‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ পেরিয়ে ‘ইনোভেট ইন বাংলাদেশ’

সংগৃহীত ছবি
বাংলাদেশের স্মার্টফোন শিল্প এখন প্রাথমিক পর্যায়ের অ্যাসেম্বলি থেকে ধীরে ধীরে আরও শক্তিশালী ম্যানুফ্যাকচারিং সক্ষমতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এই অগ্রযাত্রার পরবর্তী ধাপ নির্ভর করবে লোকাল ভ্যালু অ্যাডিশন বাড়ানো, টেকনোলজিকাল ক্যাপাবিলিটি তৈরি, ইনোভেশন এবং বাংলাদেশ থেকেই নতুন টেকনোলজি সলিউশন ডেভেলপ করার সক্ষমতার ওপর।
আইস্মার্টইউ টেকনোলজি বিডি লিমিটেডের সিইও রেজওয়ানুল হকের মতে, দেশের স্মার্টফোন শিল্পের জন্য ইতোমধ্যেই একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশে লোকালি হ্যান্ডসেট অ্যাসেম্বলি ২০১৭ সালে শুরু হলেও সময়ের সঙ্গে এই সক্ষমতা শুধু অ্যাসেম্বলির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। সারফেস-মাউন্ট টেকনোলজি (এসএমটি), প্যাকেজিং ও বেসিক চার্জার অ্যাসেম্বলির মতো কাজেও তা বিস্তৃত হয়েছে। ব্যাটারি অ্যাসেম্বলিও শুরু হয়েছে, যদিও বর্তমানে এর মূল ফোকাস ফিচার ফোনে।
‘বাংলাদেশে শুরুটা অ্যাসেম্বলি দিয়ে হলেও ধীরে ধীরে লোকাল ক্যাপাবিলিটি এসএমটি, প্যাকেজিং, বেসিক চার্জার অ্যাসেম্বলি এবং কিছু ক্ষেত্রে ব্যাটারি অ্যাসেম্বলিতেও বিস্তৃত হয়েছে। ফলে এই শিল্পকে আরও এগিয়ে নেওয়ার জন্য এখন একটি ভালো ভিত্তি তৈরি হয়েছে,’ তিনি বলেছেন।
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে লোকালি ১৬.৭৪ লাখ হ্যান্ডসেট উৎপাদন করা হয়েছে। এই উৎপাদন সক্ষমতা দেখায়, দেশ ইতোমধ্যেই হ্যান্ডসেট ম্যানুফ্যাকচারিংয়ে একটি উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে পৌঁছেছে। এখন সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আরও অ্যাডভান্সড টেকনোলজি, টেকনিক্যাল স্কিল এবং উচ্চমূল্যের উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি করা।
রেজওয়ানুল হকের মতে, এ পর্যায়ে যেতে হলে অ্যাডভান্সড টেকনোলজি ও টেকনিক্যাল স্কিলে আরও ইনভেস্টমেন্ট, দীর্ঘমেয়াদি পলিসি সাপোর্ট এবং বড় স্কেলের প্রোডাকশন প্রয়োজন। বিশেষ করে সেমিকন্ডাক্টরের মতো হাই-ভ্যালু সেক্টরে প্রবেশ করতে হলে বিচ্ছিন্ন কয়েকটি উদ্যোগের বদলে একটি শক্তিশালী ও সমন্বিত ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে হবে।
এক্ষেত্রে এক্সপোর্টও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ অ্যাডভান্সড কম্পোনেন্ট উৎপাদনকে কমার্শিয়ালি ভায়েবল করতে যে পরিমাণ স্কেল প্রয়োজন, তা শুধু ডোমেস্টিক মার্কেট থেকে পাওয়া কঠিন হতে পারে। এক্সপোর্ট-ফোকাসড ইলেকট্রনিক্স ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের জন্য উপযুক্ত পলিসি সাপোর্ট থাকলে বাংলাদেশ হাই-ভ্যালু কম্পোনেন্ট উৎপাদন এবং গ্লোবাল টেক ভ্যালু চেইনে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে।
