অনলাইন ক্লাস
এক ডিভাইস তিন সন্তান, ক্লাস করবে কোনজন

ছবিঃ আগামীর সময়
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তরের এক উপপরিচালকের তিন সন্তান। তিনি ও তার স্বামী দুজনই চাকরিজীবী। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত ব্যস্ত থাকতে হয় অফিসের কাজে। তাদের তিন সন্তানের মধ্যে দুজন ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে, অন্যজন পড়ে অন্য একটি স্কুলে।
রবিবারের রুটিন অনুযায়ী, তিনজনেরই অনলাইন ক্লাস হবে একই সময়ে। ফলে তিন সন্তানের জন্য ব্যবস্থা করতে হয়েছে আলাদা ডিভাইসের। পাশাপাশি আলাদা কক্ষেরও। এতে তাদের ডিভাইস ব্যবহার তদারকি করতে যেমন সমস্যা হচ্ছে, তেমনি বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের বদলে তিনটি আলাদা রুমে ফ্যান, লাইট বা এসি ব্যবহারের ফলে ব্যয় ও অপচয় দুটোই বাড়ছে।
‘একটি শ্রেণিকক্ষে যেখানে ৪০-৭০ জন শিক্ষার্থী একসঙ্গে শিক্ষা নিতে পারে, সেখানে ঘরে ঘরে আলাদা ডিভাইসে ক্লাস করা অনেক ক্ষেত্রে সাশ্রয়ী না হয়ে উল্টো ভোগান্তির পাশাপাশি বিদ্যুৎ অপচয়েরও কারণ হচ্ছে। পাশাপাশি তাদের তদারকি করার মতো মানুষও তো চাকরিজীবী বাবা-মায়ের পরিবারে থাকে না। বাধ্য হয়ে আমার মাকে ঢাকায় এনেছি শুধু অনলাইন ক্লাসের সময় ছেলেমেয়ের তদারকি করতে’, অনলাইন ক্লাস নিয়ে নিজের ভোগান্তির কথা জানালেন মাউশির ওই উপপরিচালক।
অনলাইন ক্লাস নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানালেন আরেক অভিভাবক ফাহিমা খাতুন। তার সন্তান পড়ে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণিতে। করোনাকালে ফাহিমা খাতুন দেখেছেন, তার মেয়ে একই ডিভাইসে ক্লাসের পাশাপাশি খেলছে গেমও। তার মানে অনলাইন ক্লাস চললে শিক্ষার্থীর কর্মকাণ্ড দেখার জন্য কাউকে না কাউকে থাকতে হবে পাশে। তাও যে কেউ হলে চলবে না, এমন কাউকে থাকতে হবে যিনি ক্লাসের বাইরে ডিভাইসের অন্য ব্যবহার সম্পর্কে বোঝেন। তা না হলে সন্তানের হাতে ডিভাইস তুলে দেওয়াটা হতে পারে বিপদের কারণ।
সরকার বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের কথা ভেবে অনলাইন ক্লাস দিলেও আদতে এতে উল্টো বিদ্যুৎ খরচ বাড়ছে বলেও মত দেন ফাহিমা খাতুন।
‘অনলাইন ক্লাস’ শব্দবন্ধটি শুনলেই বেশিরভাগ মানুষ ফিরে যান ২০২০ সালে। কারণ সেই সময় বিশ্ব জুড়ে কোভিড মহামারি দেখা দিলে সংক্রমণ ঠেকাতে বন্ধ করে দেওয়া হয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। বিকল্প হিসেবে শুরু হয় অনলাইন ক্লাস বা দূরপাঠ কর্মসূচি। মহামারীর দীর্ঘ পথ পেরিয়ে পৃথিবী স্বাভাবিক নিয়মে ফেরার পর ক্লাসেও ফেরে শিক্ষার্থীরা। বিশেষ কিছু কোর্স ছাড়া মূল লেখাপড়া এখন ক্লাসরুমেই হয়।
কিন্তু ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের আগ্রাসনের প্রেক্ষাপটে সৃষ্ট যুদ্ধের কারণে আবারও সেই অনলাইন ক্লাসে ফিরতে যাচ্ছে সরকার।
এবার আর সংগনিরোধ নয়, জ্বালানির সংকটময় পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী পদক্ষেপ হিসেবে এই কর্মসূচি শুরু হতে যাচ্ছে। অবশ্য সব স্কুলে আপাতত হচ্ছেও না অনলাইন ক্লাস। রাজধানীর ‘এলিট’ হিসেবে পরিচিত বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেই পাইলটিং আকারে সপ্তাহে তিন দিন শুরু হয়েছে এই পদ্ধতির ক্লাস।
অবশ্য শুধু বাংলাদেশ সরকার নয়। পাকিস্তান, কম্বোডিয়া, ফিলিপাইনের মতো কিছু দেশেও জ্বালানি সাশ্রয়ের অংশ হিসেবে অনলাইন ক্লাস ও বাড়ি থেকে দেওয়া হয়েছে কাজের সুযোগ। উন্নত বিশ্বের যে দেশগুলো শিক্ষাব্যবস্থাকে আদর্শ ধরা হয়, সেসব দেশে এখনো শ্রেণিকক্ষে গিয়েই লেখাপড়া করছে শিক্ষার্থীরা।
করোনাকালে অনলাইন ক্লাস নিয়ে ভালো অভিজ্ঞতা নেই দেশের বেশিরভাগ শিক্ষক-শিক্ষার্থী-অভিভাবকের। বিশেষ করে শিশুদের ডিভাইস আসক্তি বেড়ে যাওয়া, সব জায়গায় ইন্টারনেটের ভালো সংযোগ না থাকা, অনলাইন ক্লাস পরিচালনার জন্য একজন অভিভাবককে সঙ্গে থাকাসহ নানা সমস্যাই দেখা দিয়েছিল সে সময়।
