সস্তা ব্র্যান্ডে পিষ্ট পোশাক খাত

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বড় সংকটে পড়েছে দেশের তৈরি পোশাক শিল্প। আন্তর্জাতিক বাজারে কম দামে পোশাক সরবরাহের প্রতিযোগিতা, দুর্বল দর-কষাকষির সক্ষমতা, পণ্য বৈচিত্র্যের অভাব এবং বৈশ্বিক চাহিদা কমে যাওয়াকে মূল কারণ হিসেবে দেখছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। বিদেশি কিছু স্বল্পমূল্যের ব্র্যান্ডের জন্য লোকসানে উৎপাদন করতে গিয়ে একের পর এক কারখানা বন্ধ হচ্ছে। ব্যাংকের ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে অনেক উদ্যোক্তা ব্যবসা গুটিয়ে নিচ্ছেন, এমনকি কেউ কেউ দেশও ছেড়ে চলে যাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) তথ্য অনুযায়ী, গত তিন বছরে দেশে বন্ধ হয়েছে প্রায় ৪০০টি পোশাক কারখানা। শিল্প পুলিশের হিসাব বলছে, ২০২৪ সালের জুন থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত দুই বছরে ১৭০টি বস্ত্র ও পোশাক কারখানা বন্ধ হয়েছে। শুধু চট্টগ্রামেই গত দেড় বছরে বন্ধ হয়েছে ১৮৬টি কারখানা।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমানে পোশাক খাতে খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৩০ শতাংশে পৌঁছেছে। এর ফলে একদিকে ব্যাংক খাতের ঝুঁকি বাড়ছে, অন্যদিকে দেশের প্রধান রপ্তানি খাত দীর্ঘমেয়াদি সংকটের মুখে পড়ছে।
উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, দেশে প্রায় ২০০টি কারখানা মূলত স্বল্পমূল্যের আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর জন্য উৎপাদন করছে। কভিড-১৯ মহামারী, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবং ইউরোপ-আমেরিকায় দুর্বল ভোক্তা চাহিদার কারণে বৈশ্বিক বাজারে পোশাকের অর্ডার কমেছে। এ পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে অনেক বিদেশি ক্রেতা আগের তুলনায় আরও কম দামে পোশাক কিনছে। ফলে বাংলাদেশের পোশাকের গড় রপ্তানি মূল্য ৪ থেকে ৫ শতাংশ কমে গেছে।
বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে কয়েক হাজার আন্তর্জাতিক ক্রেতা ও ব্র্যান্ড পোশাক সংগ্রহ করলেও শীর্ষ ১০টি প্রতিষ্ঠানই মোট রপ্তানির প্রায় ২৯ শতাংশ কিনে থাকে। এদের মধ্যে পোল্যান্ডভিত্তিক খুচরা বিক্রেতা পেপকো সবচেয়ে কম দামে বাংলাদেশ থেকে পোশাক কিনছে। প্রতিষ্ঠানটির কেনা পোশাকের গড় মূল্য দেড় থেকে পৌনে ২ ডলারের মধ্যে, যা শীর্ষ ক্রেতাদের মধ্যে সর্বনিম্ন।
বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী (পারভেজ) বলেছেন, কম দামে অর্ডার নেওয়ার জন্য উদ্যোক্তারাও অনেকাংশে দায়ী। অর্ডারের অভাবে অনেক কারখানা উৎপাদন সচল রাখতে লোকসান জেনেও কম দামে কাজ নিচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর পক্ষ থেকে ন্যূনতম ফ্লোর প্রাইসের কথা বলা হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি।
তিনি বলেছেন, সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ছে ছোট ও মাঝারি কারখানা। উদ্যোক্তাদের আরও পেশাদার হতে হবে এবং মূল্য নয়, দক্ষতা ও মানের ভিত্তিতে প্রতিযোগিতা করতে হবে। একই সঙ্গে উৎপাদন ব্যয় কমাতে সরকারকে নীতিগত সহায়তা দিতে হবে। তা না হলে সংকট আরও গভীর হবে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেছেন, তৈরি পোশাক খাতে বর্তমানে খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৩০ শতাংশ। কম দামে অর্ডার নেওয়ায় অনেক কারখানা উৎপাদন খরচই তুলতে পারছে না। ফলে সময়মতো ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছে না।
তিনি জানিয়েছেন, উদ্যোক্তাদের মধ্যে ঐক্যের অভাব, নতুন বাজারে প্রবেশে ধীরগতি, উচ্চমূল্যের ফ্যাশন পণ্য উৎপাদনে পিছিয়ে থাকা এবং নিজস্ব ডিজাইন উন্নয়নে সীমাবদ্ধতার কারণে বাংলাদেশ এখনো মূলত স্বল্পমূল্যের বেসিক পোশাকের ওপর নির্ভরশীল। এই বাজারে বিক্রেতা বেশি, কিন্তু ক্রেতা তুলনামূলক কম। ফলে দাম আরও কমে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ শেষে দেশের বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৩০ দশমিক ১১ শতাংশ খেলাপি হয়ে গেছে। মোট খেলাপি ও শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫ লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকা, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেছেন, অস্বাস্থ্যকর মূল্য প্রতিযোগিতা বাংলাদেশের পোশাকশিল্পকে দুর্বল করে দিচ্ছে। অনেক উদ্যোক্তা কম দামে অর্ডার বাস্তবায়ন করতে গিয়ে ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করতে পারছেন না। একপর্যায়ে কারখানা বন্ধ করে কেউ কেউ দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। এতে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণও দ্রুত বাড়ছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু কম দামের অর্ডারের ওপর নির্ভর করে এ সংকট কাটানো সম্ভব নয়। উচ্চমূল্যের পোশাক উৎপাদন, নতুন বাজার অনুসন্ধান, নিজস্ব ডিজাইন সক্ষমতা বৃদ্ধি, উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এবং উদ্যোক্তাদের মধ্যে মূল্য শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি ন্যূনতম ফ্লোর প্রাইস কার্যকর, উৎপাদন ব্যয় কমাতে সরকারি সহায়তা এবং ঋণ পুনর্গঠনে বাস্তবসম্মত নীতি গ্রহণ না করলে দেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি খাত আরও বড় আর্থিক সংকটে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন ব্যবসায়ী নেতারা।




