বিনিয়োগে স্থবিরতা, কর্মসংস্থান নিয়ে বাড়ছে শঙ্কা : ড. ফাহমিদা

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন। ফাইল ছবি
দেশে বেসরকারি বিনিয়োগে দীর্ঘদিনের স্থবিরতা আরও গভীর হয়েছে। একই সঙ্গে কমেছে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ও সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই)। শিল্পের উৎপাদনেও দেখা দিয়েছে সংকোচন। ফলে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
আজ বুধবার রাজধানীতে আয়োজিত এক সেমিনারে এ উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে অর্থনীতিবিদ ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুনের বক্তব্যে। ‘অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট ও উদীয়মান চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক এ সেমিনার আয়োজন করে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) ও সিপিডি।
ড. ফাহমিদা বলেছেন, বিনিয়োগ না বাড়লে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্ভব নয়। বিনিয়োগের মন্দাভাব ইতিমধ্যে কর্মসংস্থান ও মানুষের আয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
সিপিডির এ সম্মাননীয় ফেলো বললেন, গত এক দশকে বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির ২৩ থেকে ২৪ শতাংশের মধ্যে আটকে ছিল। ২০২৬ অর্থবছরে তা আরও কমে ২২ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। বিনিয়োগের এই দুর্বলতার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহেও।
তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুনে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে ৪ দশমিক ৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা গত ১০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। বিনিয়োগের উপযুক্ত পরিবেশ না থাকা এবং ব্যবসায়িক ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় উদ্যোক্তারা ঋণ নিয়ে নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন।
শুধু দেশীয় বিনিয়োগ নয়, বৈদেশিক বিনিয়োগের চিত্রও উদ্বেগজনক বলে জানান এই অর্থনীতিবিদ। তার মতে, ২০২৬ অর্থবছরে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ প্রায় ১৫ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে মূলধনী যন্ত্রপাতি ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানিও কমেছে। এসব সূচক দেশে নতুন শিল্প স্থাপন ও বিদ্যমান শিল্পে সম্প্রসারণের দুর্বলতাকেই নির্দেশ করছে।
বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত হওয়ার পেছনে কয়েকটি কারণ তুলে ধরেন ড. ফাহমিদা খাতুন। এরমধ্যে অন্যতম জ্বালানি সংকট। গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠান কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারছে না।
ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতাকেও বড় বাধা হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশে পৌঁছেছে। এর সঙ্গে সুশাসনের ঘাটতি যুক্ত হয়ে উদ্যোক্তাদের জন্য অর্থায়ন পাওয়ার পরিবেশকে আরও কঠিন করে তুলছে। অন্যদিকে উচ্চ সুদের হার, দুর্বল অবকাঠামো ও দুর্নীতির কারণে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় বেড়েছে। বর্তমানে নীতিসুদ ৯ দশমিক ৫ শতাংশ হওয়ায় ঋণের ব্যয়ও উদ্যোক্তাদের জন্য বড় চাপ তৈরি করছে।
ড. ফাহমিদা খাতুনের বক্তব্যে উঠে আসে, চলতি বছরের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে শিল্প উৎপাদন শূন্য দশমিক ২৮ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে। শিল্প খাতে এই সংকোচন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান—দুই ক্ষেত্রেই ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, বিনিয়োগের বর্তমান মন্দাভাব অব্যাহত থাকলে কর্মসংস্থান ও মানুষের আয় আরও চাপে পড়তে পারে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি টেকসই করতে হলে দ্রুত বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা জরুরি।
বিনিয়োগ পরিস্থিতির উন্নতির জন্য গভীর সংস্কারের ওপর জোর দিয়েছেন ড. ফাহমিদা। বিশেষ করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও ব্যাংকিং খাতের সংস্কারের পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়ার সুপারিশ করেন তিনি।
তার মতে, অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরতে অন্তত দুই বছর সময় লাগতে পারে। তবে বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করতে এখনই কার্যকর সংস্কার শুরু করা প্রয়োজন। কারণ বিনিয়োগ বাড়ানো ছাড়া উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও আয়—কোনোটিতেই টেকসই গতি ফিরবে না।







