কর্মসংস্থান ছাড়া প্রবৃদ্ধি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দেশে সামষ্টিক অর্থনৈতিক কর্মক্ষমতা এবং কর্মসংস্থানের ফলাফলের বৈপরীত্য বিরাজ করছে। এতে প্রবৃদ্ধি মডেলের বিরোধিতা সবচেয়ে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। কেননা মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি হলেও সেই তুলনায় হয়নি কর্মসংস্থান। ২০১৫-২৩ সাল পর্যন্ত জিডিপি বার্ষিক গড় প্রায় সাড়ে ৬ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও কভিড-১৯-এর কারণে ২০২১ সালে এতে কিছুটা পতন ঘটে। এ ছাড়া কর্মসংস্থানে শিল্প খাতের অংশ ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ২০ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১৭ দশমিক ৩৭ শতাংশে নেমে এসেছে। প্রকৃত অর্থে, উৎপাদন বৃদ্ধি সত্ত্বেও বিগত বছরগুলোয় শিল্প খাতে কর্মসংস্থান কমেছে। ফলে যুব কর্মসংস্থানে সৃষ্টি হয়েছে সংকট। পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) মূল্যায়নে উঠে এসেছে এমন চিত্র। ফাইভ ইয়ার স্ট্র্যাটেজিক ফ্রেমওয়ার্কে বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।
জিইডির সদস্য (সচিব) ড. মঞ্জুর হোসেন আগামীর সময়কে বলেছেন, প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের এই বিচ্ছিন্নতা সংকট তৈরি করেছে। কেননা যে হারে বেকার বেড়েছে, সে হারে কর্মসংস্থান না বেড়ে উল্টো কমেছে। কয়েক বছর ধরেই কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি ঘটছে। এর মানে হলো, গত দশকের সামষ্টিক অর্থনৈতিক অর্জনগুলোর বণ্টন দারিদ্র্য কমানোর ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্যভাবে কম ন্যায়সংগত ছিল।
জিইডি বলেছে, বাংলাদেশের উন্নয়ন কর্মসূচির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কর্মসংস্থান। বিশাল ও ক্রমবর্ধমান কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত, উৎপাদনশীল, লাভজনক এবং সুরক্ষিত কর্মসংস্থান সৃষ্টির অর্থনৈতিক সক্ষমতা শুধু একটি অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য নয়; এটি সেই প্রধান প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে প্রবৃদ্ধির সুফল বণ্টিত হয়। দারিদ্র্য স্থায়ীভাবে কমানো এবং সামাজিক সংহতি বজায় থাকে। গত তিন দশকে বাংলাদেশের উন্নয়নের কাহিনি নানা মাপকাঠিতে এক অসাধারণ সাফল্যের গল্প। ২০০০-এর দশকের শুরু থেকে জিডিপি বার্ষিক গড়ে ৬ শতাংশের বেশি হারে বেড়েছে। মাথাপিছু আয় ২০০৪ সালের ৪২১ মার্কিন ডলার থেকে বেড়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২ হাজার ৭৬৯ মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে। উচ্চদারিদ্র্যসীমা ব্যবহার করে দারিদ্র্যের হার ২০০০ সালের ৪৮ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে কমে ২০২২ সালে আনুমানিক ১৮ দশমিক ৭ শতাংশে নেমে এসেছে। এই অর্জনগুলো বাস্তব এবং তা লাখ লাখ বাংলাদেশির জীবনযাত্রার বস্তুগত উন্নতি ঘটিয়েছে। কিন্তু সে অনুযায়ী কর্মসংস্থান না হওয়ায় এই অর্জনগুলোর আরও বেশি সুফল মেলেনি।
জিইডি আরও বলেছে, শিল্প উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি ব্যাপক হারে শ্রম শোষণের পরিবর্তে মূলধন বৃদ্ধি এবং স্বয়ংক্রিয়করণের মাধ্যমেই হয়েছে। তৈরি পোশাক খাত, যা পণ্য রপ্তানির প্রায় ৮২-৮৫ শতাংশ এবং যেখানে আনুমানিক ৩৭ লাখ কর্মী নিযুক্ত, তা শিল্পক্ষেত্রে কর্মসংস্থানের প্রধান চালিকাশক্তি হলেও একই সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়করণের মাধ্যমে এ খাতে নারী কর্মীর অংশ সংকুচিত হচ্ছে। এটি বর্ধিত নিয়মকানুন ও ক্রেতার চাপের ঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছে। শ্রমশক্তি সমীক্ষা (এলএফএস) ২০২৪ অনুযায়ী, মোট কর্মসংস্থানে কৃষির অংশ ৪৪ দশমিক ৬৭ শতাংশ, যা জিডিপির অনুপাতে পূর্বাভাসের চেয়ে অনেক বেশি। এটি উচ্চ উৎপাদনশীল খাতে রূপান্তরের পরিবর্তে উদ্বৃত্ত শ্রমকে কম উৎপাদনশীল কৃষি কার্যক্রমে যুক্ত করেছে।







