প্রধানমন্ত্রীর সফরে কি সংকট কাটবে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দেশে মার্কিন চুক্তির চাপ, ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপড়েন আর চীনের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক কেমন— এ নিয়ে নানা আলোচনা যখন চলছে, সে সময় মালয়েশিয়া হয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর রাজনৈতিক মহলে আগ্রহের জন্ম দিয়েছে। এই আগ্রহের কারণ যতটা অর্থনৈতিক, ঠিক ততটাই রাজনৈতিক। কারণ, আজকের বিশ্ব পরিস্থিতিতে কোনো অর্থনৈতিক আলোচনা বা সম্পর্ক রাজনীতি, বিশেষত ভূরাজনৈতিক সম্পর্ক এড়িয়ে যেতে পারে না।
এই সফরে মালয়েশিয়ার সঙ্গে কালচারাল এবং তথ্য ও সম্প্রচার-সংক্রান্ত দুটি এমওইউ স্বাক্ষর, কাউন্টার টেররিজম, এফটিএ (ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট) নেগোসিয়েশনসহ আরও কয়েকটি নোট অব এক্সচেঞ্জ হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের অন্যতম আগ্রহের বিষয় শ্রম এবং শ্রমিক। মালয়েশিয়ায় প্রায় ১০ লাখের বেশি বাংলাদেশি কর্মী রয়েছেন। তাদের দুর্দশার কথা বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমে উঠে আসে। ফলে নিরাপদ অভিবাসনসহ শ্রমবাজার খুলে দেওয়ার বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বের বিষয় ছিল। তাই মালয়েশিয়ার প্রতি শ্রমবাজার খুলে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
মালয়েশিয়া প্রায় সাড়ে তিন লাখ বর্গকিলোমিটারের দেশ, জনসংখ্যা সাড়ে তিন কোটির একটু বেশি। কৃষিভিত্তিক শিল্প, মাঝারি ও ভারী শিল্প, তেল-গ্যাস অনুসন্ধান, শ্রমিকের মজুরি ও নিরাপত্তা, জাতীয় আয় ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা— এসব বিবেচনায় বাংলাদেশ থেকে বেশ খানিকটা এগিয়ে রয়েছে দেশটি। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর বাইরে মালয়েশিয়ায় রয়েছে বড় শ্রমবাজার। পামবাগান, নির্মাণসহ বেশ কয়েকটি খাত আছে, যেখানে স্বল্প দক্ষতার, স্বল্প মজুরির শ্রমিক প্রয়োজন হয়।
বাংলাদেশের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি বাণিজ্য ঘাটতি চীনের, প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলার। নিত্যপ্রয়োজনীয় এমন কোনো দ্রব্য নেই কিংবা আধুনিক যন্ত্রপাতি নেই, যা চীন থেকে আমদানি করা হয় না
বাংলাদেশ এসবের জোগানদাতা। বিপুল বেকারত্ব ও বিদেশে যাওয়ার আগ্রহের কারণে বাংলাদেশের শ্রমিকদের পছন্দের তালিকায় থাকে মালয়েশিয়া। আগে ৭০ হাজার টাকায় শ্রমিক পাঠানোর কথা থাকলেও বিভিন্নভাবে টাকা আদায়ের ফলে শ্রমিকদের প্রায় পাঁচ লাখ টাকা খরচ করে যেতে হয়েছে। শ্রমিক নিপীড়ন ও প্রতারণার নানা বেদনাদায়ক ঘটনাও ঘটছে সেখানে।
এর সঙ্গে যুক্ত রোহিঙ্গা পুনর্বাসনের বিষয়ও। মালয়েশিয়াতে প্রায় ১ লাখ ২৮ হাজার রোহিঙ্গা আছে। রোহিঙ্গা শরণার্থীর চাপে বিপর্যস্ত বাংলাদেশ এক্ষেত্রে যৌথভাবে কিছু করতে পারে কি না, সে বিষয়েও আলোচনা দরকার। এসবের অবসানে প্রধানমন্ত্রীর সফর কার্যকর ভূমিকা রাখবে কি না এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত অসম চুক্তি বাতিল করে মালয়েশিয়া যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, বাংলাদেশ সেই দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি বাতিল বা সংশোধনে প্রধানমন্ত্রীর সফর কার্যকর ভূমিকা রাখবে কি না, তা প্রধানমন্ত্রী দেশে ফিরলে জানা যাবে।
বাংলাদেশের পাঁচ হাজারের বেশি ধনী ব্যক্তি মালয়েশিয়ায়কে সেকেন্ড হোম হিসেবে ব্যবহার করেন। তারা সেখানে কোটি কোটি টাকায় বাড়ি কিনেছেন। প্রায় ১১ হাজার শিক্ষার্থী মালয়েশিয়ায় পড়াশোনা করেন। এ ছাড়া পাম তেল, ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি আমদানি, ভ্রমণের উদ্দেশ্যেও বাংলাদেশিরা গমন করেন। মূলত বাংলাদেশের পাঠানোর মতো সম্পদ একটাই, সেটি শ্রমিক। এর থেকে প্রাপ্ত রেমিট্যান্স একেবারে কম নয়। এ নিয়ে মালয়েশিয়ার সঙ্গে ২০১৮ ও ২০২২ সালের সমঝোতা স্মারকে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগের কথা বলা হয়েছে। ২০২৫ সালের ২৮ অক্টোবর মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো একটি চিঠির মাধ্যমে বাংলাদেশের কাছে ১০টি বাধ্যতামূলক শর্তের ভিত্তিতে কর্মী