নিজের টাকা রেখে ঋণ শোধে শেয়ারবাজারে
- রয়্যাল ফুটওয়্যারের কিউআইও বিতর্ক

শেয়ারবাজার থেকে কোয়ালিফায়েড ইনভেস্টর অফারের (কিউআইও) মাধ্যমে ১২ কোটি টাকা উত্তোলনের অনুমোদন চাইছে রয়্যাল ফুটওয়্যার। তবে আর্থিক তথ্যে দেখা গেছে, নিজস্ব ব্যাংক হিসাবে ২০ কোটি টাকার বেশি নগদ অর্থ রয়েছে। তা সত্ত্বেও কোম্পানিটি উত্তোলন করতে চাওয়া অর্থের প্রায় ৬৭ শতাংশই ঋণ পরিশোধে ব্যবহার করতে চায়। এ ছাড়া কোম্পানিটির উচ্চ মজুদ, হিসাবের অসংগতি ও কম রিটার্নের কারণে কিউআইও প্রস্তাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
রয়্যাল ফুটওয়্যারের ইস্যু ম্যানেজার প্রাইম ব্যাংক ইনভেস্টমেন্ট। কোম্পানিটি কিউআইওর ১২ কোটি টাকার মধ্যে ২ কোটি টাকার কাঁচামাল ক্রয়, ১ কোটি ৬৭ লাখ টাকার স্পেয়ার পার্টস কেনা, ৮ কোটি টাকা ঋণ পরিশোধ এবং বাকি ৩৩ লাখ টাকা আনুষঙ্গিক ব্যয়ে ব্যবহারের কথা জানিয়েছে।
কিন্তু আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, গত ৩১ ডিসেম্বর তাদের হাতে নগদ ও সমমানের সম্পদ ছিল ২০ কোটি ২৫ লাখ টাকা। আগের বছরের ৩০ জুনও ছিল ১৯ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। অর্থাৎ, নিজস্ব অর্থ দিয়ে ঋণ শোধের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তারা শেয়ারবাজারের টাকায় তা শোধ করতে চায়।
শুধু ঋণ পরিশোধই নয়, কাঁচামাল কেনার পরিকল্পনাও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। ৩১ ডিসেম্বর শেষে কোম্পানিটির মোট মজুদ পণ্য দাঁড়ায় ৫০ কোটি ৯২ লাখ টাকায়, যার মধ্যে কাঁচামালই ৪৩ কোটি ২৭ লাখ টাকার। বিপুল কাঁচামাল মজুদ থাকার পরও কিউআইও থেকে আরও ২ কোটি টাকার কাঁচামাল কেনার পরিকল্পনা করেছে তারা।
আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে কোম্পানিটির বিক্রি হয়েছে ৫২ কোটি ৯১ লাখ টাকা। এ সময়ে মজুদ পণ্য ছিল ৫০ কোটি ৯২ লাখ টাকা, যা ছয় মাসের বিক্রির প্রায় ৯৬ শতাংশ। আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৯২ কোটি ২৪ লাখ টাকার বিক্রির বিপরীতে মজুদ ছিল ৬১ কোটি ৫৫ লাখ টাকা।
বিশ্লেষকদের মতে, বিক্রির তুলনায় এত বেশি মজুদ পণ্য কার্যকর মূলধনে চাপ ফেলে ও ব্যবসায়িক ঝুঁকি বাড়ায়। অথচ কয়েক বছর আগেও এমন পরিস্থিতি ছিল না। ২০২০-২১ অর্থবছরে ৫৪ কোটি ৯৭ লাখ টাকার বিক্রির বিপরীতে মজুদ পণ্য ছিল মাত্র ৩ কোটি ৫৫ লাখ টাকা।
এ বিষয়ে রয়্যাল ফুটওয়্যারের কোম্পানি সচিব মো. আনোয়ার হোসাইন বলেছেন, ইডিএফ ঋণের মেয়াদ ৯০ দিন হওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার হিসাবে অর্থ সংরক্ষণ করা হয়েছে, যাতে প্রয়োজনে ঋণ পরিশোধ করা যায়। বিদেশি ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন বজায় রাখতে বিপুল পরিমাণ কাঁচামাল মজুদ রাখতে হয়।
তবে ডিএসইর এক পরিচালক এমন ব্যাখ্যার সঙ্গে একমত নন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বললেন, শতভাগ রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এত বিপুল মজুদ পণ্য পড়ে থাকার যৌক্তিক কারণ নেই। তা ছাড়া নিজস্ব হিসাবে ২০ কোটির বেশি নগদ অর্থ রেখে শুধু ঋণ শোধ করতে শেয়ারবাজারে আসার যৌক্তিকতা নেই।
লাভজনকতায় কোম্পানিটি খাতের তুলনায় পিছিয়ে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জুতাশিল্পে গড় রিটার্ন অন ইক্যুইটি (আরওই) ছিল ১১ দশমিক ২১ শতাংশ, যেখানে রয়্যাল ফুটওয়্যারের ছিল মাত্র ৫ দশমিক ৯৬ শতাংশ। আগের অর্থবছর খাতের গড় ১০ দশমিক ৩৪ শতাংশের বিপরীতে কোম্পানিটির আরওই ছিল ৭ দশমিক ৯০ শতাংশ। আর্থিক বিবরণীতে ঋণের হিসাব নিয়েও অসংগতি মিলেছে। ব্যালান্স শিট অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে স্বল্পমেয়াদি ঋণ বেড়েছে ২০ কোটি ৮৭ লাখ টাকা এবং পরবর্তী ছয় মাসে কমেছে ১৩ কোটি ১৫ লাখ টাকা। কিন্তু নগদ প্রবাহ বিবরণীতে নতুন ঋণগ্রহণ ৯৪ লাখ এবং ঋণ পরিশোধ দেখানো হয়েছে ১ কোটি ৫৩ লাখ টাকা।
এ বিষয়ে কোম্পানি সচিব বললেন, ঋণের একাংশ অপারেটিং এবং অন্য অংশ ফাইন্যান্সিং কার্যক্রমে দেখানোয় এ পার্থক্য তৈরি হয়েছে। তবে কেন ঋণ অপারেটিং কার্যক্রমে দেখানো হলো এবং ওই ঋণের সুদের হিসাব কীভাবে ফাইন্যান্সিং কার্যক্রমে চলে গেল— তার সদুত্তর তিনি দিতে পারেননি।
একটি শীর্ষ মার্চেন্ট ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, রয়্যাল ফুটওয়্যারের আর্থিক অবস্থার ভিত্তিতে ঋণকে অপারেটিং কার্যক্রমে দেখানোর সুযোগ নেই। আর্থিক হিসাবে নিশ্চয়ই অনিয়ম হয়েছে, অন্যথায় এমন অসংগতি থাকার কথা নয়।






