বাংলা একাডেমিতে লিটলম্যাগ সংগ্রহশালা

বাংলা একাডেমি নগদ মূল্যে সংগ্রহ করছে লিটলম্যাগ
পুরনো পত্রিকা ও সাময়িকপত্রের দুর্লভ ভাণ্ডার হিসেবে দেশি-বিদেশি গবেষকদের কাছে দীর্ঘদিনের আস্থার নাম বাংলা একাডেমি গ্রন্থাগার। বহু গবেষণার সূতিকাগার হয়ে ওঠা এ গ্রন্থাগার এবার আরও সমৃদ্ধ হতে যাচ্ছে বাংলা সাহিত্যের সৃজনশীল ও বিকল্পধারার এক অনন্য অনুষঙ্গ— লিটলম্যাগকে ধারণ করে। এরই মধ্যে দুই শতাধিক লিটলম্যাগের এক হাজারেরও বেশি সংখ্যা সংগ্রহ করেছে বাংলা একাডেমি। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, শিগগিরই এ সংগ্রহশালা সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হবে। বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম মনে করেন, স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য লিটলম্যাগগুলোর এ সংরক্ষণ ভবিষ্যৎ গবেষণার ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেবে। তিনি জানান, সংগ্রহশালাটির নামকরণ করা হয়েছে কথাসাহিত্যিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের নামে।
এ ভূখণ্ডে লিটলম্যাগ আন্দোলনের ইতিহাসও কম গৌরবের নয়। ঢাকায় ১৯২৭ সালে বুদ্ধদেব বসু ও অজিত কুমার দত্ত সম্পাদিত প্রগতি এবং কুমিল্লা থেকে ১৯৩১ সালে সঞ্জয় ভট্টাচার্য সম্পাদিত পূর্বাশা সেই ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। পরবর্তীকালে, বিশেষত স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে, অসংখ্য লিটলম্যাগ সাহিত্যচর্চাকে দিয়েছে নতুন ভাষা, নতুন বোধ ও নতুন পথের দিশা। মনোরঞ্জনের জন্য নয়, মননকে জাগিয়ে তোলার প্রত্যয়ে বিশ শতকের প্রথমার্ধে যে লিটলম্যাগ চর্চার সূচনা হয়েছিল, তা একসময় সাহিত্যচর্চার গণ্ডি অতিক্রম করে হয়ে ওঠে নানা আন্দোলন-সংগ্রামের কণ্ঠস্বর। নতুন সাহিত্যধারা, নতুন চিন্তা এবং সৃজনশীল তরুণদের মানসিক ও বৌদ্ধিক অভিযাত্রার মানচিত্র খুঁজে পাওয়া যেত এ ছোটকাগজগুলোর পাতায়। সময়ের প্রবাহে লিটলম্যাগের রূপ, প্রকৃতি ও চর্চার ধরন বদলেছে; কিন্তু বাংলাদেশের সাহিত্য-ইতিহাসের নির্ভুল অনুসন্ধান আজও লিটলম্যাগ ছাড়া প্রায় অকল্পনীয় বলেই মনে করেন গবেষকরা।
বাংলা একাডেমি গ্রন্থাগারের পাশের একটি কক্ষে এরই মধ্যে সযত্নে সাজিয়ে রাখা হয়েছে সংগৃহীত লিটলম্যাগগুলো। পাঠকের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে সেই কক্ষও। সরেজমিন দেখা যায়, বুকশেলফ জুড়ে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে নানা সময়ের গুরুত্বপূর্ণ ছোট কাগজ। এর মধ্যে রয়েছে ওবায়েদ আকাশ সম্পাদিত শালুক, আপেল মাহমুদ সম্পাদিত উয়ারী বটেশ্বর, পুলক হাসান সম্পাদিত খেয়া, খোন্দকার আশরাফ হোসেন সম্পাদিত একবিংশ, আবু এম ইউসুফ সম্পাদিত অনুপ্রাণন, সরকার আমিন সম্পাদিত মঙ্গল সন্ধ্যা, কাজী মামুন হায়দার সম্পাদিত ম্যাজিক লণ্ঠন, এজাজ ইউসুফি সম্পাদিত লিরিক, আমিরুল বাশার সম্পাদিত সাম্প্রতিক, মোজাফফর হোসেন সম্পাদিত শ্বাশতিকী, শওকত হোসেন সম্পাদিত হালখাতা, শহীদ ইকবাল সম্পাদিত চিহ্ন এবং পাভেল রহমান সম্পাদিত থিয়েটারবিষয়ক ছোটকাগজ ক্ষ্যাপা।
পরবর্তী বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য লিটলম্যাগগুলোর এ সংরক্ষণ ভবিষ্যৎ গবেষণার ক্ষেত্রে খুলে দেবে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার
বাংলা একাডেমির এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন লিটলম্যাগ সম্পাদকদের অনেকে। ‘শালুক’ সম্পাদক ওবায়েদ আকাশ আগামীর সময়কে বললেন, ‘এটি তো খুবই ইতিবাচক একটি উদ্যোগ। ব্যক্তি উদ্যোগে কেউ কেউ লিটলম্যাগ সংগ্রহ করেন। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগও জরুরি।’ শিল্পকলা একাডেমি থেকেও লিটলম্যাগ মেলা আয়োজন করার তথ্য জানান ওবায়েদ আকাশ। তিনি বলেছেন, ‘শিল্পকলা থেকে লিটলম্যাগ সম্মাননাও দেওয়া হয়েছে। কলকাতায় লিটলম্যাগ নিয়ে রিসার্চ সেন্টার আছে। তবে বাংলা একাডেমির মতো গবেষণা প্রতিষ্ঠানের এ উদ্যোগ অবশ্যই সাধুবাদ জানাই।’
থিয়েটারবিষয়ক ছোটকাগজ ক্ষ্যাপার নির্বাহী সম্পাদক অপু মেহেদী বললেন, ‘লিটলম্যাগ সংগ্রহ করে যদি কক্ষে রেখে দেওয়া হয়, সেটি কার্যকর কিছু হবে না। এজন্য লিটলম্যাগ সম্পাদকদের সঙ্গে কথা বলে যদি অনলাইন ভার্সন করা যায়, তবে সেটি আরও বেশি মানুষকে সমৃদ্ধ করবে। তা ছাড়া সংগ্রহশালাটি যেন আরও সমৃদ্ধ হয়, সবাইকে সহযোগিতা করতে হবে। কারও কাছে দুর্লভ লিটলম্যাগের কপি যদি থাকে, সেটি সংগ্রহশালায় দিতে পারে। বাংলা একাডেমির এটি খুবই ভালো উদ্যোগ। লিটলম্যাগ মানেই নতুন চিন্তা। একটা সময়ের ভাষা বুঝতে হলে লিটলম্যাগ পড়তে হবে। আর বাংলা একাডেমি গবেষকদের জন্য একটি দুয়ার খুলে দিচ্ছে।’
কোন ভাবনা থেকে লিটলম্যাগ সংগ্রহশালার উদ্যোগ, জানতে চাইলে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম বললেন, ‘আমরা মনে করছি, লিটলম্যাগ যদি বাংলা একাডেমির গ্রন্থাগারে যুক্ত হয়, তবে গ্রন্থাগারটি আরও সমৃদ্ধ হবে। বাংলাদেশের সাহিত্য নিয়ে অনেক অ্যাকাডেমিক গবেষণা হয়েছে। কিন্তু প্রবন্ধ, নিবন্ধ, ক্রোড়পত্র ও সাক্ষাৎকারের বিপুল ভাণ্ডার ছড়িয়ে আছে লিটলম্যাগের পাতায়। ভবিষ্যতে যারা বাংলাদেশের সাহিত্য নিয়ে গবেষণা করবেন, তাদের জন্য এ সংগ্রহশালা হয়ে উঠবে এক অসামান্য উৎস।’
প্রতিষ্ঠানবিরোধী অবস্থান থেকেই তো দীর্ঘদিন প্রতিষ্ঠানকে প্রশ্ন করেছে লিটলম্যাগ। সেই লিটলম্যাগই কেন আজ প্রতিষ্ঠানের সংগ্রহশালায়? এমন প্রশ্নের উত্তরে অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম বলেছেন, ‘যখন কোনো একটা লিটলম্যাগ প্রতিষ্ঠানবিরোধী অবস্থানে আবির্ভূত হয়, তখন সেটি তার সমসাময়িক সময়ের অংশ। সেই মুহূর্তকে কোনো প্রতিষ্ঠান ধারণ করতে পারে না, সেটি তার আকাঙ্ক্ষাও নয়। কিন্তু একসময় সেই প্রতিষ্ঠানবিরোধী অবস্থানই ইতিহাসে পরিণত হয়। তখন তা হয়ে ওঠে ইতিহাসের জন্য এক মূল্যবান সম্পদ, গুরুত্বপূর্ণ দলিল এবং সংরক্ষণযোগ্য ঐতিহ্য। গবেষকদের কাছে লিটলম্যাগ তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলা একাডেমি সেই দ্বারটিই উন্মুক্ত করার চেষ্টা করছে।’
লিটলম্যাগের গুরুত্ব সম্পর্কে বুদ্ধদেব বসু একসময় লিখেছিলেন, ‘লিটল ম্যাগাজিন বললেই বোঝা গেল যে জনপ্রিয়তার কলঙ্ক একে কখনো ছোঁবে না, নগদ মূল্যে বড়বাজারে বিকোবে না কোনোদিন, কিন্তু হয়তো একদিন এর একটি পুরনো সংখ্যার জন্য গুণীসমাজে উৎসুকতা জেগে উঠবে। সেটা সম্ভব হবে এজন্যই যে, এটি কখনো মন জোগাতে চায়নি, মনকে জাগাতে চেয়েছিল। চেয়েছিল নতুন সুরে নতুন কথা বলতে।’




