সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
সবাইকে বাঙালি বানাতে গেলে ভুল হবে

ছবি: আগামীর সময়
বাংলাদেশকে ‘জাতিরাষ্ট্র’ হিসেবে দেখার যে ধারণা তার সমালোচনা করে লেখক-শিক্ষাবিদ ও ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, এদেশে বিভিন্ন স্বতন্ত্র জাতিসত্তার মানুষের বসবাস। তাদের বাঙালি পরিচয়ে অভিহিত করার চেষ্টা পাকিস্তান রাষ্ট্র যে ভুল করেছিল, সেই একই ভুলের পুনরাবৃত্তি হবে।
আজ বৃহস্পতিবার বিকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে তাজউদ্দীন আহমদ স্মারক বক্তৃতা-২০২৬ এ এসব কথা বলেন তিনি।
অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলছিলেন, ‘বাংলাদেশ কোনো জাতিরাষ্ট্র নয়। এখানে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষ বসবাস করে। তাদের নিজস্ব ভাষা ও জাতিসত্তা রয়েছে। আমরা যদি তাদের জোর করে বাঙালি হতে বলি, তাহলে পাকিস্তান আমাদের ওপর যে সাংস্কৃতিক আধিপত্য চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল, আমরাও একই কাজ করব।’
‘পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের পর মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘এখন থেকে আমরা কেউ বাঙালি, সিন্ধি বা পাঞ্জাবি নই; আমরা সবাই পাকিস্তানি।’ সেই চিন্তার ধারাবাহিকতায় উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করে একটি একক পাকিস্তানি জাতি গড়ে তোলার চেষ্টা হয়েছিল। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর সংবিধানে বাঙালি জাতীয়তাবাদকে রাষ্ট্রীয় পরিচয় হিসেবে প্রতিষ্ঠার মধ্যেও একই ধরনের সংকীর্ণতার ঝুঁকি তৈরি হয়।’
বক্তৃতায় তাজউদ্দীন আহমদের রাজনৈতিক দূরদর্শিতার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। ‘তাজউদ্দীন আহমদ স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রের রাজনৈতিক গতিপথ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করেছিলেন। বাকশাল, ত্রিদলীয় ঐক্যজোট এবং পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতা সম্পর্কে তিনি আগেভাগেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন। একইভাবে সমাজতান্ত্রিক ধারার নতুন রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করলেও সে জন্য প্রয়োজনীয় সংগঠন ও নেতৃত্বের অভাব অনুভব করেছিলেন। তিনি আমাদের জন্য একটি দৃষ্টান্ত। তার অবদানের প্রতি আমরা গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানাই।’
প্রধান অতিথির বক্তব্যে তাজউদ্দীন আহমদের মেয়ে শারমিন আহমদ বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ আমাদের মা, আর বাংলাদেশ তার সন্তান। ৭১ এর দুঃসময়ে তাজউদ্দীন আহমদ জাতিকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। একাত্তর প্রজন্ম যে উদ্দেশ্যে রক্ত দিয়েছিল, তার ফসল আমরা ঘরে তুলতে পারিনি। আমাদের তরুণ প্রজন্মেকে এসব ইতিহাস জানতে হবে এবং দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হতে হবে।’
সভাপতির বক্তব্যে ঢাবির উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী জানান, ‘স্বাধীনতার মূল স্পিরিট গণতন্ত্র বাধাগ্রস্ত হলে এর পরিণতি কেমন হয় তার ভবিষ্যৎবাণী তাজউদ্দীন আহমদ করে গিয়েছেন। যেটা আমরা ১৯৭৫ এবং ২০২৪ সালে দেখেছি। বাংলাদেশ নিয়ে তাজউদ্দিন আহমদের যে স্বপ্ন ছিল, আমরা মনে করি বর্তমান সরকার সে পথেই হাঁটছে।’
ঢাবির রেজিস্ট্রার মুনসী শামস উদ্দিন আহমেদের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন সাবেক প্রক্টর অধ্যাপক সাইফুদ্দিন আহমেদ। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে বক্তব্য দেন শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সাজ্জাদ সিদ্দিকী। আরও বক্তব্য দেন ঢাবির কলা অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক ড. আবুল কালাম সরকার ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক মো. মেহেদী হাসান খান। এছাড়া অনুষ্ঠানে মেধাবী শিক্ষার্থীদের ‘তাজউদ্দীন আহমদ বৃত্তি’ প্রদান করা হয়।