‘ম্যানুফ্যাকচারিং বাংলাদেশকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইন্ডাস্ট্রিয়াল বেস দিয়েছে। এখন পরবর্তী সুযোগ হলো, এই বেসের ওপর আরও নলেজ এবং ইঞ্জিনিয়ারিং ক্যাপাবিলিটি তৈরি করা,’ তিনি বলেছেন।
তার মতে, সফটওয়্যার লোকালাইজেশন, প্রোডাক্ট টেস্টিং, কোয়ালিটি ইঞ্জিনিয়ারিং, ইউজার এক্সপেরিয়েন্স ডেভেলপমেন্ট, ডেটা অ্যানালাইসিস এবং আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের মতো ক্ষেত্রগুলো বাংলাদেশের জন্য তুলনামূলকভাবে দ্রুত সক্ষমতা তৈরির সুযোগ তৈরি করতে পারে। সময়ের সঙ্গে এই দক্ষতা প্রোডাক্ট ইঞ্জিনিয়ারিং, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডিজাইন এবং রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের মতো আরও জটিল ক্ষেত্রেও বিস্তৃত হতে পারে।
এসব ক্যাপাবিলিটি তৈরি করতে ইউনিভার্সিটি, টেক কোম্পানি ও ম্যানুফ্যাকচারিং ইন্ডাস্ট্রির মধ্যে আরও শক্তিশালী কো-অপারেশন প্রয়োজন। পাশাপাশি সায়েন্স, টেকনোলজি, ইঞ্জিনিয়ারিং ও ম্যাথের মতো ক্ষেত্রে স্কিল ডেভেলপমেন্টে ধারাবাহিক বিনিয়োগও গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে স্মার্টফোন দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠায়, ইউজারদের প্রত্যাশাও দ্রুত বদলাচ্ছে। স্মার্টফোন এখন শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি ক্যামেরা, শেখার প্ল্যাটফর্ম, কাজের সঙ্গী, ফিনান্সিয়াল সার্ভিস এবং বিভিন্ন ডিজিটাল সেবায় প্রবেশের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
তাই শিল্পের উন্নয়নের সঙ্গে অ্যাফোর্ডেবিলিটিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। চ্যালেঞ্জ হলো, লোকাল প্রোডাকশনে বিনিয়োগ ধরে রাখার পাশাপাশি স্মার্টফোনকে কাস্টমারদের নাগালের মধ্যে রাখা এবং একই সঙ্গে একটি স্টেবল ও সাপোর্টিভ পলিসি এনভায়রনমেন্ট নিশ্চিত করা। লোকাল ভ্যালু অ্যাডিশন ও প্রোডাকশন স্কেল বাড়লে সময়ের সঙ্গে কস্ট এফিশিয়েন্সিও উন্নত হতে পারে।
একটি স্মার্টফোন ব্র্যান্ডের সাফল্যও শুধু কতগুলো ডিভাইস বিক্রি হলো, তা দিয়ে মাপা উচিত নয়। প্রোডাক্টের কোয়ালিটি, ডিউরেবিলিটি, রিলেভেন্ট ইনোভেশন, সফটওয়্যার এক্সপেরিয়েন্স, আফটার-সেলস সার্ভিস এবং কাস্টমারের বাস্তব চাহিদা কতটা পূরণ হচ্ছে—এসব বিষয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
রেজওয়ানুল হকের মতে, ‘সাফল্য শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে একটি ব্র্যান্ড তার কাস্টমারকে কতটা কনসিসটেন্টলি ভ্যালু ও ভালো এক্সপেরিয়েন্স দিতে পারছে তার ওপর।’
স্মার্টফোন ইন্ডাস্ট্রিতে পরিবর্তনের আরেকটি বড় ক্ষেত্র হলো আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স। তবে তার মতে, শুধু নতুন নতুন ফিচার যোগ করার জন্য এআই ব্যবহার না করে, কাস্টমারের বাস্তব সমস্যার সমাধানে এর ব্যবহারকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
