সাক্ষাৎকার
বীমা খাত বাঁচাতে দরকার একীভূতকরণ

মো. জালালুল আজিম
বীমা খাতের সংকট উত্তরণের পথ নিয়ে আগামীর সময়ের মুখোমুখি হয়েছিলেন প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্সের সিইও মো. জালালুল আজিম। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন অর্থনৈতিক প্রতিবেদক ওবায়দুর রহমান
প্রশ্ন: বীমা খাতের বর্তমান সার্বিক চিত্রকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
মো. জালালুল আজিম: বীমা খাতের বর্তমান অবস্থা খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়। অর্থনীতির অন্যান্য খাত যেভাবে বিকশিত হয়েছে, বীমা খাত সে গতি ধরে রাখতে পারেনি। ফলে জিডিপিতে বীমার অবদান বা পেনিট্রেশন রেট দিন দিন কমছে। সবচেয়ে বড় সংকট হলো ‘ইমেজ ক্রাইসিস’। অনেক কোম্পানি সময়মতো গ্রাহকের বীমাদাবি মেটাতে পারছে না। তা ছাড়া, জনগণের মধ্যে বীমাসচেতনতা সৃষ্টিতে সরকার বা কোম্পানিগুলোর সমন্বিত উদ্যোগের অভাব ছিল। সবচেয়ে বড় ভুল ছিল কোনোরকম ফিজিবিলিটি স্টাডি বা বাজার বিশ্লেষণ ছাড়া রাজনৈতিক বিবেচনায় একের পর এক কোম্পানির লাইসেন্স দেওয়া।
প্রশ্ন: অপরিকল্পিতভাবে লাইসেন্স দেওয়ার প্রভাব কতটা মারাত্মক হয়েছে?
মো. জালালুল আজিম: ব্যাংক খাতের চেয়েও বীমা খাতে এর ক্ষতিকর প্রভাব বেশি পড়েছে। জীবনবীমা একটি দীর্ঘমেয়াদি আমানত ও ঝুঁকির ব্যবসা। এখানে বিনিয়োগকারীদের যে ধৈর্য ও দৃষ্টিভঙ্গি থাকা দরকার, তা অনেক স্পন্সরেরই নেই। অভিজ্ঞ ও সৎ উদ্যোক্তার অভাবে কোম্পানিগুলো সঠিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে না। আমাদের পাশের দেশ ভারত যখন নব্বইয়ের দশকে বিদেশি বিনিয়োগের জন্য বীমা খাত উন্মুক্ত করে, তখন তারা বিশ্বের খ্যাতনামা বীমা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগ নিশ্চিত করেছিল। এতে তারা বিশ্বমানের প্রযুক্তি ও আধুনিক ব্যবস্থাপনা পেয়েছিল। কিন্তু আমাদের দেশে বর্তমানে ৮২টি কোম্পানি পরিচালনা করার মতো পর্যাপ্ত প্রফেশনালস নেই। আমার মতে, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ১০টি লাইফ এবং ১০টি জেনারেল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিই যথেষ্ট ছিল।
প্রশ্ন: বিদেশি কোম্পানিগুলো ভালো করছে অথচ স্থানীয় কোম্পানিগুলো ব্যর্থ হচ্ছে কেন?
মো. জালালুল আজিম: এর মূল কারণ পেশাদারিত্ব ও দক্ষ জনবল। আইডিআরএর নিয়ম অনুযায়ী যোগ্যতাসম্পন্ন সিইও ১১টি কোম্পানিতে আছে।
প্রশ্ন: আইডিআরএ সমস্যাগ্রস্ত কোম্পানির সম্পদ বিক্রি করে দাবি মেটানোর উদ্যোগ নিয়েছে। এতে কি আস্থা ফিরবে?
মো. জালালুল আজিম: এটি একটি সাময়িক বা সীমিত সমাধান। সাড়ে ১০ লাখেরও বেশি মানুষ বর্তমানে বীমা দাবির টাকা পাচ্ছেন না। দুয়েকটি কোম্পানির স্থাবর সম্পদ বিক্রি করে এই বিশাল অর্থ পরিশোধ করা অসম্ভব। আস্থা ফেরাতে হলে গোড়ায় হাত দিতে হবে। ব্যাংক খাতের মতো বীমা খাতেই ‘রেজল্যুশন অর্ডিন্যান্স’ এনে দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ কোম্পানিগুলোকে চিহ্নিত করতে হবে। প্রয়োজনে বেশ কিছু কোম্পানিকে মার্জার (একীভূত) করতে হবে বা আইডিআরএর নিয়ন্ত্রণে এনে পুনর্গঠন করতে হবে।
প্রশ্ন: বীমা খাতকে টেকসই ও বিশ্বমানের করতে আপনার পরামর্শ কী?
মো. জালালুল আজিম: প্রথমত, কোম্পানির সংখ্যা যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনতে হবে। দ্বিতীয়ত, বীমা আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করে গ্রাহকের দাবি সময়মতো পরিশোধে বাধ্য করতে হবে। তৃতীয়ত, পুরো খাতকে দ্রুত ডিজিটাল রূপান্তরের আওতায় আনতে হবে— যেন গ্রাহক ঘরে বসেই প্রিমিয়াম থেকে শুরু করে ক্লেইম সেটেলমেন্টের হিসাব দেখতে পারেন। স্বচ্ছতা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারলে বীমা খাতের প্রতি মানুষের হারানো আস্থা নিশ্চিতভাবেই ফিরিয়ে আনা সম্ভব।



