সম্ভাব্যতা সমীক্ষা শুরু করছে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়
তিস্তা মহাপরিকল্পনায় আশার আলো
- সমীক্ষা প্রতিবেদন পাঠানো হবে চীনের কাছে
- আপাতত কোনো ভূমিকা নেই ইআরডির
- অন্তর্বর্তী সরকার আমলে চাওয়া ঋণের বিষয়টি চাপা পড়েছে

সংগৃহীত ছবি
আশার আলো জেগেছে উত্তরাঞ্চলের পাঁচ জেলার মানুষের স্বপ্ন তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে। অন্তর্বর্তী সরকার আমলে চীনের কাছে চাওয়া ঋণের বিষয়টি চাপা পড়ে গেলেও এখন নতুন করে শুরু হয়েছে মহাপরিকল্পনা সম্ভাব্যতা সমীক্ষার কাজ পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের করা এই সমীক্ষা প্রতিবেদন পেলেই পরবর্তী পদক্ষেপ নেবে চীন। এমনই তথ্য জানিয়েছে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)।
সূত্র জানায়, সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের পর গতি এসেছে এই উদ্যোগে। এতদিন ভারত না চীন এ নিয়েই ছিল দোটানা। গত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রথম পছন্দ ছিল ভারত। সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে এটি বাস্তবায়নে অন্তর্বর্তী সরকার চীনের কাছে ৫৫ কোটি ডলার বা প্রায় ৬ হাজার ৭১০ কোটি টাকা ঋণ চায়। কিন্তু ঋণের বিষয়টিতে ধীরে চলো নীতিতে এগোয় দেশটি। এদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফরের সময় তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হলেও ওই ঋণের বিষয়ে কোনো কথা হয়নি। এখন আপাতত ঋণটি নিয়ে ভাবছে না ইআরডিও।
সংস্থাটির দায়িত্বশীল একাধিক কর্মকর্তা গত বৃহস্পতিবার আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাংলাদেশের জন্য কাঙ্ক্ষিত প্রকল্প। আগে এটিতে অর্থায়ন করতে ব্যাপক আগ্রহ থাকলেও অজ্ঞাত কারণে এ নিয়ে এখন কোনো কথা বলছে না চীন। এমনকি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরেও আগের চাওয়া ঋণ নিয়ে কোনো কথা হয়নি। ফলে শেষ পর্যন্ত ঋণটির ভাগ্য অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। তবে তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে এখন বল পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের কোর্টে। তারা সমীক্ষার কাজ শেষ করে চীনের কাছে যত দ্রুত পাঠাবে ততই ভালো হবে।
এ প্রসঙ্গে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেছেন, সমীক্ষা শুরু হয়েছে। তবে এখানে চীনের কোনো বিশেষজ্ঞ নেই। বাংলাদেশের ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং (আইডব্লিউএম) এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) মিলে এটি করছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, এই প্রতিবেদন চীনের কাছে দেওয়া হবে কি না; সে বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারছি না।
সূত্র জানায়, ‘কম্প্রিহেনসিভ ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রেস্টোরেশন অব তিস্তা রিভার প্রজেক্ট’-এ অর্থায়নের জন্য পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় ২০২৫ সালের ২৬ মে একটি চিঠি পাঠায় পরিকল্পনা কমিশনে। চিঠিতে তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়নে চীনের ঋণের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। পরে ওই বছরের জুলাই মাসে চীনা দূতাবাসে ঋণ চেয়ে চিঠি পাঠায় ইআরডি। এ চিঠিতে বলা হয়, তিস্তা প্রকল্পের প্রথম পর্যায় বাস্তবায়নে ব্যয় হবে ৭৫ কোটি ডলার বা প্রায় ৯ হাজার ১৫০ কোটি টাকা। এর মধ্যে চীনের কাছ থেকে ঋণ চাওয়া হয়েছে ৫৫ কোটি ডলার বা প্রায় ৬ হাজার ৭১০ কোটি টাকা। বাকি টাকা সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে ব্যয় করা হবে। ২০২৬-২৯ সালের জুনের মধ্যে এটি বাস্তবায়ন করার কথা ছিল পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের।
সূত্র জানায়, প্রায় ২৪০ বছরের পুরনো নদী তিস্তা। এর সঙ্গে রয়েছে উত্তরের ২৫টি নদীর প্রবাহ। শুষ্ক মৌসুমে নদীটি একেবারেই শুকিয়ে যায়। নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট, উলিপুর, চিলমারী, রংপুরের গঙ্গাচড়া, কাউনিয়া ও পীরগাছা, গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ওপর দিয়ে বয়ে গেছে নদীটি। তবে শুষ্ক মৌসুমে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলা। এ উপজেলার ৯টি ইউনিয়নের মধ্যে সাতটিই তিস্তা নদীবেষ্টিত। নদীশাসন না হওয়ায় গত পাঁচ বছরে গতিপথ পরিবর্তন হয়েছে।
তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে তিস্তাপাড় হয়ে উঠবে পূর্ব চীনের জিয়াংসু প্রদেশের সুকিয়ান সিটির মতো সুন্দর নগরী। চীনের হোয়াংহো নদীকে একসময় বলা হতো চীনের দুঃখ। প্রতি বছর ওই নদীর পানি ভাসিয়ে দিত শত শত মাইল। ভেঙে নিয়ে যেত বহু গ্রাম-পথ-ঘাট জনপদ। নদীশাসন করায় চীনের মানুষের দুঃখ ঘুচেছে। হোয়াংহো এখন হয়ে গেছে চীনের কৃষকদের জন্য আশীর্বাদ। হোয়াংহোর মতোই এখন বাংলাদেশের রংপুর অঞ্চলের ‘পাগলা নদী’খ্যাত তিস্তা ড্রেজিং করে কোটি মানুষের দুঃখ ঘোচানোর দাবি দীর্ঘদিন ধরেই করে আসছেন এই অঞ্চলের মানুষ।