পাঠাতে সক্ষম এমন রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর তালিকা চাওয়া হয়। এই শর্তগুলোর বাস্তবায়ন কঠিন মনে হওয়ায় মালয়েশিয়া সরকারকে অন্তত তিনটি শর্ত শিথিল করার অনুরোধ জানায় বাংলাদেশ। শর্তগুলো হলো— গত পাঁচ বছরে অন্তত তিন হাজার প্রবাসী কর্মী পাঠানোর অভিজ্ঞতা, নিজস্ব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থাকা ও তিন বছর ধরে অন্তত ১০ হাজার বর্গফুটের একটি স্থায়ী অফিস স্পেস থাকা। বাংলাদেশে আড়াই হাজার এজেন্সি সরকারি লাইসেন্সপ্রাপ্ত। এদের মধ্যে ৪২৩টি রিক্রুটিং এজেন্সির একটি তালিকা মালয়েশিয়া সরকারকে দিয়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু এখনো কোনো সমাধান হয়নি। এরকম এক সময়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফরের ফলে দেশে ও প্রবাসে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। মালয়েশিয়ায় বসবাসরত লাখ লাখ বাংলাদেশির কাছে এই সফর কেবল একটি কূটনৈতিক বিষয় নয়; বরং এটি তাদের জীবিকা, নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং দেশে ফিরে আসার সঙ্গে যুক্ত। এই সফরের ফলে দীর্ঘদিন ধরে অমীমাংসিত শ্রমবাজার সংকট, ভিসা জটিলতা ও অনথিভুক্ত কর্মীদের সমস্যা সমাধানের পথ খুলবে কি না, সেটাই দেখার।
মালয়েশিয়া থেকে প্রধানমন্ত্রী চীন সফরে েগছেন। সেখানে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের অ্যানুয়াল মিটিং অব দ্য নিউ চ্যাম্পিয়নসে অংশ নিয়েছেন। বিশ্বনেতাদের সঙ্গে বৈঠকে গুরুত্ব পেয়েছে উদ্ভাবন, বিনিয়োগ ও পারস্পরিক সহযোগিতার বিষয়। দালিয়ান থেকে ট্রেনে তিনি গেছেন বেইজিং। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তারেক রহমানের পৃথক দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হবে।
গণমাধ্যমের বরাতে জানা যাচ্ছে, চীনের সঙ্গে ঢাকার প্রায় ১৫টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হতে পারে। এর প্রস্তুতি হিসেবে বাংলাদেশ ও চীনের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলো দ্রুত মতামত প্রদান এবং আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষরের জন্য কাজ করছে। শিক্ষা, মানবসম্পদ উন্নয়ন, কৃষি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, গণমাধ্যম, উন্নয়ন সহযোগিতাসহ প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ খাতকে অন্তর্ভুক্ত করে এমওইউ স্বাক্ষরের প্রস্তুতি চলছে। এ ছাড়া চীন ও বাংলাদেশের মধ্যে উচ্চমানের পণ্য রপ্তানির যৌথ কর্মপরিকল্পনা, মুক্তবাণিজ্য, মানবসম্পদ উন্নয়ন সহযোগিতা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতাসহ আরও বেশ কিছু খাতে এমওইউ সই হতে পারে। এর অর্থনৈতিক তাৎপর্য থেকে রাজনৈতিক তাৎপর্য অনেক বেশি। এ চুক্তিগুলোর প্রভাব বিশ্ব রাজনীতি, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক, মার্কিন প্রভাব— সবকিছুতেই পড়তে পারে। বিশেষত সড়ক ও রেল অবকাঠামো নির্মাণ, বাণিজ্য এবং ঋণ সহায়তা আলোচনার কেন্দ্রে থাকবে বাংলাদেশে এবং অন্যান্য দেশেও।
বাংলাদেশের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি বাণিজ্য ঘাটতি চীনের, প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলার। নিত্যপ্রয়োজনীয় এমন কোনো দ্রব্য নেই কিংবা আধুনিক যন্ত্রপাতি নেই, যা চীন থেকে আমদানি করা হয় না। পক্ষান্তরে, চীনে রপ্তানি করার মতো তেমন খুব বেশি পণ্য নেই বাংলাদেশের। চীনের ঋণ নিয়ে বিশ্বের দেশে দেশে অভিজ্ঞতাটাও সুখকর নয়, বিশেষত শ্রীলঙ্কা ও আফ্রিকার দেশগুলোর কথা বিবেচনায় রাখা যেতে পারে। ফলে কারিগরি ও প্রকৌশলগত সহায়তা, দক্ষ শ্রমশক্তি তৈরিতে ভূমিকা, সৌরশক্তিসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যাপারে চীনের সহায়তা গ্রহণ করার বিষয় গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হতে পারে। তবে ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, বিদেশের সহায়তা নিয়ে কোনো দরিদ্র দেশ উন্নত হয় না, বরং ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ে। দেশ থেকে টাকা পাচার ও ব্যাংক ঋণখেলাপিদের যদি ঠেকানো না যায়, তাহলে অনেক সম্ভাবনার মৃত্যু ঘটতেও পারে। নজর দিতে হবে এখানেই এবং এখন।
লেখক: রাজনৈতিক সংগঠক ও লেখক





