সেপ্টেম্বরে অর্থনীতিতে সংকোচন, পিএমআই কমে ৪৮.৬
- কৃষি ছাড়া উৎপাদন, নির্মাণ ও সেবা খাতে দুর্বলতা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে আবারও সংকোচনের আভাস মিলেছে। সেপ্টেম্বর মাসে বাংলাদেশের সার্বিক পারচেজিং ম্যানেজার্স ইনডেক্স (পিএমআই) আগের মাসের তুলনায় ১ দশমিক ৩ পয়েন্ট কমে ৪৮ দশমিক ৬-এ নেমেছে। ফলে আগস্টে সম্প্রসারণের পর সেপ্টেম্বরে সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সংকোচনের দিকে ফিরে গেছে।
মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই), ঢাকা এবং পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ (পিইবি) যৌথভাবে ৭ অক্টোবর সেপ্টেম্বরের পিএমআই প্রতিবেদন প্রকাশ করে। যুক্তরাজ্য সরকারের সহায়তায় এবং সিঙ্গাপুর ইনস্টিটিউট অব পারচেজিং অ্যান্ড ম্যাটেরিয়ালস ম্যানেজমেন্টের কারিগরি সহযোগিতায় সূচকটি তৈরি করা হয়।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, সেপ্টেম্বরে কৃষি খাত ছাড়া অর্থনীতির প্রধান তিন খাত উৎপাদন, নির্মাণ ও সেবা—দুর্বল অবস্থায় ছিল। এর মধ্যে উৎপাদন খাতের পিএমআই সবচেয়ে বেশি কমেছে। আগস্টের তুলনায় ২ দশমিক ৬ পয়েন্ট কমে এ খাতের পিএমআই দাঁড়িয়েছে ৪৪ দশমিক ৮-এ।
উৎপাদন খাতে নতুন ক্রয়াদেশ, রপ্তানি ক্রয়াদেশ, উৎপাদন, কাঁচামাল ক্রয়ের মজুদ, প্রস্তুত পণ্যের মজুদ এবং আমদানি—সবগুলো সূচকই দ্রুত সংকুচিত হয়েছে। অর্ডার জমে থাকার পরিমাণেও বড় ধরনের সংকোচন হয়েছে। তবে কর্মসংস্থান সামান্য সম্প্রসারণে ফিরেছে। একই সময়ে উৎপাদন খাতের উপকরণমূল্য বাড়তে থাকে।
নির্মাণ খাতও আগস্টের সম্প্রসারণ থেকে সেপ্টেম্বরে সংকোচনে ফিরে গেছে। এ খাতের পিএমআই ৩ দশমিক ৮ পয়েন্ট কমে ৪৮ দশমিক ৫-এ নেমেছে। নতুন ব্যবসা ও নির্মাণ কার্যক্রম কমেছে। তবে কর্মসংস্থানে বড় কোনো পরিবর্তন হয়নি। নির্মাণ খাতে উপকরণের ব্যয় বাড়লেও আগের তুলনায় বৃদ্ধির গতি কিছুটা কমেছে।
সেবা খাতও টানা দ্বিতীয় মাসের মতো সংকোচনে রয়েছে। আগস্টের তুলনায় শূন্য দশমিক ২ পয়েন্ট কমে সেপ্টেম্বরে সেবা খাতের পিএমআই দাঁড়িয়েছে ৪৯ দশমিক ০-এ। নতুন ব্যবসা ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম সংকোচনে ফিরেছে। কর্মসংস্থানও কমেছে, যদিও সংকোচনের গতি কিছুটা ধীর হয়েছে। এ খাতেও উপকরণ ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
অন্যদিকে, কৃষি খাত টানা ১৩ মাস ধরে সম্প্রসারণে রয়েছে। তবে সেপ্টেম্বরে এ খাতের পিএমআই ১ দশমিক ৩ পয়েন্ট কমে ৫৫ দশমিক ২ হয়েছে। নতুন ব্যবসা, ব্যবসায়িক কার্যক্রম ও কর্মসংস্থানে সম্প্রসারণের গতি কমেছে। সামান্য কমলেও উৎপাদন ব্যয় এখনো উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। অর্ডার জমে থাকার সূচক সংকোচনে থাকলেও আগের তুলনায় সংকোচনের মাত্রা কমেছে।
প্রতিবেদনে ব্যবসায়ীদের ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নিয়ে মিশ্র ও সতর্ক মনোভাবের কথা উঠে এসেছে। কিছু প্রতিষ্ঠান নিশ্চিত ক্রয়াদেশ, নির্ভরযোগ্য ক্রেতা এবং শীতকাল ও সামনে আসা ব্যস্ত মৌসুমে চাহিদা বাড়ার সম্ভাবনার কারণে ব্যবসা বাড়ার আশা করছে।
তবে অনেক প্রতিষ্ঠান জ্বালানি ও তেলের দফায় দফায় মূল্যবৃদ্ধি, উৎপাদন ও পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি, ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট এবং ব্যাংকঋণের সীমিত সুযোগ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে ব্যবসার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও কঠিন হয়ে পড়েছে বলে মত দিয়েছেন কয়েকজন উদ্যোক্তা।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, সেপ্টেম্বরের পিএমআই দেখাচ্ছে বাংলাদেশের অর্থনীতির গতিশীলতা এখনো চাপের মধ্যে রয়েছে। উৎপাদন, নির্মাণ ও সেবা খাতের দুর্বলতা সামগ্রিক অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে প্রভাবিত করেছে। তবে কৃষি খাতের ধারাবাহিক সম্প্রসারণ অর্থনীতিকে কিছুটা স্থিতিশীলতা দিচ্ছে।
তিনি বলেন, সব খাতেই ভবিষ্যৎ ব্যবসা পরিস্থিতি নিয়ে কিছুটা ইতিবাচক প্রত্যাশা রয়েছে। অর্থনীতির গতি ফিরিয়ে আনতে অভ্যন্তরীণ ও রপ্তানি চাহিদা বাড়ানো, নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, অর্থায়নের বাধা কমানো এবং উৎপাদন ব্যয়ের চাপ নিয়ন্ত্রণ করা গুরুত্বপূর্ণ।
তবে ভবিষ্যৎ ব্যবসা সূচকে চারটি খাতেই সম্প্রসারণের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। এতে সামনের মাসগুলোতে ব্যবসা পরিস্থিতি কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর বিষয়ে সতর্ক আশাবাদের ভিত্তি তৈরি হয়েছে।



