এইচএসসিতে বেড়েছে ছাত্রীর সংখ্যা
- কড়া নজরদারিতে হবে পরীক্ষা
- মোট পরীক্ষার্থী ১২ লাখ ৭০ হাজার
- পরীক্ষার্থী বেড়েছে ৩৫ হাজার

ফাইল ছবি
চলতি বছর এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে অংশ নেবে ১২ লাখ ৬৭ হাজার ৪৮৬ জন পরীক্ষার্থী। বরাবরের মতো এবারও ছাত্রের চেয়ে ছাত্রীর সংখ্যা বেশি। আগামী ২ জুলাই থেকে শুরু হতে যাওয়ার এই পরীক্ষার মূল আকর্ষণ শুধু পরীক্ষার্থীর সংখ্যায় নয়, বরং নিরাপত্তা ও জালিয়াতি রোধে নেওয়া নজিরবিহীন প্রযুক্তির ব্যবহার।
প্রশ্নফাঁস, গুজব এবং ডিজিটাল জালিয়াতি ঠেকাতে এবারই প্রথম পরীক্ষাকেন্দ্রকে আনা হচ্ছে সিসিটিভি নজরদারির আওতায়। কেন্দ্রের বাইরে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশের শরীরে থাকবে ‘বডি ওর্ন ক্যামেরা’। পাশাপাশি এ পরীক্ষায় থাকবে মন্ত্রিসভায় সদ্য অনুমোদন হওয়া ‘পাবলিক পরীক্ষা (অপরাধ) আইন, ২০২৫’-এর ছায়া।
আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মোট পরীক্ষার্থীর তথ্যে ৬ লাখ ১৯ হাজার ৯৩৯ জন ছাত্র এবং ৬ লাখ ৪৭ হাজার ৫৪৭ ছাত্রী। পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে ২ হাজার ৬৯৭টি কেন্দ্রে। যেখানে অংশ নেবে ৯ হাজার ৪৩৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। গত বছরের তুলনায় এবার মোট পরীক্ষার্থী বেড়েছে ৩৪ হাজার ৯২২ জন। চলতি বছরও যথারীতি ছেলেদের তুলনায় মেয়ে পরীক্ষার্থী ২৬ হাজার ৬৪৫ জন বেশি।
এবার নিয়মিত পরীক্ষার্থী রয়েছে ৯ লাখ ৪৭ হাজার ৯৪৩ জন, যা মোট পরীক্ষার্থীর প্রায় ৭৪ দশমিক ৮ শতাংশ। অন্যদিকে ৩ লাখ ১০ হাজার ৮৮১ জন অনিয়মিত (এক বা একাধিক বিষয়ে অকৃতকার্য) এবং ৬ হাজার ৭৪০ জন মানোন্নয়ন পরীক্ষার্থী রয়েছে। অর্থাৎ নিয়মিত নয়— এমন পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ৩ লাখ ১৯ হাজার ৫৪৩ জন, যা মোট পরীক্ষার্থীর প্রায় ২৫ শতাংশ।
সাধারণ ৯টি শিক্ষা বোর্ডে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ১০ লাখ ৬৬ হাজার ৬১৭ জন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পরীক্ষার্থী ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে ২ লাখ ৯৭ হাজার ২৯৬ জন। এরপর রয়েছে রাজশাহী বোর্ডে ১ লাখ ৪০ হাজার ৮৩০, যশোরে ১ লাখ ১৭ হাজার ২১০, দিনাজপুরে ১ লাখ ১৩ হাজার ৪৭৯, চট্টগ্রামে ৯৯ হাজার ৬৮৮, কুমিল্লায় ৯৪ হাজার ৮০২, ময়মনসিংহে ৭৩ হাজার ৩৭, সিলেটে ৭১ হাজার ৬১১ ও বরিশালে ৫৮ হাজার ৬৬৪ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেবে। মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের আলিম পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে ৯২ হাজার ৯০৫ জন এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের এইচএসসি (বিএম/বিএমটি/ডিআইসি/ভোকেশনাল) পরীক্ষায় অংশ নেবে ১ লাখ ৭ হাজার ৯৬৪ জন পরীক্ষার্থী।
মানবিকে সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী: সাধারণ শিক্ষা বোর্ডগুলোর শিক্ষার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পরীক্ষার্থী মানবিক বিভাগে, মোট ৬ লাখ ১৭ হাজার ৬৯৭ জন। এ ছাড়া বিজ্ঞান বিভাগে ২ লাখ ৭৯ হাজার ২৩৭ এবং ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে ১ লাখ ৬৯ হাজার ৬৮৩ জন পরীক্ষার্থী রয়েছে।
পরীক্ষায় কঠোর নজরদারি: শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সূত্র জানিয়েছে, প্রশ্নফাঁস, গুজব, অসদুপায় অবলম্বন ও কেন্দ্রে অনিয়ম ঠেকাতে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পরীক্ষার্থীদের নির্ধারিত সময়ের আগেই কেন্দ্রে উপস্থিত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রে মোবাইল ফোন ও অননুমোদিত ইলেকট্রনিক ডিভাইস বহন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, জেলা প্রশাসন ও শিক্ষা বোর্ডগুলো সমন্বিতভাবে পরীক্ষা পরিচালনা করবে। চলতি বছর নতুন দুটি বিষয় যুক্ত হচ্ছে— প্রতিটি কেন্দ্র সিসিটিভির আওতায় নিয়ে আসা এবং বাইরের পরিস্থিতি নজরদারি করতে পুলিশের কাছে থাকবে ‘বডি ওর্ন ক্যামেরা।
