ব্যবসায় গতি ফেরাতে বাড়ছে বেসরকারি ঋণ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বিনিয়োগ, শিল্পের উৎপাদন ও কর্মসংস্থান চাঙ্গা করতে আসন্ন বাজেটে ঋণ বাড়ানো হচ্ছে বেসরকারি খাতে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘদিন কড়াকড়ি নীতি অনুসরণ করায় এ খাতে ঋণপ্রবাহ কম ছিল। এতে ব্যবসা-বাণিজ্যে যে ধীরগতি তৈরি হয়েছে, সেটি কাটিয়ে উঠতেই সম্প্রসারণমূলক কৌশলের দিকে যাচ্ছে সরকার। এ ইচ্ছায় বেসরকারি খাতের ঋণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ হাজার ৬২৫ কোটি টাকা। এটি চলতি অর্থবছরের চেয়ে ১ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা বেশি।
অর্থ বিভাগের নথি বিশ্লেষণ পত্রে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ব্যাপক মুদ্রা সরবরাহ (এম-টু) প্রবৃদ্ধি চলতি অর্থবছরের সংশোধিত হিসাবে ধরা হয়েছে ১১ দশমিক ৫ শতাংশ। আগামী অর্থবছরে তা বাড়িয়ে লক্ষ্য ধরা হয়েছে ১২ দশমিক ৮ শতাংশ করার। নিট অভ্যন্তরীণ সম্পদ প্রবৃদ্ধি ৯ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১২ দশমিক ৬ শতাংশ এবং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ৮ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৯ দশমিক ৪ শতাংশ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এই তিন সূচক একই সঙ্গে বাড়ানোর অর্থ হচ্ছে, সরকার আগামী অর্থবছরে অর্থনীতিতে টাকার প্রবাহ বাড়াতে চায়— এমনটি মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। এর মূল লক্ষ্য হচ্ছে স্থবির হয়ে পড়া বিনিয়োগ, শিল্প উৎপাদন ও কর্মসংস্থান চাঙ্গা করা। তবে এর বড় ঝুঁকি হচ্ছে— বাজারে আবারও মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরির শঙ্কা।
জানা গেছে, বর্তমানে ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি ভুগছেন ঋণসংকটের পাশাপাশি উচ্চ সুদহারে। ব্যাংকগুলোয় তারল্য চাপে নতুন বিনিয়োগ কম। শিল্প উদ্যোক্তারা সহজে ঋণ পাচ্ছেন না। ফলে নতুন কারখানা সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও উৎপাদন কার্যক্রমে দেখা দিয়েছে স্থবিরতা।
এ অবস্থায় বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণকে ব্যবসাবান্ধব পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে অর্থ বিভাগ। কারণ ব্যাংকঋণ বাড়লে শিল্প ও বাণিজ্যে নতুন বিনিয়োগ বাড়তে পারে। বিশেষ করে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা কিছুটা স্বস্তি পেতে পারেন।
জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আগামীর সময়কে বলেছেন, অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করতে হলে বিনিয়োগ ও ব্যয় বাড়াতে হবে। অর্থনীতি এখন যে অবস্থায় আছে, তাকে ওপরের দিকে তুলতে না পারলে স্থবিরতা আরও বাড়বে। এজন্য আগামী বাজেট বড় হচ্ছে। আর বড় বাজেট ছাড়া দারিদ্র্যবিমোচন, অবকাঠামো উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান তৈরি সম্ভব নয়। বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান চাঙ্গা করতে বড় বাজেট দেওয়া হবে।
আগামী বাজেটে বাজারে নগদ টাকার সরবরাহ বাড়ানোর পরিকল্পনার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। চলতি অর্থবছরে বাজারে টাকা সরবরাহের লক্ষ্যমাত্রা হচ্ছে ২৪ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা। এটি বেড়ে হচ্ছে ২৭ হাজার ৩৪৭ কোটি টাকা। সাধারণভাবে এম-টু বলতে বাজারে মোট নগদ অর্থ, ব্যাংক আমানত ও সহজে ব্যবহৃত অর্থের পরিমাণকে বোঝায়। এটি বাড়ানো মানে হচ্ছে অর্থনীতিতে আরও বেশি টাকার প্রবেশ। অর্থাৎ বাজারে টাকার প্রবাহ বাড়লে ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি আসবে, কেনাকাটা ও বিনিয়োগ বাড়বে।
বিশেষ করে, এসএমই খাতে ঋণপ্রবাহ বৃদ্ধি কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ বৃহৎ শিল্পের তুলনায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প প্রতি ইউনিট বিনিয়োগে বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। সূত্রমতে, আসন্ন বাজেটে বিনিয়োগের বড় লক্ষ্যমাত্রা হচ্ছে জিডিপির ৩৪ দশমিক ৫ শতাংশ। টাকার অঙ্কে ২৩ হাজার ৫৪২ কোটি টাকা। এর মধ্যে বেসরকারি বিনিয়োগের লক্ষ্য ১৪ হাজার ৫৭০ কোটি টাকা এবং সরকারি বিনিয়োগের লক্ষ্য ৮ হাজার ৯৭২ কোটি টাকা।
সংশ্লিষ্টদের মতে, আগামী বছরের বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা নিঃসন্দেহে উচ্চাভিলাষী। বিনিয়োগ বাড়লে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। ফলে সরকার বিনিয়োগের খরা কাটাতে জাম্প দিচ্ছে এ খাতে। যার মাধ্যমে কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হবে। সরকার নির্বাচনী ইশতেহারে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার কথা বলেছে। যার বাস্তবায়ন হবে বিনিয়োগ বাড়ানোর মধ্য দিয়ে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণনির্ভরতা। অর্থ মন্ত্রণালয়ের হিসাবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে নিট অভ্যন্তরীণ সম্পদের লক্ষ্য ৯ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১২ দশমিক ৬ শতাংশে উন্নীত করা হচ্ছে। নিট অভ্যন্তরীণ সম্পদ বাড়ানোর পরিকল্পনার অর্থ হচ্ছে ব্যাংক খাতের মাধ্যমে সরকারের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ানো। সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকার শিল্প, রপ্তানি, কৃষি ও উৎপাদন খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়াতে পারে। এতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রপ্তানি আয় বৃদ্ধিসহ স্থবির শিল্প খাত আবার ঘুরে দাঁড়াবে।
বর্তমানে দেশের ব্যাংক খাত রয়েছে খেলাপি ঋণের বড় চাপে। একই সঙ্গে অনেক ব্যাংকের মূলধন ঘাটতিও উদ্বেগজনক।
এমন পরিস্থিতিতে ঋণ সম্প্রসারণ করা হলে তা যেন প্রকৃত উৎপাদন খাতে যায়, সেটি নিশ্চিত করা হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। অন্যথায় নতুন ঋণ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি না করে নতুন খেলাপি ঋণে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করবে।




