নির্ভর করতে হচ্ছে অতিথি শিক্ষকদের ওপর। অতিথি শিক্ষকদের পড়ানোর মান ও আন্তরিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন শিক্ষার্থীরা।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ে যে উপাচার্যই দায়িত্বে আসেন, তিনিই সংকট নিরসনের আশ্বাস দেন, কিন্তু বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যায় না। অন্যদিকে প্রভাবশালী রাজনৈতিক শিক্ষকদের প্রভাবের কারণে কিছু বিভাগ সুবিধা পেলেও গুরুত্বপূর্ণ অন্য বিভাগগুলো উপেক্ষিত থাকছে।
অন্য বিভাগের আইনের পাঠদান, ১২ শিক্ষকের ৯ জনই শিক্ষাছুটিতে: ২০১১ সালে আইন অনুষদের অধীনে আইন ও বিচার বিভাগ চালু হলেও ১৫ বছরেও নিজস্ব কোনো শ্রেণিকক্ষ পায়নি বিভাগটি। সমাজবিজ্ঞান অনুষদ ভবনে শিক্ষকদের বসার জন্য শুধু কয়েকটি কক্ষ রয়েছে। ছয়টি ব্যাচের ৩৭০ শিক্ষার্থীকে পড়াশোনা চালাতে হচ্ছে অন্যান্য বিভাগের কক্ষ ধার করে কিংবা জহির রায়হান মিলনায়তনে। বিভাগের স্নাতকোত্তর পর্বের শিক্ষার্থী ওসমান সরদার বলেছেন, ‘অনেক সময় আমরা যে বিভাগের কক্ষ ধার নিই, তাদের নিজস্ব শিক্ষার্থীরা চলে এলে ক্লাসের মাঝপথেই আমাদের বের হয়ে যেতে হয়।’
টিচিং শাখার তথ্যমতে, ১২ জন স্থায়ী শিক্ষকের মধ্যে ৯ জনই শিক্ষাছুটিতে। ফলে সিংহভাগ পাঠদান চলছে অতিথি শিক্ষকদের মাধ্যমে। শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, অতিথি শিক্ষকরা সপ্তাহে এক দিন এসে টানা তিন ঘণ্টার ক্লাস নেন, যা মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষেত্রে বেশ কষ্টকর। আবার কোনো শিক্ষক আসতে না পারলে পাঠসূচি পিছিয়ে যায়। অনুষদের ডিন অধ্যাপক মো. রবিউল ইসলাম জানিয়েছেন, আইন শিক্ষার উপযুক্ত পরিবেশ বিভাগকে দেওয়া হয়নি। উপরন্তু আইন শিক্ষার জন্য অত্যাবশ্যকীয় ‘মুট কোর্ট’ বা ছায়া আদালতেরও কোনো ব্যবস্থা নেই।
ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদেও চরম দুরবস্থা: ২০০৯ সালে যাত্রা শুরু করা ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের অধীনে বর্তমানে চারটি বিভাগে ১ হাজার ৪৫৩ শিক্ষার্থী। তবে পুরো অনুষদের জন্য শ্রেণিকক্ষ রয়েছে ১২টি। নেই কোনো সেমিনার কক্ষ, কমনরুম কিংবা পর্যাপ্ত শিক্ষক কক্ষ। ডিন অধ্যাপক আবু সাইফ মো. মুনতাকিমুল বারী বলেছেন, ‘মূলত ৯টি রুমের সঙ্গে একটি পরিত্যক্ত ভবন সংস্কার করে ক্লাস নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু সেটির পলেস্তারা খসে পড়া ও বর্ষায় ছাদ চুইয়ে পানি পড়ার মতো সংকট রয়েছে। পরীক্ষা চললে নিয়মিত ক্লাস বন্ধ রাখতে হয়।’
দুটি শ্রেণিকক্ষে সিএলসির সাত ব্যাচ: ২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠিত তুলনামূলক সাহিত্য ও সংস্কৃতি ইনস্টিটিউটে (সিএলসি) বর্তমানে সাতটি ব্যাচে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২৪৫। কিন্তু আল-বেরুনী হলসংলগ্ন একটি পুরনো ভবনে এই ইনস্টিটিউটের নিজস্ব শ্রেণিকক্ষ আছে মাত্র দুটি। স্থায়ী শিক্ষক আছেন ছয়জন। ফলে একটি বর্ষের ক্লাস বা পরীক্ষা চললে অন্য বর্ষের শিক্ষার্থীদের বাইরে অপেক্ষা করতে হয়। বাধ্য হয়ে প্রায় ১ কিলোমিটার দূরের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের একটি ল্যাব ধার করে চালাতে হচ্ছে ক্লাস। তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী নাজমুস সাকিব বলছেন, ‘একেক সময় একেক জায়গায় গিয়ে ক্লাস করতে প্রচুর সময় নষ্ট হয় ও ভোগান্তি বাড়ে।’
উন্নয়ন প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী মো. নাসির উদ্দিন বলেছেন, ‘২০১৪ সালে উন্নয়ন প্রস্তাব (ডিপিপি) প্রস্তুত হয়েছে। আমি এর পর দায়িত্বে এসে যা পেয়েছি, সেভাবেই কাজ করেছি। ভবিষ্যতে নতুন প্রকল্প হলে বিষয়টি দেখা হতে পারে।’
উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল আহসান বলছেন, ‘সাময়িক সমাধানের অংশ হিসেবে ক্লাসগুলো আপাতত লেকচার থিয়েটার বা অন্য ভবনে স্থানান্তরিত করা হচ্ছে। তবে স্থায়ী সমাধানের জন্য নতুন একটি ডিপিপি প্রস্তুত করছি, যেন মন্ত্রণালয় থেকে আলাদা ভবনের বাজেট পাস করিয়ে আনা যায়।’





