ভবিষ্যতের বাসযোগ্য শহর নিয়ে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটিতে ওয়ং মান সামের লেকচার

সংগৃহীত ছবি
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে দ্রুত বিকাশমান গ্রীষ্মমণ্ডলীয় শহরগুলোকে আরও বাসযোগ্য, সহনশীল ও টেকসই করে তুলতে মানুষ, প্রকৃতি ও নগরব্যবস্থার সমন্বিত পরিকল্পনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন সিঙ্গাপুরভিত্তিক স্থপতি ওয়ং মান সাম। ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির পরিবেশবান্ধব ও পুরস্কারপ্রাপ্ত ইনার-সিটি ক্যাম্পাসের এই স্থপতি বুধবার বিশ্ববিদ্যালয়ের মেরুল বাড্ডা ক্যাম্পাসে এক পাবলিক লেকচারে এসব কথা বলেন।
ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত সিলভার জুবিলি পাবলিক লেকচার সিরিজের অংশ হিসেবে ‘ফর্ম ইন্টেলিজেন্স: টুয়ার্ডস আ নিউ অ্যান্ড রিজেনারেটিভ ট্রপিক্যাল আরবানিজম’ শীর্ষক এ লেকচারের আয়োজন করা হয়। ওয়ং মান সাম সিঙ্গাপুরভিত্তিক স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান ওহা’র প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক।
লেকচারে ওহা’র বিভিন্ন প্রকল্পের উদাহরণ তুলে ধরে ওয়ং মান সাম জানান, ‘ফর্ম ইন্টেলিজেন্স’ বলতে এমন স্থাপত্য নকশাকে বোঝায়, যা তার আশপাশের পরিবেশ ও বিভিন্ন ব্যবস্থার সঙ্গে কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে। এতে ভবন শুধু একটি কাঠামো হয়ে থাকে না, বরং সামগ্রিক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে।
তিনি বলেন, এই ধারণার প্রতিফলন দেখা যায় ওহা’র বিভিন্ন প্রকল্পে। এসব প্রকল্পে স্তরভিত্তিক নকশা, সবুজায়ন, প্রাকৃতিক বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা এবং মানুষের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত স্থানকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ওহা’র ‘গার্ডেন সিটি মেগা সিটি’ বইয়ের বিভিন্ন উদাহরণও তুলে ধরেন ওয়ং মান সাম। ২০১৬ সালে ভেনিস বিয়েনালেতে উপস্থাপিত এই কাজের মাধ্যমে মানুষ, প্রকৃতি, জলবায়ু-সংবেদনশীল নকশা ও কমিউনিটিকে একসঙ্গে যুক্ত করে ঘনবসতিপূর্ণ গ্রীষ্মমণ্ডলীয় শহরগুলোকে কীভাবে নতুনভাবে কল্পনা করা যায়, তা তুলে ধরা হয়।
সিঙ্গাপুরের পাঁচ তারকা পার্করয়্যাল কালেকশন পিকারিংকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘হোটেল ইন আ গার্ডেন’ ধারণায় নির্মিত এই স্থাপনাটি ধাপে ধাপে বিন্যস্ত স্কাই গার্ডেন ও জীবপ্রকৃতিনির্ভর নকশার জন্য পরিচিত। ভবনটিতে সবুজায়নের পরিমাণ প্রকল্পটির মোট জমির আয়তনের ২০০ শতাংশের বেশি।
সিঙ্গাপুরের ও’এশিয়া হোটেল ডাউনটাউন প্রকল্পের উদাহরণও দেন তিনি। প্রকৃতিনির্ভর ও উন্মুক্ত নকশার ২৭ তলা এই ‘লিভিং টাওয়ার’-এর সবুজে আচ্ছাদিত বাইরের অংশ ভবন শীতল রাখতে প্রয়োজনীয় জ্বালানি ব্যবহার ৪৩ শতাংশ এবং বাইরের দেয়ালের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ২১ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে সাহায্য করে বলে জানান তিনি।
সিঙ্গাপুরের প্যান প্যাসিফিক অর্চার্ড প্রকল্পের উদাহরণ তুলে ধরে ওয়ং মান সাম জানান, এতে ছয়তলা উচ্চতার চারটি খোলা স্তর একটির ওপর আরেকটি সাজানো হয়েছে। একই আয়তনের প্রাকৃতিক বনভূমির সঙ্গে তুলনা করলে, ভবনটির সবুজায়ন বাতাস পরিষ্কার করা, দূষণ কমানো ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে ৩০ শতাংশের বেশি ভূমিকা রাখে।
ওয়ং মান সাম আরও জানান, এ ধরনের চিন্তা থেকেই ওহা উত্তর জাকার্তায় ২ লাখ ১০ হাজার মানুষের জন্য একটি নতুন শহরের মহাপরিকল্পনা করেছে। শহরটিতে ছাদজুড়ে ক্যানোপি, বসবাস ও কাজের জন্য আলাদা স্তর, রেইনফরেস্টের মতো সবুজায়ন এবং ভূগর্ভস্থ পরিবহন ও অন্যান্য সেবার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
তিনি বলেন, ওহা’র দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হলো ২১০০ সালের মধ্যে সিঙ্গাপুরকে একটি বাসযোগ্য, টেকসই ও পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে সক্ষম শহর হিসেবে গড়ে তোলা। সেখানে মানুষ ও প্রকৃতি পাশাপাশি বসবাস করবে। এই সহাবস্থান হবে এমন একটি ব্যবস্থার মধ্যে, যেখানে সম্পদের পুনর্ব্যবহার নিশ্চিত হবে এবং প্রকৃতি ও নগরব্যবস্থা একে অপরকে টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করবে।
ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাসের নকশা নিয়ে করা একটি সামাজিক জরিপের ফলাফলও লেকচারে তুলে ধরেন ওয়ং মান সাম। তিনি বলেন, জরিপে অংশ নেওয়া ৮৮ শতাংশ মানুষ মনে করেন, এই ক্যাম্পাসের কারণে তারা ব্র্যাক কমিউনিটির অংশ হতে গর্ববোধ করেন।
ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির ভাইস-চ্যান্সেলর প্রফেসর সৈয়দ ফারহাত আনোয়ার বলেন, ‘পুরো দেশ আমাদের এই ক্যাম্পাস নিয়ে গর্ব করে। এটি শুধু একটি ক্যাম্পাস নয়, এটা যেন প্রকৃতিরই একটি অংশ। প্রকৃতির সঙ্গে মিশে গিয়ে এটি প্রকৃতিকে সমৃদ্ধ করে।’
অনুষ্ঠানে ছিলেন ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির প্রো-ভাইস-চ্যান্সেলর প্রফেসর আরশাদ মাহমুদ চৌধুরী, ট্রেজারার আরিফুল ইসলাম, রেজিস্ট্রার ডেভিড ডাউল্যান্ড এবং স্কুল অব আর্কিটেকচার অ্যান্ড ডিজাইনের ডিন প্রফেসর ফুয়াদ হাসান মল্লিক। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন অফিস অব কমিউনিকেশন্সের ডিরেক্টর খায়রুল বাশার।




