টমেটোর বাজারে আগুন, সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিতে বাড়ল ১৪০ টাকা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
রাজধানীর নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে অধিকাংশ জিনিসের দাম স্বাভাবিক ও স্থিতিশীল থাকলেও আকস্মিকভাবে বেড়েছে টমেটোর বাজার, যেখানে মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে টমেটোর দাম কেজিতে রেকর্ড ১৪০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়ে ঠেকেছে খুচরা পর্যায়ে ২৪০ টাকায়।
বিগত সপ্তাহের চরম অস্থিরতার পর এই সপ্তাহে এসে চাল, ভোজ্যতেল, ডাল ও মাংসের মতো প্রধান প্রধান পণ্যের দাম একই অবস্থানে থমকে থেকে ক্রেতাদের মনে কিছুটা স্বস্তি দিলেও টমেটোর এই আকাশচুম্বী মূল্যবৃদ্ধি নিম্ন ও মধ্যবিত্তদের পকেট ফাঁকা করে দিচ্ছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, গত সপ্তাহে যে টমেটো প্রতি কেজি ১০০ থেকে ১২০ টাকা কেজি বিক্রি হয়েছিল, তা সরবরাহ সংকটের অজুহাত এবং আমদানি করা টমেটোতে অধিক পরিমাণে নষ্ট বের হওয়ায় চলতি সপ্তাহে এক লাফে গিয়ে দাঁড়িয়েছে ২৪০ টাকায়।
বাজারের এই পরিস্থিতি নিয়ে ক্রেতা মিজানুর রহমান তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, ‘চাল, ডাল বা তেলের দামটা নতুন করে না বাড়ায় কিছুটা রক্ষা হয়েছিল, কিন্তু টমেটোর দাম এক সপ্তাহে ১০০ টাকা থেকে ২৪০ টাকা হয়ে যাওয়াটা মগের মুল্লুক ছাড়া আর কিছুই না। এভাবে চলতে থাকলে টমেটো খাওয়া ছাড়াই থাকতে হবে।’
অন্যদিকে বিক্রেতারা দাবি করছেন, আড়ত বা পাইকারি বাজারে পণ্যটির সরবরাহ কম থাকায় চড়া দামে কিনে তাদের বেশি দামেই বিক্রি করতে হচ্ছে। বাজারের এই আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে খুচরা বিক্রেতা জাহাঙ্গীর মিয়া বলেছেন, ‘টমেটোর দাম বেশি বাইড়া যাওয়ায় সাধারণ কাস্টোমার এখন আর কেজি হিসাবে নিতাসে না। সবাই এক পোয়া (২৫০ গ্রাম) কইরা নিতেছে। যার কারণে আমাদের বেচাকেনাও অনেক কইমা গেছে।’
টমেটোর পাইকারি বিক্রেতা আলীম মোল্লা বলেছেন, ‘আমরা যত ক্যারেট মাল আনি তার মধ্যে প্রায় তিন ভাগের এক ভাগ নষ্ট বের হয়। তখন আমাদের দাম পোষানোর জন্য বেশি দামে বিক্রি করা লাগে। যেমন আজকের কথাই ধরেন, আজকে মাল আনসি ১১৩ ক্যারেট। এখান থেকে পচা, নষ্ট টমেটো বাদ দেয়ার পর আমাদের কাছে এখন মাত্র ৭৫ ক্যারেট মাল। এই ৭৫ ক্যারেট বিক্রি কইরাই তো আমার ১১৩ ক্যারেটের দাম উঠানোর লাগবো। এই কারণে দাম বাইড়া গেছে। তার মধ্যে আবার বৃষ্টির কারণে দেশি টমেটো কইমা গেছে।’
টমেটোর বাজারে এই চরম অস্থিরতা থাকলেও স্বস্তির খবর হলো—অন্যান্য প্রধান খাদ্যশস্যের দাম গত সপ্তাহের তুলনায় কিছুটা নিম্নমুখী বা স্থিতিশীল রয়েছে।
বাজারে মোটা চালের (স্বর্ণা/চায়না ইরি) মূল্য সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতি কেজি ৫০ থেকে ৬০ টাকার মধ্যে নেমে এসেছে এবং লুজ সয়াবিন তেলের দাম সামান্য কমে প্রতি লিটার ১৮৬ থেকে ১৯৩ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া প্রতি কেজি মসুর ডাল, চিনি ও লবণ আগের দামেই স্থিতি পেয়েছে।
তবে সবজি ও মসলার বাজারে কিছুটা মিশ্র প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে; আলুর দাম সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতি কেজি ২৫–৩০ টাকা এবং দেশী পেঁয়াজের দাম কেজিতে ৪০–৪৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
কাঁচামরিচের দামও কিছুটা চড়া (৮০–১৩০ টাকা কেজি)। অবশ্য এর বিপরীতে বেগুনের দাম কমে ৬০–৮০ টাকায় নেমে এসেছে এবং আমদানি করা আদা ও রসুনের দামও গত সপ্তাহের তুলনায় কিছুটা হ্রাস পেয়ে ১৪০ টাকা হয়েছে।
মাংস ও ডিমের বাজারে গিয়ে দেখা গেছে, ব্রয়লার মুরগি, কক মুরগি, গরুর মাংস এবং প্রতি ডজন ফার্মের ডিমের দাম গত সপ্তাহের মতোই উচ্চমূল্যে অপরিবর্তিত রয়েছে। একইভাবে মাছের বাজারে ইলিশ, রুই ও চাষের পাঙাশের দামেও নতুন কোনো পরিবর্তন আসেনি।
বর্তমানে প্রতি কেজি সরু চাল (নাজির বা মিনিকেট) বিক্রি হচ্ছে ৮৫ টাকায়। এছাড়া মাঝারি মানের পাইজাম ও আটাশ চাল প্রতি কেজি ৬৮ টাকা এবং মোটা স্বর্ণা ও চায়না ইরি চাল প্রতি কেজি ৬০ টাকায় কেনা যাচ্ছে।
আটা-ময়দার বাজারে প্রতি কেজি খোলা সাদা আটা ৪৬ টাকা এবং প্যাকেটজাত আটা ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে খোলা ময়দা প্রতি কেজি ৬০ টাকা হলেও প্যাকেটজাত ময়দার দাম পড়ছে ৭৫ টাকা।
বাজারে প্রতি লিটার লুজ সয়াবিন তেল ১৯২ টাকা এবং ১ লিটারের বোতলজাত সয়াবিন ১৯৯ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। লুজ পাম অয়েল প্রতি লিটার ১৭০ টাকা এবং সুপার পাম অয়েল ১৭৫ টাকায় মিলছে।
ডালের মধ্যে মানভেদে বড় দানা মশুর ডাল প্রতি কেজি ১০৫ টাকা, মাঝারি দানা ১২০ টাকা এবং ছোট দানা ১৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া প্রতি কেজি মুগ ডাল ১৭০ টাকা, এ্যাংকর ডাল ৭৫ টাকা এবং ছোলা বিক্রি হচ্ছে ১০০ টাকা দরে।
বাজারে প্রতি কেজি গরুর মাংস ৮৫০ টাকা এবং খাসির মাংস ১ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। তবে মুরগির বাজারে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি ১৮০ টাকায় মিললেও দেশি মুরগির দাম পড়ছে প্রতি কেজি ৭৫০ টাকা। এছাড়া প্রতি কেজি রুই মাছ বিক্রি হচ্ছে ৪৫০ টাকা দরে।
কাঁচাবাজারের পণ্যের মধ্যে নতুন ও পুরাতন আলু প্রতি কেজি ৩০ টাকা এবং দেশি পেঁয়াজ ৪৫ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। তবে সবজির মধ্যে বেগুন ও শসা প্রতি কেজি ৮০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া প্রতি হালি লেবু ৩০ টাকা এবং প্রতি কেজি কাঁচামরিচ ১২০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে।
বাজারে প্রতি কেজি দেশি রসুন ১৪০ টাকা হলেও আমদানিকৃত রসুন বিক্রি হচ্ছে ২২০ টাকায়। একইভাবে দেশি আদা প্রতি কেজি ১৬০ টাকা এবং আমদানিকৃত আদা ১৮০ টাকায় মিলছে। দেশি ও আমদানিকৃত প্রতি কেজি শুকনা মরিচ যথাক্রমে ৩৮০ ও ৪৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
এছাড়া প্রতি কেজি হলুদ (দেশি ও আমদানি) ৩৫০ টাকা, জিরা ৭০০ টাকা, দারুচিনি ৬০০ টাকা, ধনে ২৮০ টাকা এবং তেজপাতা ২২০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।
অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মধ্যে ১ কেজির ডানো গুঁড়ো দুধ ৯৪০ টাকা, ফ্রেশ ও মার্কস গুঁড়ো দুধ ৯৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বাজারে প্রতি কেজি চিনি ১১০ টাকা, প্যাকেটজাত আয়োডিনযুক্ত লবণ ৪২ টাকা এবং সাধারণ মানের খেজুর প্রতি কেজি ৫৫০ টাকা দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে।
বাজার সংশ্লিষ্ট ও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে টমেটোর সরবরাহ ব্যবস্থার সাময়িক ঘাটতির কারণেই এই অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতি দেখা দিয়েছে।
বাজারের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে টমেটো কিনতে আসা মোহন সরকার সরকারের প্রতি জোর দাবি জানিয়ে বলেছেন, ‘বাজারে একটা পণ্যের দাম কমলে অন্যটার দাম দ্বিগুণ হয়ে যায়। সরকার যদি অবিলম্বে বাজার মনিটরিং ও তদারকি কঠোর না করে, তবে অসাধু সিন্ডিকেট চক্র এভাবে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সাধারণ মানুষের পকেট কাটতেই থাকবে।’