পরীক্ষা আইনের আওতায় প্রথমবার: পাবলিক পরীক্ষায় ডিজিটাল নকল, ডিভাইস জালিয়াতি, ব্লুটুথের মতো ইলেকট্রিক যন্ত্রের অপব্যবহার বন্ধে ‘পাবলিক পরীক্ষা (অপরাধ) আইন, ২০২৫’ অনুমোদন করেছে সরকারের সর্বোচ্চ নির্বাহী বডি মন্ত্রিসভা। যদিও আইনটি এখন সংসদে যাবে এবং সেখানে পাস হলে কার্যকর হবে। তার পরও এই আইনটির ছায়া থাকবে আসন্ন পরীক্ষায়। কারণ এবারই প্রথম সংশোধিত ‘পাবলিক পরীক্ষা (অপরাধ) আইন, ২০২৫’ কার্যকরের পর এইচএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এই আইনে শুধু প্রশ্নফাঁস রোধ নয়; বরং ডিজিটাল মাধ্যমে প্রশ্নপত্র ছড়ানো, ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার করে জালিয়াতি এবং সংঘবদ্ধ পরীক্ষা-অপরাধ দমন করা হবে। প্রশ্নপত্র ফাঁস, সংগ্রহ, বিক্রি, কেনাবেচা, সরবরাহ বা বিতরণ করলে সর্বোচ্চ ৫ বছর কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। শুধু ফাঁস নয়, ফাঁসের চেষ্টা বা ষড়যন্ত্রও অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রাম, মেসেঞ্জার, ইমো, ভাইবারসহ যেকোনো ডিজিটাল মাধ্যমে প্রশ্ন বা প্রশ্নের অংশ ছড়িয়ে দিলে শাস্তি হবে। ভুয়া প্রশ্নপত্র ছড়িয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করলেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।
নতুন আইনটিতে মোবাইল ফোন, ব্লুটুথ ডিভাইস, স্মার্টওয়াচ, ইয়ারপিস, গোপন ক্যামেরাসহ যেকোনো ইলেকট্রনিক যোগাযোগযন্ত্র বহন এতদিন নিষিদ্ধ ছিল; এখন এগুলো বহন করা আইনগত দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। নতুন আইনটিতে শুধু পরীক্ষার্থী নয়, যদি শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী, মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানের কর্মী, কোচিংসেন্টারের মালিক, প্রশ্ন পরিবহনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা অন্য কোনো সহযোগী প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে যুক্ত থাকলে তাকে আইনের আওতায় আনা হবে। এই শাস্তির মধ্যে রয়েছে— প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অর্থদণ্ড, লাইসেন্স বাতিল ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করা যাবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিধান রাখা হয়েছে উত্তরপত্র জালিয়াতিতে। আগে উত্তরপত্র পরিবর্তন, নম্বর পরিবর্তনের চেষ্টা, খাতা গায়েব করা এবং পরীক্ষার ফলাফল জালিয়াতির মতো ঘটনায় সুনির্দিষ্ট কোনো শাস্তির বিধান না থাকলেও নতুন আইনে এসব ঘটনায় শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।
পরীক্ষা সুষ্ঠু, নকলমুক্ত ও ইতিবাচক পরিবেশে সম্পন্ন করতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি এরই মধ্যে সব ধরনের প্রস্তুতি শেষ করেছে বলে জানালেন ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান ও আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান। তিনি বলছিলেন, ‘চলতি বছর পরীক্ষায় নতুন কিছু নিয়ম যুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পুলিশের বর্ডি ওর্ন ক্যামেরা, প্রতিটি কেন্দ্র সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনার মতো সিদ্ধান্ত। এসব সিদ্ধান্তের কারণ অন্যান্য বছরের চেয়ে চলতি বছর পরীক্ষা খুব সুশৃঙ্খল হবে— এমনটাই আশাবাদ তার।’







