লাইসেন্স নবায়নের বাইরে ৬০ বীমা কোম্পানি
- গ্রাহকের প্রিমিয়াম প্রশ্নবিদ্ধ
- কোম্পানিগুলো আগের হারেই লাইসেন্স পেতে অনড়
- নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও কোম্পানিগুলোর রশি টানাটানিতে পুরো বীমা খাতে ব্যবসায়িক স্থবিরতা

সংগৃহীত ছবি
বর্ধিত ফির কারণে সাত মাসেও লাইসেন্স নবায়ন করেনি দেশের ৬০টির বেশি বীমা কোম্পানি। আগে প্রতি হাজার টাকা প্রিমিয়ামে নবায়ন ফি ছিল ১ টাকা। বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) তা আড়াই গুণ বাড়িয়ে ২ টাকা ৫০ পয়সা নির্ধারণ করেছে। আকস্মিক এই ফি বাড়ানোর প্রতিবাদেই কোম্পানিগুলো নবায়ন থেকে বিরত রয়েছে। ফলে দেশের সিংহভাগ বীমা কোম্পানি এখন কার্যত লাইসেন্সবিহীন অবস্থায় ব্যবসা পরিচালনা করছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও কোম্পানিগুলোর এমন রশি টানাটানিতে পুরো বীমা খাতে সৃষ্টি হয়েছে ব্যবসায়িক স্থবিরতা ও গভীর অনিশ্চয়তা।
বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন (বিআইএ) দাবি করছে, বীমা আইন অনুযায়ী তারা ২০২৫ সালের নভেম্বরের মধ্যেই ২০২৬ সালের জন্য ১ টাকা হারে ফি জমা দিয়ে লাইসেন্স নবায়নের আবেদন করেছিল। কিন্তু অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ গত ৪ ফেব্রুয়ারি এক গেজেটের মাধ্যমে এই ফি আড়াই গুণ বাড়িয়ে দেয়। ফলে ১০০ কোটি টাকা প্রিমিয়ামের একটি কোম্পানিকে ১০ লাখের পরিবর্তে ২৫ লাখ টাকা ফি গুনতে হচ্ছে। সরকারি চাপে ২০টি কোম্পানি বর্ধিত ফি দিয়ে লাইসেন্স নবায়ন করলেও বাকি ৬০টির বেশি কোম্পানি আগের হারেই লাইসেন্স পেতে অনড়।
অন্যদিকে, নিজস্ব অর্থায়নের সংকটের কথা তুলে ধরে আইডিআরএ বলেছে, সরকারের পক্ষ থেকে তাদের কোনো বাজেট দেওয়া হয় না। বীমা খাতের ডিজিটালাইজেশনসহ বিভিন্ন নতুন কার্যক্রমে ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় তারা বর্ধিত ফি আদায়ে অটল। এ বিষয়ে তারা অপেক্ষায় রয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত নির্দেশনার।
এমনিতেই সময়মতো দাবি আদায় না হওয়া এবং নানা হয়রানির কারণে বীমা খাতের প্রতি সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের আস্থাহীনতা রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, লাইসেন্স ঝুলিয়ে রাখার মতো ঘটনা এবং খাতা-কলমে বৈধ লাইসেন্স ছাড়া কোম্পানিগুলোর ব্যবসা পরিচালনার খবর মানুষের সেই আস্থাহীনতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। সবচেয়ে বড় শঙ্কার জায়গাটি হলো, এই লাইসেন্সবিহীন সময়ে ইস্যু করা নতুন পলিসিগুলোর আইনি ভিত্তি।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, লাইসেন্স নবায়ন না হওয়া পর্যন্ত কোম্পানিগুলোর ব্যবসায়িক কার্যক্রম এক ধরনের অবৈধ। ফলে এই অন্তর্বর্তী সময়ে যারা নতুন পলিসি খুলছেন, ভবিষ্যতে কোনো দুর্ঘটনা বা ক্ষতিপূরণের দাবি উঠলে আইনি মারপ্যাঁচে তাদের অধিকার রক্ষা কঠিন হয়ে পড়বে। এতে গ্রাহকরা আইনি সুরক্ষার বাইরে চলে যাবেন এবং তাদের জমানো অর্থ ফেরত পাওয়া চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে।
এরই মধ্যে এ জটিলতা নিরসনে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী তনয় কুমার সাহা গত ২০ এপ্রিল জনস্বার্থে একটি আইনি নোটিস পাঠিয়েছেন। নোটিসে স্পষ্ট বলা হয়েছে, নিয়ম মেনে ফি দেওয়ার পরও লাইসেন্স আটকে রাখা সম্পূর্ণ অবৈধ। দ্রুত এ সংকট নিরসন করে ২০১৮ সালের বিধি অনুযায়ী লাইসেন্স নবায়ন করা না হলে হাইকোর্টে করা হবে রিট পিটিশন।
জানতে চাইলে আইডিআরএর মুখপাত্র সাইফুন্নাহার সুমী আগামীর সময়কে বললেন, এ বিষয়ে কার্যক্রম চলমান রয়েছে। গ্রাহকরা আইনি জটিলতায় পড়বেন কি না, জানতে চাইলে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি িতনি।
অন্যদিকে, জেনিথ লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুরুজ্জামান জানালেন, ‘নিবন্ধন ব্যয় কমানোর জন্য আমরা একটি আবেদন করেছি। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ বিষয়টি নিয়ে পর্যালোচনা করছে বলে আমরা শুনতে পেয়েছি। আশা করছি, দ্রুত এর সমাধান হবে।’
গ্রাহকরা কোনো আইনি জটিলতায় পড়বেন কি না জানতে চাইলে তিনি বললেন, ‘আমরা যেহেতু বছর শেষ হওয়ার আগেই আবেদন করেছি, সে কারণে চলমান সময়ে যারা পলিসি কিনেছেন, তাদের কোনো আইনি জটিলতায় পড়তে হবে না।’
খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই রশি টানাটানি দ্রুত বন্ধ না হলে গ্রাহকরা বীমা খাত থেকে চিরতরে মুখ ফিরিয়ে নেবেন। এটি দেশের আর্থিক খাতের জন্য ডেকে আনবে এক ভয়াবহ বিপর্যয়।