আবার অনেক পরিবারে ক্লাস করার মতো ডিভাইস হয়তো একটি, কিন্তু সন্তানের সংখ্যা একাধিক। তারা কীভাবে একই সময়ে দুই সন্তানকে অনলাইনে ক্লাস করাবেন কিংবা একজনকে অনলাইনে ক্লাস করতে বসিয়ে রেখে আরেকজনকে নিয়ে স্কুলে ছুটবেন, পাচ্ছেন না সে দিশা।
মাউশি তথ্য বলছে, ঢাকার প্রায় ৩০ শতাংশ পরিবারে একাধিক সন্তান লেখাপড়া করেন একই বা বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে।
এমন কয়েকটি পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছে আগামীর সময়। অভিভাবকরা বলছেন, একই সময়ে অনলাইন ক্লাস করতে হলে আলাদা ডিভাইস ছাড়াও ব্যবস্থা করতে হবে আলাদা রুম, ফ্যান, কখনো এসির। এতে কীভাবে আর কতটুকু বিদ্যুৎ সাশ্রয় হবে, সে নিয়েও প্রশ্ন করলেন কেউ কেউ।
‘জোর করে চাপিয়ে দেওয়া’ এই অনলাইন ক্লাস কতটুকু কার্যকর হবে, সে প্রশ্নও করলেন অনেকে। এমনকি সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতাও করেছেন শিক্ষা প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা।
দ্বৈত পালার স্কুলে জটিলতা
যেসব স্কুলে প্রভাতি ও দিবা শাখা চালু রয়েছে, সেখানে অনলাইন ক্লাসের সময়সূচি নিয়ে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের জটিলতা। অনেক পরিবারে একাধিক সন্তান একই স্কুলে আলাদা শিফটে পড়ে। কিন্তু বাড়িতে ডিজিটাল ডিভাইস মাত্র একটি। ফলে দুই শিফটের ক্লাস কাছাকাছি সময়ে পড়লে তাদের ক্লাস করা নিয়ে তৈরি হচ্ছে জটিলতা।
আবার দুই পালায় ক্লাস করানো শিক্ষকদের জন্য হতে পারে বাড়তি মানসিক চাপের কারণ। যথাযথ লজিস্টিক সাপোর্ট নিশ্চিত না করে হঠাৎ করে এই পদ্ধতি চালু করে দেওয়া নিয়ে অসন্তোষও প্রকাশ করেছেন কয়েকজন শিক্ষক।
বৃহস্পতিবারের ব্রিফিংয়ে এ সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলেন একটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক। তখন শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলন বলেছিলেন, বিষয়টি পাইলটিং। ক্লাস শুরু হলে যেসব সমস্যা সামনে আসবে সেগুলোর ব্যাপারে পরিস্থিতি বুঝে পরে নেওয়া হবে সিদ্ধান্ত।
অনলাইন ক্লাসে যাবে না ইংরেজি মাধ্যম স্কুল
বাংলা মাধ্যমের স্কুলগুলোয় অনলাইন ক্লাস নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া থাকলেও ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলো দেখছে ইতিবাচক হিসেবে। কিন্তু আগামী জুনে ফাইনাল পরীক্ষা থাকায় অনলাইন ক্লাসে না যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ‘বাংলাদেশ ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল প্যারেন্টস ফোরাম’।
একই সঙ্গে অভিভাবকরা এর বিরোধিতা করে বাতিলের দাবিতে মাঠেও নেমেছেন।
তারা বলছেন, জুন থেকে শুরু হবে ‘ও’ এবং ‘এ’ লেভেল পরীক্ষা। এই সময়ে অনলাইন ক্লাসে গেলে শিক্ষাজীবনে নামবে ধস। বর্তমানে স্কুলগুলোতে চলছে ক্লাস টেস্ট পরীক্ষা। এ অবস্থায় সশরীরে ক্লাস বন্ধ করলে পরীক্ষার চূড়ান্ত প্রস্তুতিতে তৈরি হবে বড় বিড়ম্বনা।
সরকারের এমন সিদ্ধান্তে কোনো অভিভাবক সন্তুষ্ট নন বলে জানালেন ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল প্যারেন্টস ফোরামের সভাপতি এ কে এম আশরাফুল হক।
অভিভাবকদের আরেক সংগঠন অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি জিয়াউল কবির দুলু বলেছেন, তাদের ওপর সিদ্ধান্ত জোর করে চাপিয়ে দিয়েছে সরকার।
‘সরকার শিক্ষার্থীদের গিনিপিগ বানাচ্ছে। যেকোনো ধরনের দুর্যোগ এলেই শিক্ষার্থীদের দিয়ে করানো হয় ‘ট্রায়াল অ্যান্ড এরর’। অনলাইন ক্লাসের ভয়াবহ পরিণতি করোনাকালে দেখেছি আমরা। শহরে শিশুদের অনলাইন ক্লাস করাবে, বাকিদের স্কুলে পাঠাবে, এটা সরাসরি বৈষম্য। এটা মেনে নেওয়া যায় না’, অনলাইন ক্লাসের বিরোধিতা করে নিজের যুক্তি তুলে ধরলেন জিয়াউল কবির।

