বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব পিডিবির, ভোক্তাদের প্রত্যাখ্যান

প্রতীকী ছবি
প্রতি ইউনিট পাইকারি বিদ্যুতের দাম ১ টাকা ২০ পয়সা থেকে দেড় টাকা পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। আর পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি বিদ্যুতের সঞ্চালন চার্জ প্রতি ইউনিট ১৯ পয়সা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। এই প্রস্তাব কার্যকর হলে গ্রাহক পর্যায়েও বাড়বে বিদ্যুতের দাম।
এই প্রস্তাব নিয়ে আজ বুধবার সকালে ফার্মগেটের কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) মিলনায়তনে গণশুনানির আয়োজন করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। যেখানে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির তীব্র বিরোধিতা করে তা প্রত্যাখ্যান করেন রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, ভোক্তা অধিকার সংগঠনসহ অংশীজনরা।
বিদ্যুৎখাতে লুটপাটের দায় গ্রাহকের কাঁধে চাপানো হচ্ছে এমন অভিযোগ তুলে তারা বলছিলেন, মূল্যবৃদ্ধির কোনো যৌক্তিকতা নেই। বরং এ খাতে অনিয়ম-দুর্নীতি আর অপচয় রোধ করা গেলে বিদ্যুতের দাম উল্টো কমানো সম্ভব।
পিডিবির মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব
শুনানি পিডিবির কর্মকর্তারা বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি (২১ থেকে ২৯ শতাংশ পর্যন্ত) করে তা আগামী মাস থেকেই কার্যকরের প্রস্তাব দিয়েছে। এর স্বপক্ষে তাদের যুক্তি ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন, জ্বালানির দাম বৃদ্ধির পিডিবির লোকসান বেড়েছে।
পিডিবি প্রস্তাবে জানিয়েছে, বর্তমানে প্রতি ইউনিটের পাইকারি দর ৭ টাকা ৪ পয়সা। সেখানে গত অর্থবছরে গড় খরচ ১৩ টাকা ১৯ পয়সা। প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ বিক্রি করে ৫ টাকা ৪৭ পয়সা লোকসান হওয়ায় বছরে মোট প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা ঘাটতি দাঁড়িয়েছে। যা সরকার ভুর্তুকি হিসেবে দিচ্ছে।
সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের জেরে চলতি অর্থবছর ঘাটতির পরিমাণ ৬৩ হাজার কোটিতে দাঁড়াতে পারে। প্রতি ইউনিটে ১ টাকা ২০ পয়সা দাম বাড়ালে ঘাটতি কমতে পারে ১৩ হাজার ২৯৮ কোটি, আর ১ টাকা ৫০ পয়সা হারে দর বাড়ালে ঘাটতি কমবে সাড়ে ১৬ হাজার কোটি টাকার বেশি।
বিইআরসির কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি বলছে, প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ৭৭ ভাগ বাড়ানো হলে ভর্তুকি থাকবে না।
শুনানিতে অংশ নিয়ে পিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিম চলতি অর্থবছরে ৬২ হাজার কোটি টাকা ও আগামী অর্থবছরে ৬৫ হাজার কোটি টাকার সম্ভাব্য ঘাটতির কথা তুলে ধরেন। বললেন, দাম না বাড়ালে মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে বিদ্যুৎ খাত। প্রস্তাব অনুযায়ী বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি করা হলেও লোকসান থাকবে এবং ভর্তুকি লাগবে। তবে তাতে এক চতুর্থাংশ থেকে এক পঞ্চমাংশের মতো ভর্তুকি কমতে পারে। কিন্তু পরোপুরি ভর্তুকি বন্ধ হবে না।
বিভিন্ন বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ কিনে তা পাইকারি দরে বিতরণ কোম্পানিগুলোর কাছে বিক্রি করে সংস্থাটি। বর্তমানে পিডিবিসহ ছয়টি বিতরণ কোম্পানি রয়েছে। পাইকারি দামে কেনা এই বিদ্যুৎ আবার গ্রাহক পর্যায়ে বিক্রি করে বিতরণ কোম্পানিগুলো। এখন পিডিবির মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব আমলে নেওয়া হলে গ্রাহক পর্যায়েও বাড়বে বিদ্যুতের দাম। সবশেষ ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বিদ্যুতের পাইকারি দর বাড়ানো হয়।
আগামীকাল বৃহস্পতিবার একই স্থানে দিনব্যাপী ভোক্তা বা গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি নিয়ে গণশুনানি হবে। এরই মধ্যে বিতরণ কোম্পানিগুলো তাদের প্রস্তাব কমিশনে জমা দিয়েছে।
