সনদহীন চামড়ায় বিদেশি ক্রেতাদের অনীহা
- নীতিগত ও অবকাঠামোগত সংকট এ খাতে

সংগৃহীত ছবি
আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ (এলডব্লিউজি) সনদ না থাকায় বাংলাদেশের প্রক্রিয়াজাত চামড়ায় আগ্রহ দেখাচ্ছেন না আন্তর্জাতিক বায়ার বা ক্রেতারা। একই সঙ্গে সনদহীন চামড়ায় তৈরি পণ্য কিনছেন না আমদানিকারকরা। সাভার ট্যানারি শিল্পনগরীর কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর না থাকায় পরিবেশগত শর্ত পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে দেশীয় অধিকাংশ ট্যানারি। ফলে দেশের অভ্যন্তরে উন্নতমানের কাঁচা চামড়ার পর্যাপ্ত সংস্থান থাকা সত্ত্বেও সনদহীনতার কারণে তা বিদেশি ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করা যাচ্ছে না। আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর শর্ত মেনে চলতেই বাধ্য হয়ে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে বিদেশ থেকে সনদপ্রাপ্ত চামড়া আমদানি করতে হচ্ছে দেশীয় পাদুকা ও তৈরি পণ্য রপ্তানিকারকদের। পরিবেশগত সনদের এই জটিলতা দেশের সম্ভাবনাময় চামড়া খাতকে বড় নীতিগত ও অবকাঠামোগত সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
তবে এই কাঁচামাল সংকট ও নীতিগত সীমাবদ্ধতা ডিঙিয়েই চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) চামড়া খাত থেকে ২৫৭ দশমিক ৫৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের রপ্তানি আয় অর্জিত হয়েছে, যা বিগত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১২ দশমিক ৫৮ শতাংশ বেশি।
তবে রপ্তানি আয়ের এই সূচক ঊর্ধ্বমুখী হলেও এর পেছনে লুকিয়ে আছে এক বড় বৈপরীত্য ও নীতিগত সংকট। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মোট রপ্তানির অর্ধেকেরও বেশি বা ১৫১ দশমিক শূন্য ৩ মিলিয়ন ডলারই এসেছে ‘চামড়ার পাদুকা’ উপ-খাত থেকে। দেশের অভ্যন্তরে বিপুল পরিমাণ উন্নতমানের কাঁচা চামড়া পাওয়া সত্ত্বেও জুতাসহ মানসম্পন্ন চামড়াজাত পণ্য তৈরির জন্য দেশীয় চামড়া ব্যবহার করতে পারছেন না শীর্ষ রপ্তানিকারকরা। আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের শর্ত অনুযায়ী, শুধু লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ (এলডব্লিউজি) সনদপ্রাপ্ত কারখানা থেকে উৎপাদিত চামড়াই আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের জুতা ও পণ্য তৈরিতে ব্যবহার করা সম্ভব।
সাভারে স্থানান্তরিত ট্যানারি শিল্পনগরীর কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) দীর্ঘদিন ধরে পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর না থাকায় এবং পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণ করতে না পারায় দেশীয় অধিকাংশ ট্যানারি এখনো এলডব্লিউজি সনদ পেতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে বাধ্য হয়ে বৈশ্বিক বাজারের জন্য পাদুকা ও তৈরি পণ্য প্রস্তুতকারকদের বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে বিদেশ থেকে এলডব্লিউজি সনদপ্রাপ্ত প্রক্রিয়াজাত চামড়া আমদানি করতে হচ্ছে। একদিকে নিজস্ব কাঁচা চামড়া উপযুক্ত পরিবেশবান্ধব প্রক্রিয়াজাতকরণের অভাবে সঠিক মূল্যে বাজারজাত করা যাচ্ছে না, অন্যদিকে আমদানি করা কাঁচামালের ওপর নির্ভর করেই পাদুকা খাতের রপ্তানি চাঙ্গা রাখতে হচ্ছে।
ইপিবির তথ্যে দেখা যায়, ২০২৬ সালের আগস্ট মাসে চামড়া খাত থেকে আয় হয়েছে ১২৬ দশমিক ৫৭ মিলিয়ন ডলার, যা জুলাইয়ের ১৩০ দশমিক ৯৬ মিলিয়ন ডলারের চেয়ে কিছুটা কম হলেও গত বছরের আগস্টের ১০১ দশমিক ৩৮ মিলিয়ন ডলারের তুলনায় ২৪ দশমিক ৮৫ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে চামড়াজাত পণ্য উপ-খাতটি জুলাইয়ের ৪০ দশমিক ৪৩ মিলিয়ন ডলারের চেয়ে আগস্টে ৪০ দশমিক ৭৪ মিলিয়ন ডলার আয় করে শূন্য দশমিক ৭৭ শতাংশ ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে।
এপেক্স ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর মনে করেন, বিশ্বরাজনীতির সমীকরণে বাংলাদেশ চামড়া খাতে যে নতুন সুযোগ পেয়েছে, তা ধরে রাখতে হলে সরকার ও বেসরকারি খাতকে একযোগে সাভারের ক্ষত মেটাতে হবে। বৈশ্বিক এই উইন্ডো বা সুযোগ আজীবন খোলা থাকবে না। যদি দ্রুততম সময়ের মধ্যে সাভার শিল্পনগরীর তরল বর্জ্য ও রাসায়নিক পরিশোধন ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটিয়ে ট্যানারিগুলোর জন্য এলডব্লিউজি সনদ নিশ্চিত করা না যায়, তবে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের এই বর্তমান একচ্ছত্র সুবিধা সাময়িকী হিসেবেই ইতিহাসে থেকে যাবে। দীর্ঘমেয়াদে এই ইতিবাচক ধারা বজায় রাখতে হলে বন্দর সুবিধা বাড়ানো ও দ্রুত পণ্য খালাসের পাশাপাশি সাভারের পরিবেশকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার কোনো বিকল্প নেই।





