টাকা ওড়ে মশা মরে না

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
প্রতি বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যু কি নিয়তিই হয়ে গেল? এই অবধারিত মৃত্যু দেশবাসীকে কি মেনে নিতে হবে? গত দুই দশকে প্রতি বছরই দেশের কোথাও না কোথাও ডেঙ্গুতে মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে গণমাধ্যমে কয়েক দিন বেশ শোরগোল হয়, স্বাস্থ্য বিভাগ দায়সারা গোছের কিছু বক্তৃতা-বিবৃতি, লিফলেট বিতরণ আর সেমিনার করেই খালাস, তারপর আবার চুপচাপ। স্বাস্থ্য বিভাগের ভাবটা এমন ডেঙ্গুতে মৃত্যুর দায় যেন কারও নয়। তাদের কিছু কাজকর্ম দৃশ্যমান হলেও পরে আর কার্যকর পদক্ষেপ ও সুফল দেখার দৃষ্টান্ত বিরল। গত বছরেও ডেঙ্গুতে মারা গেছে ৪১৩ জন।
চলতি বছর জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে মারা গেছে ১২ জন। ‘আগামীর সময়’-এর এক প্রতিবেদনে জানা যাচ্ছে, গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় মৃত্যু হয়েছে দুজনের। চলতি মাসে মৃত্যুসংখ্যা দাঁড়িয়েছে সাতে।
এবারও ডেঙ্গু চোখ রাঙাচ্ছে। ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যাই তা বলে দিচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার অ্যান্ড কন্ট্রোলরুমের তথ্যে জানা যায়, চলতি বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৫ হাজার ৩১৭ জন। এর মধ্যে জুন মাসেই ২ হাজার ১২০ জন, যা আগের মাসের তুলনায় তিনগুণ।
বর্ষা মৌসুম েডঙ্গুজ্বরের বাহন এডিস মশার প্রজননকাল। জুন থেকে আগস্ট-সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এডিস মশার বংশবিস্তার বেশি ঘটে। এ ক’মাস ঝুঁকিপূর্ণ। বর্ষার শুরুতেই দেশ জুড়ে ডেঙ্গু পরিস্থিতির যে ভয়াবহ রূপ দেখা যায়, তা কেবল উদ্বেগের নয়, হতাশাজনকও। প্রতিদিন মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে, স্বজনহারা মানুষের কান্নায় ভারী হয়ে উঠছে বাতাস। অথচ বছরের পর বছর ধরে ডেঙ্গু আমাদের দেশে একটি নিয়মিত বিপর্যয়। তারপরও কেন ২০২৬ সালের জুনের শেষ দিকে এসে আবারও একই লাশের হিসাব গুনতে হচ্ছে? এই ব্যর্থতার দায় কাউকে না কাউকে নিতেই হবে।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে এর আগে কিছু উদ্যোগের কথা শোনা গিয়েছিল। বিদেশ থেকে এডিস মশা মারার ওষুধ আনার প্রক্রিয়া শুধু কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ বা ফাইলে বন্দি। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এডিস মশার লার্ভা খেয়ে ফেলা বা বংশবিস্তার রোধকারী মশা আমদানির পরিকল্পনা করেছিল ২০১৯ সালে। এই পরিকল্পনার কথা গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। তারপর আবার চুপচাপ। এখন জনসাধারণ উভয়সংকটে। সংশ্লিষ্ট কাজের দায়িত্ব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের। এসব প্রতিষ্ঠানে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি নেই অনেক দিন। তাই এর কার্যক্রম নিয়ে স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা প্রশ্নবিদ্ধ। বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত যে, উড়ন্ত মশা মারার জন্য ফগিং মেশিন ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে খুব একটা কার্যকর নয়। আসল কাজ হলো লার্ভা ধ্বংস করা। কিন্তু সেই মূল জায়গায় ফাঁকি থেকে যাচ্ছে। মশা মারতে যে ওষুধ ব্যবহৃত হয়, সেগুলোর মান এবং মশার প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়েছে কি না, তা নিয়ে নিয়মিত কোনো গবেষণা নেই। ফলে কোটি কোটি টাকা বাতাসে উড়ে যাচ্ছে, মশা মরছে না।
আমরা মনে করি, সঠিক পদক্ষেপ নিলে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সিংহভাগই ঠেকানো সম্ভব। সরকারের অঙ্গ প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু সচেষ্ট হলেই হবে না, পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা সৃিষ্টতে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোরও এগিয়ে আসা দরকার। বছরের পর বছর ধরে একই ভুলের পুনরাবৃত্তি এবং গাফিলতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।




