চট্টগ্রামে সড়ক দুর্ঘটনা
‘মানবিকতা কোথায়? মৃত্যুপথযাত্রীর সব নিয়ে গেল’

নিহত নাজিম উদ্দিন ও তাসলিমা আক্তার সীমা। ছবি: সংগৃহীত
জরুরি বিভাগের লাশঘর ঘিরে শত শত নারী পুরুষ। সবার চোখে হতাশা, মুখে আহাজারি। কীভাবে ঘটল এমন ঘটনা। সেই ভিড় ঠেলে কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে এলেন হেলাল মোহাম্মদ তানভির।
ভেতরের হাহাকার চেপে রাখার ব্যর্থ চেষ্টা করলেন তিনি। বুকভাঙা আর্তনাদ পানি হয়ে গড়িয়ে পড়ছে চোখ দিয়ে। ‘আমার মা-বাবা স্কুটিযোগে রাহাত্তারপুলে নানুর বাসায় যাচ্ছিলেন। ফ্লাইওভার থেকে নামার পর কভার্ডভ্যানের ধাক্কায় সব শেষ। একসঙ্গে মা-বাবা দুজনকে হারিয়ে ফেললাম।’
চট্টগ্রাম নগরের মুরাদপুর এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে এক শিক্ষক দম্পতির। দুর্ঘটনায় বাবা-মাকে হারিয়ে শোকাহত ছেলে হেলাল মোহাম্মদ তানভির অভিযোগ, ‘আমার বাবা-মায়ের ফোন এবং মায়ের গায়ে থাকা স্বর্ণালঙ্কারও নিয়ে গেছে দুর্ঘটনার পর। পরে ফোন দুটি পুলিশ উদ্ধার করেছে শুনেছি। কিন্তু স্বর্ণ পাওয়া যায়নি। কেমন একটা দেশে আমরা আছি, মানবিকতা কোথায় গিয়ে ঠেকেছে! মৃত্যুপথযাত্রীর সব নিয়ে গেল।’
বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টার দিকে মুরাদপুর এলাকায় কভার্ডভ্যানের ধাক্কায় নিহত হন ডিসি রোডের উইলস স্টার স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ নাজিম উদ্দিন (৪৮) এবং তার স্ত্রী তাসলিমা আক্তার সীমা (৪০)। একই প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ও শিক্ষক ছিলেন তিনি।
দুর্ঘটনার পর পথচারীরা তাদের উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে দুজনকেই মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক। মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে হাসপাতালে ভিড় করেন স্বজন, সহকর্মী, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। জরুরি বিভাগের লাশঘর এলাকায় নেমে আসে শোকের ছায়া।
নাজিম উদ্দিনের বড় ভাই নিজাম উদ্দিন বলেন, ‘ভাইকে আর পাব না। আর কোনোদিন ভাইয়ের সঙ্গে কথা হবে না। আমার ভাইয়ের এটা দুর্ঘটনা নয়। এটা হত্যা করা হয়েছে ভাই ও তার স্ত্রীকে।’
নিহত নাজিম উদ্দিনের বাড়ি রাউজান উপজেলার ডাবুয়া গ্রামে। পরিবার নিয়ে নগরের জিইসি এলাকার কুসুমবাগ আবাসিকে বসবাস করতেন তিনি। প্রতিদিন স্ত্রীর সঙ্গে স্কুটিতে করে যাতায়াত করতেন বাকলিয়া ডিসি রোডের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। ঘটনার দিনও সকালে গিয়েছিলেন স্কুলে। দুপুরে বাসায় ফেরার পর বিকেলে শিকার হন দুর্ঘটনার।
উইলস স্টার স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক ফারহানা কাউছার জানান, ‘আজ দুইটা পর্যন্ত স্কুলে ছিলেন স্যার। পরে বাসায় যান। এর পর সন্ধ্যা ছয়টার দিকে শুনি তিনি ও ম্যাডাম মারা গেছেন। শুনে হাসপাতালে আসি। কোনোভাবে মেনে নিতে পারছি না এমন ঘটনা।’
রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালের লাশঘরের সামনে স্বজন ও শিক্ষার্থীদের ভিড়ও বাড়তে থাকে। নিহত দম্পতির আরেক ছেলে তাসবি এবার এইচএসসি পরীক্ষার্থী। ছোট ছেলে সিয়ামের বয়স মাত্র পাঁচ বছর।
রাত ৯টার দিকে লাশঘর থেকে ট্রলিতে করে মরদেহ দুটি বের করা হলে স্বজনদের আহাজারি আরও বেড়ে যায়। পরে দুটি অ্যাম্বুলেন্সে করে মরদেহ নেওয়া হয় কুসুমবাগের বাসায়। সেখান থেকে শুক্রবার রাউজানের গ্রামের বাড়িতে নেওয়া হবে তাদের। সেখানেই হবে শিক্ষক দম্পতির শেষ বিদায়।