অনুষ্ঠানে বলা হয়, গত অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে সরকারের ভর্তুকির পরিমাণ ছিল প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে আরও ২০ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত ভর্তুকি চেয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। এতে মোট ভর্তুকির পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ৬০ হাজার কোটি টাকায়।
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির প্রস্তাব
উৎপাদিত বিদ্যুৎ বিভিন্ন স্থানে সঞ্চালনের কাজ করে রাষ্ট্রায়ত্ব এই প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের সঞ্চালন চার্জ ৩০ পয়সা। সেখান থেকে বাড়িয়ে এটি ৪৯ করার প্রস্তাব দিয়েছে পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ।
একইদিন দুপুরে সংস্থাটি তাদের এই প্রস্তাবের পক্ষে নানান যুক্তি তুলে ধরে শুনানিতে। যদিও সেখানে উপস্থিত ভোক্তারা এর বিরোধিতা করেন।
ভোক্তা ও অংশীজনদের তীব্র বিরোধিতা
শুনানিতে অংশ নেন ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাবের সাংগঠনিক সম্পাদক ড. সৈয়দ মিজানুর রহমান। তিনি বলছিলেন, দাম বাড়ানোর প্রস্তাবে একটা কথা বারবার বলা হচ্ছে, দাম না বাড়ালে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হবে। সবাই শুধু সরকারের মুনাফা নিয়েই ভাবছে, অথচ মানুষ যে মরে যাবে তার কোনো খেয়াল নেই।
৫ আগস্টের পর দেশে অনেক কিছু পরিবর্তন হয়েছে। অথচ বিইআরসি কোনো পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে গেল না। আপনারা জানালেন- আইন অনুযায়ী ক্ষমতা নেই। যেখানে সংবিধান পরিবর্তনের মতো কথা উঠতে পারে, সেখানে বিইআরসি আইন পরিবর্তন কেন সম্ভব হবে না?- এমন প্রশ্ন তোলেন তিনি।
কমিশনের উদ্দেশ্যে মিজানুর রহমান বললেন, ‘আপনারা মানুষের পক্ষ না নিয়ে যারা অবৈধভাবে এসব প্রস্তাব দিচ্ছে, তাদের পক্ষ নিচ্ছেন। আপনাদের প্রতি অনুরোধ থাকবে, এখান থেকে সরে আসুন। সরে না এলে আপনারা একসময় গণশত্রুতে পরিণত হবেন।’
গ্রহণযোগ্যতা না থাকায় বিইআরসির এই গণশুনানি বন্ধ করা উচিত বলে মনে করেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স। তার বক্তব্য, বিইআরসির উচিত এখন নিজেদের আইন সংশোধন করে এরপর আবার শুনানি করা। এখন যে শুনানি হচ্ছে সেটা আসলে লোক দেখানো। প্রতিবারই শুনানি হয়, এরপর দাম বাড়ানো হয়।
‘বিদ্যুতের দাম বাড়লে শিল্প কারখানার উৎপাদন খরচ বাড়বে। ভয়াবহ অবস্থা হবে। তাই দাম বাড়ানোর কোনো সিদ্ধান্তই নেওয়া যাবে না। পিডিবি দাম বাড়ানোর যে সুপারিশ করেছে, তার সঙ্গে জনগণের স্বার্থ দেখা হয়নি। তাই এই গণশুনানি বাতিল করা হোক,’ যোগ করেন রুহিন হোসেন।
মোবাইল ফোন অ্যাসোসিয়েশনের নেতা মহিউদ্দিন বললেন, ‘আমরা মনে করেছিলাম, নতুন সরকার আসার পর বিদ্যুতের দাম কমানো হবে। কিন্তু এখন উল্টো বাড়ানো হচ্ছে।’
প্রয়োজনে ভর্তুকি দিতে হবে। তাও বিদ্যুতের দাম বাড়ানো যাবে না— এমন অভিমত ব্যক্ত করেন ক্যাবের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট হুমায়ুন কবির।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) নেতা জালালুদ্দিনের মতে, ‘আমাদের রপ্তানি এমনিতেই নিম্নমুখী। এই সময় বিদ্যুতের দাম বাড়লে শিল্পের ওপরে চরম আঘাত নেমে আসবে।’
কমিশনের বক্তব্য
বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব মূল্যায়নে কমিশন একটি কারিগরি কমিটি গঠন করেছে। সেই কমিটি বিদ্যুতের দামবৃদ্ধি সরকারের ভর্তুকির দেওয়ার ওপর ছেড়ে দিয়েছে। অর্থ্যাৎ সরকার কী পরিমাণ ভর্তুকি দিতে পারবে তার ওপর বিবেচনা করে মূল্য নির্ধারণ করা হবে।
বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বললেন, ‘সবার মতামত পাওয়া গেছে। এগুলো বিবেচনা করে কমিটির মূল্যায়নের মাধ্যমে আমরা বিদ্যুতের দাম সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত জানাব।’
এই প্রস্তাবের ওপর ভোক্তাদের যে-কেউ আগামী ২৩ মের মধ্যে কমিশনে লিখিতভাবে মতামত জানাতে পারবেন বলেও জানান জালাল আহমেদ।
গণশুনানিতে উপস্থিত ছিলেন বিইআরসি সদস্য (অর্থ, প্রশাসন, আইন) মতো আবদুর রাজ্জাক, সদস্য (গ্যাস) মো. মিজানুর রহমান, সদস্য (বিদ্যুৎ) মোহাম্মদ শাহিদ সারওয়ার, সদস্য (পেট্রোলিয়াম) সৈয়দা সুলতানা রাজিয়া প্রমুখ।