‘একটা স্পেসিফিকেশন শিটে কতগুলো ফিচার আছে, সেটা দিয়ে এর ভ্যালু মাপা উচিত নয়। বরং দেখতে হবে, এই ফিচারগুলো আসলেই মানুষের কোনো বাস্তব সমস্যা সমাধান করছে কি না এবং দৈনন্দিন জীবনে ঠিক কতটা কাজে লাগছে।’
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ভাষাগত অ্যাক্সেসিবিলিটি এআইয়ের একটি বড় সুযোগ তৈরি করতে পারে। যেসব এআই টুল ইউজারকে বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষাতেই ন্যাচারালি কমিউনিকেট করতে, তথ্য বুঝতে এবং বিভিন্ন কাজ করতে সাহায্য করবে, সেগুলো আরও বেশি মানুষের জন্য টেকনোলজির ব্যবহার সহজ করতে পারে।
একই সঙ্গে স্মার্টফোনের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সাইবার সিকিউরিটি, প্রাইভেসি প্রটেকশন এবং রেসপনসিবল প্রোডাক্ট লাইফসাইকেল ম্যানেজমেন্টও আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। মানুষ ব্যাংকিং, পেমেন্ট, কাজ এবং ব্যক্তিগত তথ্য সংরক্ষণের জন্য স্মার্টফোনের ওপর ক্রমেই বেশি নির্ভর করছে। ফলে সিকিউরিটি এখন আর আলাদা কোনো ফিচার নয়; এটি স্মার্টফোন এক্সপেরিয়েন্সের একটি বেসিক অংশ।
রেজওয়ানুল হক মনে করেন, প্রোডাক্ট ডিউরেবিলিটি, রিপেয়ারেবিলিটি এবং রিসাইক্লিং আরও ভালোভাবে নিশ্চিত করতে প্রোডিউসার, কাস্টমার, রিসাইক্লার ও পলিসিমেকারদের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো প্রয়োজন।
একইভাবে বাংলাদেশের টেকনোলজিকাল অগ্রযাত্রাকেও শুধু ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে হবে না। সাপ্লায়ার ও উৎপাদন থেকে শুরু করে ইঞ্জিনিয়ারিং, সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, প্রোডাক্ট ডিজাইন এবং ইনোভেশন—পুরো ইকোসিস্টেমকে একসঙ্গে শক্তিশালী করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ থেকে ধীরে ধীরে ‘ডেভেলপড অ্যান্ড ইনোভেটেড ইন বাংলাদেশ’-এর দিকে এগিয়ে যাওয়া।
‘আমি দেখব, বাংলাদেশ লোকাল ভ্যালু অ্যাডিশন কতটা বাড়াতে পেরেছে, একটি শক্তিশালী সাপ্লায়ার ইকোসিস্টেম তৈরি করতে পেরেছে কিনা, সফটওয়্যার, এআই, প্রোডাক্ট ডেভেলপমেন্ট, টেস্টিং, ডিজাইন এবং আর অ্যান্ড ডি-তে ইঞ্জিনিয়ারদের জন্য আরও সুযোগ তৈরি করতে পেরেছে কিনা এবং বাংলাদেশে তৈরি ইলেকট্রনিক্স পণ্যের জন্য এক্সপোর্ট কতটা বাড়াতে পেরেছে।’
সব মিলিয়ে বাংলাদেশের স্মার্টফোন ইন্ডাস্ট্রির ভবিষ্যৎ শুধু ডিভাইস প্রোডাকশনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর সঙ্গে যুক্ত হবে লোকাল ভ্যালু অ্যাডিশন, দক্ষ জনবল তৈরি, ইঞ্জিনিয়ারিং সক্ষমতা, সফটওয়্যার ও এআই ডেভেলপমেন্ট, গবেষণা এবং নতুন টেকনোলজি সলিউশন তৈরির সক্ষমতা। এমন একটি ইকোসিস্টেম তৈরি করাই হবে পরবর্তী বড় ধাপ, যেখানে বাংলাদেশ শুধু একটি ম্যানুফ্যাকচারিং ডেস্টিনেশন নয়, বরং গ্লোবাল টেক কোম্পানিগুলোর জন্য ডেভেলপমেন্ট ও ইনোভেশনের সম্ভাবনাময় কেন্দ্র হিসেবেও জায়গা করে নিতে পারবে।



