মহররমের মহিমা ও আশুরার তাৎপর্য

মানুষের জীবনে সময়ের প্রবাহ কখনো থেমে থাকে না। দিন শেষে রাত আসে, মাস শেষে নতুন মাস আসে, আর বছরের পর বছর পেরিয়ে মানুষ ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় তার চূড়ান্ত গন্তব্যের দিকে। তাই ইসলামে সময়কে অত্যন্ত মূল্যবান সম্পদ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। হিজরি বর্ষের প্রথম মাস মহররম আমাদের সামনে সেই সময়চেতনা ও আত্মসমালোচনার বার্তা নিয়েই প্রতি বছর উপস্থিত হয়। এটিকে শুধু নতুন বছরের সূচনা হিসেবে না দেখে অতীতের হিসাব-নিকাশ করে নতুন উদ্যমে আল্লাহর আনুগত্যের পথে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান হিসেবে মূল্যায়ন করাই একজন মুমিন বান্দার দায়িত্ব।
মহররম ইসলামের দৃষ্টিতে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ একটি মাস। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা বারো মাসের মধ্যে চারটি মাসকে বিশেষ সম্মানিত ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘আল্লাহর কাছে মাসের সংখ্যা বারোটি। এর মধ্যে চারটি সম্মানিত মাস।’ (সুরা তাওবা, আয়াত: ৩৬) হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, এই চার মাস হলো— জিলকদ, জিলহজ, মহররম ও রজব। (বুখারি, হাদিস: ৪৬৬২)
মহররমের
বিশেষ মর্যাদা বোঝাতে রাসুলুল্লাহ (সা.) একে ‘শাহরুল্লাহ’
বা ‘আল্লাহর মাস’ বলে অভিহিত
করেছেন। আবু হুরায়রা (রা.)
থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘রমজানের
পর সর্বোত্তম রোজা হলো
আল্লাহর মাস মহররমের রোজা।’
(মুসলিম, হাদিস: ১১৬৩)
সব মাসই আল্লাহর সৃষ্টি। কিন্তু কোনো কিছুকে বিশেষভাবে নিজের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে উল্লেখ করার মাধ্যমে আল্লাহ তার বিশেষ মর্যাদা প্রকাশ করেন। যেমন— সব মসজিদই আল্লাহর ঘর, কিন্তু কাবাকে বলা হয় ‘বাইতুল্লাহ’ বা আল্লাহর ঘর। তেমনি মহররমকে ‘আল্লাহর মাস’ বলা হয়েছে এর বিশেষ সম্মান ও মর্যাদার কারণে।
মহররম ইসলামের দৃষ্টিতে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ একটি মাস। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা বারো মাসের মধ্যে চারটি মাসকে বিশেষ সম্মানিত ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘আল্লাহর কাছে মাসের সংখ্যা বারোটি। এর মধ্যে চারটি সম্মানিত মাস।’
মহররম মাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন হলো ১০ মহররম, যা ‘ইয়াওমে আশুরা’ নামে পরিচিত। ইসলামের ইতিহাসে এই দিনটি বহু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার স্মারক। সহিহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, আল্লাহতায়ালা এই দিনে হজরত মুসা (আ.) ও তার অনুসারীদের ফেরাউনের জুলুম থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন এবং ফেরাউন ও তার বাহিনীকে সমুদ্রে ডুবিয়ে ধ্বংস করেছিলেন। এ মহান নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় হিসেবে হজরত মুসা (আ.) রোজা রেখেছিলেন।
মদিনায় হিজরতের পর রাসুলুল্লাহ (সা.) ইহুদিদের আশুরার দিনে রোজা রাখতে দেখে এর কারণ জানতে চাইলে তারা মুসা (আ.)-এর মুক্তির ঘটনাটি উল্লেখ করে। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছিলেন, ‘মুসা (আ.)-এর অনুসরণের ক্ষেত্রে আমরা তোমাদের চেয়ে বেশি হকদার।’ এরপর তিনি নিজেও রোজা রাখেন এবং সাহাবিদেরও রোজা রাখার নির্দেশ দেন। (বুখারি, হাদিস: ২০০৪; মুসলিম, হাদিস: ১১৩০)
