বেসরকারি নিরাপত্তা সেবায় আমার ৩০ বছরের পথচলা

সংগৃহীত ছবি
প্রতিবছর ২৪ জুলাই পালিত হয় আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা কর্মকর্তা দিবস। এই বিশেষ দিনটিকে সামনে রেখে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান বেসরকারি নিরাপত্তা খাতের তিন দশকের অভিজ্ঞতা, চ্যালেঞ্জ ও সাফল্যের বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরছেন এলিট সেফটি অ্যান্ড সিকিউরিটি সার্ভিসেস লিমিটেডের (এলিট ফোর্স) প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শরীফ আজিজ।
দীর্ঘ ২৫ বছরের বেশি সময় ধরে সামরিক বাহিনীতে বা ইউনিফর্ম সার্ভিসে সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন শেষে ১৯৯৪-৯৫ সালের দিকে আমি বেসরকারি নিরাপত্তা সেবা ব্যবসার জগতে প্রবেশ করি। পেশাগত জীবনের সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে পরবর্তীতে আমি ইন্টিগ্রেটেড সিকিউরিটি সার্ভিসেস লিমিটেড এবং এলিট সিকিউরিটি সার্ভিসেস লিমিটেড (এলিট ফোর্স) প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হই। আল্লাহর অশেষ রহমতে আজ পর্যন্ত আমি ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে প্রাইভেট সিকিউরিটি সেক্টরে যুক্ত আছি। বর্তমানে একা আমাদের এলিট ফোর্সেই ২৩ হাজারের বেশি কর্মী অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে কাজ করছেন, যাদের একটি বড় অংশ দেশের প্রত্যন্ত ও গ্রামীণ অঞ্চল থেকে আসা। এর পাশাপাশি অনেক অভিজ্ঞ ও প্রবীণ অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্যদেরও আমরা কর্মে যুক্ত করেছি। আজ সারা দেশে ৮০০টির বেশি ছোট-বড় নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। আমাদের এই খাতটি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দেশের প্রায় ১২ লাখ বেকার মানুষের জন্য এক বিশাল কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে, যা সামাজিক উন্নয়ন ও দারিদ্র্য বিমোচনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বাংলাদেশের বেসরকারি নিরাপত্তা কোম্পানিগুলোর অবদান কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা বলে বোঝানো কঠিন। আজ দেশের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মিশন, দূতাবাস, হাইকমিশন, জাতিসংঘের সংস্থা, আন্তর্জাতিক এনজিও, গার্মেন্টস ও ফার্মাসিউটিক্যালস শিল্প, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ এমন কোনো প্রতিষ্ঠান পাওয়া যাবে না যেখানে আমাদের কর্মীরা নেই। বিশেষ করে ব্যাংকিং খাতে আমাদের সেবার কথা উল্লেখ করতেই হয়। প্রতিদিন আমাদের ৫০০টির বেশি বিশেষায়িত ও সাঁজোয়া যানবাহনের মাধ্যমে আনুমানিক ১৫ থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা নিরাপদে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পরিবহন করা হয়। একই সঙ্গে সারা দেশের ২৫ হাজারের বেশি এটিএম বুথে প্রতিদিন নগদ অর্থ সরবরাহ ও পুনঃসংযোজন আমরাই পরিচালনা করি। আজ যদি বেসরকারি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের সেবা বন্ধ করে দেয়, তবে দেশের পুরো এটিএম ব্যবস্থা ও নগদ লেনদেন কার্যত অচল হয়ে পড়বে। এটি এমন এক বিশাল ও দুরূহ অপারেশন, যা রাতারাতি সরকারি কোনো বাহিনীর পক্ষে গ্রহণ করা একেবারেই বাস্তবসম্মত নয়।
আমরা অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে বলতে পারি, এলিট ফোর্স বর্তমানে ১০০টির বেশি বিদেশি ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করছে। আমরা বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠান যেমন গুগল, মেটা (ফেসবুক), নেটফ্লিক্স, সিএনএন, আইকিয়া, সিমেন্স, ডেলোয়েট, পিডব্লিউসি, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক, সিটিব্যাংক এনএ, গ্রামীণফোন, রবির মতো ক্লায়েন্টদের আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তা সেবা দিয়ে আসছি। গত কয়েক বছরে এলিট ফোর্স এককভাবে জাতীয় কোষাগারে ভালো পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা রেমিট্যান্স হিসেবে জমা দিয়েছে। ট্রেডিশনাল গার্ড সার্ভিস ছাড়াও আমরা ইমার্জেন্সি রেসপন্স, রিমোট এরিয়া অপারেশন, সমুদ্র নিরাপত্তা, ক্লোজ প্রটেকশন, আর্মড সিকিউরিটি এবং কে-নাইন ডগ স্কোয়াডের মতো সেবা চালু করেছি। আমাদের কে-নাইন স্কোয়াডে ৬০টির বেশি প্রশিক্ষিত কুকুর রয়েছে, যা বেসরকারি খাতে এক বিরল অর্জন। এ ছাড়া বারিধারায় আমাদের ৭ তলা বিশিষ্ট আধুনিক করপোরেট সদর দপ্তর, একাধিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, ২৪ ঘণ্টার মনিটরিং সেল এবং গবেষণা ও উন্নয়ন সেন্টার রয়েছে।
দেশের শীর্ষ ব্যক্তিত্বদের সেবা দেওয়ার ধারাবাহিকতায় আমরা শান্তিতে নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে দীর্ঘ দিন ধরে পারসোনাল গানম্যান সেবা দিয়ে আসছি এবং তার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আমাদের ২০০টির বেশি সিকিউরিটি গার্ড নিয়োজিত রয়েছে। এ ছাড়া দেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি, মন্ত্রী, রাষ্ট্রদূত ও সামরিক প্রধানগণ আমাদের অবকাঠামো পরিদর্শন করে ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। ব্যবসার পাশাপাশি আমরা সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে একটি চ্যালিটি ফান্ড গঠন করেছি। এর মাধ্যমে আমরা প্রতিদিন ১৫০-২০০ দুস্থ বাচ্চাকে দুপুরে খাবার খাওয়াই, প্রত্যন্ত অঞ্চলে ৫০টির বেশি কম্পিউটারসহ ল্যাব স্থাপন করেছি, প্রহরীদের সন্তানদের উপবৃত্তি ও টিউশন ফি দিচ্ছি, রক্তদান কর্মসূচি পরিচালনা করছি এবং ফ্রি মেডিকেল ক্লিনিকসহ বেশ কিছু এতিমখানা ও বৃদ্ধাশ্রম পরিচালনা করে আসছি।
গত জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এর সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় যখন দেশে পুলিশ নিষ্ক্রিয় ছিল, তখন প্রাইভেট সিকিউরিটি সার্ভিসেস কোম্পানিগুলো এক অসাধারণ ভূমিকা রেখেছিল। ঐ সময় আমরা গুলশান, বনানী, বারিধারা, বসুন্ধরা ও উত্তরা এলাকায় প্রতি রাতে বিনামূল্যে গাড়িসহ ১০-১২টি নাইট টহল প্রদান করেছি। এমনকি ভাটারা থানা সম্পূর্ণরূপে পুড়ে যাওয়ার পর আমরা তাদের দাপ্তরিক ও দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা করতে সরাসরি সহায়তা করেছি। তবে দেশ ও সমাজের জন্য এত বড় অবদান রাখা সত্ত্বেও আমাদের এই পেশাটি সামাজিকভাবে এখনো উপযুক্ত সম্মান পাচ্ছে না। সরকার ঘোষিত নূন্যতম বেতন মাত্র ৯ হাজার টাকা (প্রায় ৬০ ডলার), যা এই যুগে অত্যন্ত অপ্রতুল। ফলে এ পেশার প্রতি নতুন প্রজন্মের আকর্ষণ কম এবং আমাদের এই মেহনতি নিরাপত্তাকর্মীরা আজও অবহেলিত রয়ে গেছেন।
আমার নিজের কথা বলতে গেলে, আমি এই দেশের ৭-৮ জন রাষ্ট্রপতির এডিসি, পিএস এবং প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্টের (পিজিআর) কমান্ডিং অফিসার হিসেবে বহু বছর দায়িত্ব পালন করেছি। দেশে-বিদেশে উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করা সত্ত্বেও অবসর নেওয়ার পর প্রায় ২০-২৫টি ব্যবসায়িক উদ্যোগে ব্যর্থ হয়ে শেষ পর্যন্ত এই সিকিউরিটি সেবায় এসে সাফল্য পেয়েছি। আজ প্রতি মাসে ২৩ হাজার কর্মী ও প্রহরীদের বেতন বাবদ আমাদের প্রায় ২০ থেকে ২২ কোটি টাকা দিতে হয়।
পরিশেষে, বাংলাদেশে আধুনিক ও সুসংগঠিত সিকিউরিটি সার্ভিস ব্যবস্থার জনক গ্রুপ ক্যাপ্টেন (অব.) তাহের কুদ্দুসকে আমি গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি। প্রায় ৪০ বছর আগে তিনি পুরোনো ‘দারোয়ান বা চৌকিদার’ ধারণাকে বদলে দিয়ে দেশে আধুনিক ইউনিফর্মধারী সিকিউরিটি ব্যবস্থার সূচনা করেছিলেন। আমরা সরকারকে আন্তরিক অনুরোধ জানাই, তারা যেন এই মহান ব্যক্তিকে ‘ফাদার অব প্রাইভেট সিকিউরিটি ইন্ডাস্ট্রি অব বাংলাদেশ’ হিসেবে জাতীয় পর্যায়ে সম্মানিত করেন। একই সঙ্গে সব প্রতিকূলতা ও অর্থনৈতিক বাধা পেরিয়ে নিরলস সেবা দিয়ে যাওয়ার জন্য দেশের ৮০০ সিকিউরিটি কোম্পানির সম্মানিত মালিক ও কর্মীদের জানাই আমার আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভকামনা।




