কার্ডের ব্যবহারে তুঙ্গে নগদবিহীন লেনদেন
- ৫ বছরে লেনদেন বেড়েছে ২৪ হাজার কোটি

দেশে কার্ডের বিস্তারের সঙ্গে নগদবিহীন লেনদেনও দ্রুত বাড়ছে। গত পাঁচ বছরে ডেবিট, ক্রেডিট ও প্রিপেইড কার্ডের সংখ্যা ৯৭ শতাংশ বেড়ে ৫ কোটি ২৪ লাখ ছাড়িয়েছে। একই সময়ে এসব কার্ডে লেনদেনের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকার বেশি বা ১০৮ শতাংশ। তবে ডিজিটাল লেনদেনের এই সম্প্রসারণের পাশাপাশি সাইবার নিরাপত্তা, প্রতারণা, আর্থিক জ্ঞানের ঘাটতি ও নগদনির্ভরতার মতো চ্যালেঞ্জও রয়ে গেছে।
গতকাল বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে গত পাঁচ বছরে কার্ডের ব্যবহার, দেশীয় লেনদেন, বিদেশে বাংলাদেশিদের কার্ড ব্যবহার এবং বাংলাদেশে বিদেশি নাগরিকদের কার্ড ব্যবহারের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের আগস্টে দেশে মোট কার্ড ছিল ২ কোটি ৬৫ লাখ ৯৩ হাজার ৪৭৯টি। এর মধ্যে ডেবিট কার্ড ২ কোটি ৩৮ লাখ ৬৫ হাজার ৫৫৮টি, ক্রেডিট কার্ড ১৭ লাখ ৪৬ হাজার ৭৬৩টি এবং প্রিপেইড কার্ড ৯ লাখ ৮১ হাজার ১৫৮টি, তা ২০২৬ সালের জুলাইয়ে মোট কার্ডের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ কোটি ২৪ লাখ ১৪ হাজার ৪৯৭টিতে। এর মধ্যে ডেবিট কার্ড ৪ কোটি ৬ লাখ ৩০ হাজার ৪৭৫টি, ক্রেডিট কার্ড ২৭ লাখ ২ হাজার ৬৯৩টি এবং প্রিপেইড কার্ড ৯০ লাখ ৮১ হাজার ৩২৯টি। তথ্য বলছে, ২০২১ সালের আগস্টে ডেবিট, ক্রেডিট ও প্রিপেইড কার্ডে মোট লেনদেন ছিল ২২ হাজার ৭৮৮ কোটি ৭০ লাখ টাকা। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৭ হাজার ৪৮০ কোটি ৪০ লাখ টাকা। ফলে পাঁচ বছরে কার্ড লেনদেন বেড়েছে ১০৮ শতাংশ।
জুলাইয়ে দেশে ক্রেডিট কার্ডে মোট লেনদেন হয়েছে ৪ হাজার ৩২৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা। আগের মাস জুনে এ পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ৪৬১ কোটি টাকা। দেশীয় ক্রেডিট কার্ড লেনদেনের সবচেয়ে বড় অংশ হয়েছে ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে, ২ হাজার ১৭৬ কোটি টাকা বা মোটের ৫০ দশমিক ৩১ শতাংশ। খুচরা বিক্রয়কেন্দ্রে ৪৮৭ কোটি ৯০ লাখ, ইউটিলিটি বিল পরিশোধে ৩৭৭ কোটি ১০ লাখ এবং নগদ উত্তোলনে ৩৩৪ কোটি ১০ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে। জুলাইয়ে দেশীয় ক্রেডিট কার্ডের ৯০ দশমিক ৬৯ শতাংশ লেনদেন হয়েছে পণ্য ও সেবা কেনাকাটায়। নগদ উত্তোলনের অংশ ৭ দশমিক ৭৩ শতাংশ এবং অর্থ স্থানান্তরের অংশ ১ দশমিক ৫৮ শতাংশ। কার্ডভিত্তিক লেনদেনে ভিসার ব্যবহার সবচেয়ে বেশি; জুলাইয়ে দেশীয় ক্রেডিট কার্ড লেনদেনের ৭৬ দশমিক ২৫ শতাংশ হয়েছে ভিসা কার্ডে।
বিদেশেও বাংলাদেশি কার্ডধারীদের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য। জুলাইয়ে বাংলাদেশিদের ক্রেডিট, ডেবিট ও প্রিপেইড কার্ডে বিদেশে মোট ১৭ লাখ ৪৪ হাজার ৩০টি লেনদেন হয়েছে, যার আর্থিক পরিমাণ ৯৮৪ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এর মধ্যে ক্রেডিট কার্ডে ৫২৫ কোটি ৯০ লাখ, ডেবিট কার্ডে ৪০১ কোটি ১০ লাখ এবং প্রিপেইড কার্ডে ৫৭ কোটি ৮০ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে।
বিদেশে বাংলাদেশি ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারে সবচেয়ে বেশি লেনদেন হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে, ৯৩ কোটি ১০ লাখ টাকা। এরপর থাইল্যান্ডে ৬১ কোটি ৪০ লাখ, যুক্তরাজ্যে ৫৪ কোটি ৪০ লাখ এবং সিঙ্গাপুরে ৩৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে। ডেবিট কার্ডেও যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে বেশি, ৫৩ কোটি ১০ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে।
অন্যদিকে বিদেশে ইস্যু করা কার্ড ব্যবহার করে জুলাইয়ে বাংলাদেশে বিদেশি নাগরিকরা ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৪টি লেনদেন করেছেন, যার পরিমাণ ২৩৪ কোটি ৩০ লাখ টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫-এর জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুলাই সময়ে দেশে ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার ৪০ দশমিক ২৪ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে দেশের বাইরে ক্রেডিট কার্ডের লেনদেন বেড়েছে ৯ দশমিক ৭১ শতাংশ এবং বাংলাদেশে বিদেশি নাগরিকদের কার্ড ব্যবহারের ব্যয় বেড়েছে ২৪ দশমিক ১৪ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেছেন, ‘দেশে কিউআর কোডসহ সার্বিক ডিজিটাল লেনদেনের অবকাঠামো আগের তুলনায় অনেক শক্তিশালী হয়েছে। মার্চেন্ট পর্যায়ে পিওএস মেশিনের ব্যবহার বেড়েছে। একই সঙ্গে কার্ড ও ব্যাংকিং চ্যানেলের মধ্যে আন্তঃলেনদেনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। ফলে মানুষ এখন নগদ টাকার পরিবর্তে কার্ড ও অন্যান্য ডিজিটাল মাধ্যমে লেনদেনে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন। এটি দেশের নগদবিহীন অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্যকে আরও গতিশীল করছে।



