সমুদ্রের নীল অর্থনীতিতে বড় বিনিয়োগের হাতছানি

বক্তব্য দিচ্ছেন আশিক চৌধুরী
বাংলাদেশের মৎস্য ও সামুদ্রিক সম্পদ বা ‘ব্লু-ইকোনমি’ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানিমুখী খাতে রূপান্তরের স্বপ্ন দীর্ঘদিনের। যদিও এই স্বপ্নের বাস্তবায়ন এখনো আটকে আছে রেগুলেটরি ও অবকাঠামোগত গ্যাঁড়াকলে। আজ রাজধানীতে মহেশখালী সমন্বিত উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (মিডা) ও জাইকার যৌথ সেমিনারে গভীর সমুদ্রে টুনা মাছ আহরণ এবং স্মার্ট চিংড়ি চাষ নিয়ে দেওয়া হয়েছে বড় বিনিয়োগের রূপরেখা। আর তা বাস্তবায়নে বড় বাধা দেশের দুর্বল কোল্ড-চেইন লজিস্টিকস এবং সনাতন পদ্ধতির চাষাবাদ।
আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও আন্তর্জাতিক বাজারের কঠোর ই-ট্রেসেবিলিটি নীতিমালার কারণে বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এখন নিয়েছে ধীরে চলো নীতি। ফলে সরকারের ‘ন্যাশনাল ফিশারিজ পলিসি ২০২৬’ কত দ্রুত এই প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা দূর করতে পারবে, তার ওপরই নির্ভর করছে এই খাতের আসল ভবিষ্যৎ।
তবে সেমিনারে মিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীর সমাপনী বক্তব্যে ছিল না কোনো আমলাতান্ত্রিক জটিলতার আভাস। বরং ছিল উদ্যোক্তাদের আশ্বস্ত করার দৃঢ় প্রত্যয়। তিনি সরাসরি স্বীকার করেন, বিনিয়োগকারীদের জন্য সুযোগ থাকলেও আমলাতান্ত্রিক এবং অবকাঠামোগত জটিলতার কারণে বাস্তবায়নের পথটি এখনো সহজ নয়।
আশিক চৌধুরী বলছিলেন, ‘মৎস্য ও সামুদ্রিক অর্থনৈতিক হাব তৈরি আমাদের জন্য একটি জাতীয় ম্যান্ডেট। গত কয়েক মাসে আমরা অংশীজনদের সঙ্গে বসেছি এবং সরকারের অভ্যন্তরীণ কার্যপদ্ধতিতে গতিশীলতা আনার চেষ্টা করেছি। আমি বিনিয়োগকারীদের নিশ্চিত করতে চাই, নতুন নেতৃত্বের অধীনে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে এখন একটি আন্তরিক ও সমন্বিত প্রচেষ্টা কাজ করছে, যা আপনাদের প্রতিটি সমস্যার দ্রুত সমাধান দেবে।’
কারিগরি অধিবেশনে এসিআই অ্যাগ্রোলিংক লিমিটেডের বিজনেস ডিরেক্টর ও ফিশারিজ স্পেশালিস্ট সৈয়দ এম ইশতিয়াক যখন তার উপস্থাপনা শুরু করলেন, পুরো মিলনায়তনে তখন পিনপতন নীরবতা। তিনি তথ্য দিয়ে দেখান, বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রের ‘সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড’ এবং আন্দামান সাগর-সংলগ্ন এলাকায় বিপুল পরিমাণ টুনা মাছের সন্ধান পাওয়া গেছে।
ষাট বা সত্তরের দশকের পর এই প্রথম বাংলাদেশ গভীর সমুদ্রের সম্পদ বাণিজ্যিকভাবে তোলার কথা ভাবছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩৫ সালের মধ্যে ২৫ থেকে ৫০টি আধুনিক লংলাইনার ভেসেল বা জাহাজের একটি নিজস্ব বহর তৈরি করা হবে; যা থেকে বছরে ৩০ থেকে ৫০ হাজার মেট্রিক টন টুনা শিকার করে বার্ষিক ৩০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার রপ্তানি আয় সম্ভব।
প্রাথমিকভাবে ১০টি ভেসেলের একটি বহরের জন্য প্রায় ১৫০০ মিলিয়ন টাকা বিনিয়োগ প্রয়োজন, যা থেকে বছরে ২৩০ মিলিয়ন টাকা নিট মুনাফা করা সম্ভব বলে তিনি জানালেন।
সেমিনারে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি খাত চিংড়ির সনাতন পদ্ধতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন মিডার সদস্য কমোডর তানজিম ফারুক। তিনি জানালেন, বাংলাদেশ চিংড়ি খাত থেকে বছরে ৫০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি আয় করলেও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় আমরা পিছিয়ে পড়ছি শুধু সনাতন চাষপদ্ধতির কারণে।
এ সংকট কাটাতে সেমিনারে একটি ডেডিকেটেড ‘চিংড়ি অর্থনৈতিক অঞ্চল’ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেওয়া হয়। আধুনিক প্রযুক্তির ইনডোর স্মার্ট ফার্মিং, বায়োফ্লক এবং রিসার্কুলেটিং অ্যাকুয়াকালচার সিস্টেম ব্যবহার করলে চিংড়ির উৎপাদন হেক্টরপ্রতি বর্তমানে ৫০০ কেজি থেকে বাড়িয়ে এক লাফে ২১ হাজার কেজিতে উন্নীত করা সম্ভব। এই বিশাল কর্মযজ্ঞে হ্যাচারি, ফিড মিল ও প্রক্রিয়াজাতকরণ প্লান্টে অর্ধ মিলিয়ন থেকে শুরু করে ২০ মিলিয়ন ডলারের বড় বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে।
জাইকা মিডা-এমপি প্রকল্পের বিশেষজ্ঞ ড. এচিগো মানাবু জাপানের বাজারে বাংলাদেশি সি-ফুডের চাহিদার কথা উল্লেখ করে কক্সবাজারের ‘জাপান সি-ফুড লিমিটেড’-এর একটি সফল বিজনেস মডেল তুলে ধরেন। এই প্রতিষ্ঠানটি বিদেশ থেকে কাঁচামাল এনে বাংলাদেশে প্রক্রিয়াজাত করে আবার রপ্তানি করছে। এ ছাড়া দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে সি-বাস, কোবিয়া, গ্রুপার মাছের খাঁচায় চাষ এবং সামুদ্রিক শৈবাল ও কাঁকড়া চাষের মতো উচ্চমূল্যের মেরিকালচার প্রকল্পে সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের নীতিগত সহায়তার আশ্বাস দেওয়া হয় সেমিনারে।
তবে সেমিনারে আসা দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞরা একটি বিষয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র বা জাপানের মতো প্রিমিয়াম বাজারে বাংলাদেশের মাছ পাঠাতে হলে আন্তর্জাতিক নিয়ম মানতেই হবে। বিশেষ করে অবৈধ ও অনিয়ন্ত্রিত মৎস্য আহরণ বন্ধ করা, আধুনিক ল্যান্ডিং সেন্টার ও কোল্ড-চেইন লজিস্টিকস গড়ে তোলা এবং প্রতিটি মাছ কোথা থেকে ধরা হলো তার ডিজিটাল ট্র্যাকিং বা ই-ট্রেসেবিলিটি নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক।
‘ন্যাশনাল ফিশারিজ পলিসি ২০২৬’ এবং ‘মেরিন ফিশারিজ অ্যাক্ট ২০২০’-এর কঠোর বাস্তবায়নের মাধ্যমে সরকার এই খাতকে এগিয়ে নিতে বদ্ধপরিকর। সেমিনারের হলরুম থেকে বের হওয়ার সময় একটি বিষয় স্পষ্ট বোঝা গেল— সঠিক বিনিয়োগ এবং সরকারি দপ্তরের লাল ফিতার দৌরাত্ম্য যদি সত্যি কমানো যায়, তবে তৈরি পোশাক খাতের পর এই ‘ব্লু-ইকোনমি’ই হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের আগামী দিনের ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির মূল কাণ্ডারি।