আশুরার রোজার ফজিলত সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমি আল্লাহর কাছে আশা করি, আশুরার দিনের রোজা পূর্ববর্তী এক বছরের গুনাহের কাফফারা হবে।’ (মুসলিম, হাদিস: ১১৬২) একজন মুমিনের জন্য এটি বড় সুসংবাদ। বছরে একটি দিনের রোজার মাধ্যমে আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বছরের সগিরা গুনাহ মাফের আশা করা যায়।
তবে শুধু ১০ মহররম রোজা রাখা নয়; বরং ৯ ও ১০ মহররম অথবা ১০ ও ১১ মহররম মিলিয়ে দুদিন রোজা রাখা অধিক উত্তম। কারণ, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইহুদিদের থেকে ভিন্নতা প্রদর্শনের জন্য ৯ তারিখও রোজা রাখার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। (মুসলিম, হাদিস: ১১৩৪)
মহররম মাস তাওবা ও আত্মশুদ্ধিরও মাস। এক হাদিসে এসেছে, ‘মহররম আল্লাহর মাস। এতে এমন একটি দিন রয়েছে, যেদিন আল্লাহ এক সম্প্রদায়ের তাওবা কবুল করেছিলেন এবং ভবিষ্যতেও অনেকের তাওবা কবুল করবেন।’ (তিরমিজি, হাদিস: ৭৪১) তাই এ মাসে ইস্তিগফার, দোয়া, কোরআন তিলাওয়াত, তাহাজ্জুদ এবং অন্যান্য নফল ইবাদতের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া উচিত।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে মুসলিম সমাজে মহররম ও আশুরাকে কেন্দ্র করে কিছু কুসংস্কার ও ভিত্তিহীন রেওয়াজ প্রচলিত রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, আশুরার দিনে বিশেষ ধরনের খাবার রান্না করলে বা বিশেষ অনুষ্ঠান আয়োজন করলে অতিরিক্ত সওয়াব পাওয়া যায়। আবার কেউ কেউ মনে করেন, এদিন নতুন কাজ শুরু করা অশুভ। এসব ধারণার কোনো ভিত্তি কোরআন-সুন্নাহতে নেই।
কারবালার মর্মান্তিক ঘটনা নিঃসন্দেহে মুসলিম উম্মাহর ইতিহাসের এক বেদনাদায়ক অধ্যায়। হুসাইন (রা.)-এর শাহাদাত মুসলমানদের হৃদয়কে ব্যথিত করে। কিন্তু ইসলাম শোক প্রকাশের নামে বুক চাপড়ানো, আত্মপ্রহার, রক্তাক্ত হওয়া কিংবা ‘হায় হুসাইন’ ধ্বনি তুলে মাতম করা সংগত কি না ভেবে দেখা উচিত।
একইভাবে তাজিয়া মিছিল, মানত-নজর, কবরকেন্দ্রিক নানা অনুষ্ঠান কিংবা আশুরাকে কেন্দ্র করে উদ্ভাবিত বিশেষ আমলও শরিয়তসম্মত নয়। ইসলামে ইবাদতের ভিত্তি হলো কোরআন ও সহিহ সুন্নাহ। রাসুলুল্লাহ (সা.) ও সাহাবায়ে কেরাম যে আমল করেছেন, সেটাই অনুসরণের যোগ্য।
মহররম আমাদের শিক্ষা দেয় যে, আল্লাহর সাহায্য সবসময় সত্য ও ন্যায়ের পক্ষেই থাকে। ফেরাউনের মতো শক্তিশালী জালিমও আল্লাহর শাস্তি থেকে রক্ষা পায়নি। আর মুসা (আ.)-এর মতো মজলুম বান্দা আল্লাহর সাহায্যে বিজয়ী হয়েছেন। একইভাবে কারবালার ঘটনাও আমাদের শেখায়, সত্যের জন্য ত্যাগ কখনো বৃথা যায় না।
তাই মহররম ও আশুরার প্রকৃত শিক্ষা হলো আল্লাহর প্রতি আনুগত্য এবং সত্যের পথে অবিচল থাকা। কুসংস্কার, বিদআত ও শরিয়তবিরোধী কর্মকাণ্ড পরিহার করে যদি আমরা এ মাসের ফজিলতকে কাজে লাগাতে পারি, তবে নতুন বছরটি আমাদের জন্য ইহকাল ও পরকালের কল্যাণের সূচনা হতে পারে।
আল্লাহতায়ালা আমাদের সবাইকে মহররম ও আশুরার প্রকৃত শিক্ষা গ্রহণ করে তার সন্তুষ্টির পথে জীবন পরিচালনার তওফিক দান করুন।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক




