বাজেট ২০২৬-২৭
সংস্কৃতি খাত : সৃজনশীল অর্থনীতিতে জোর
- মন্ত্রণালয়ে বরাদ্দ বাড়ছে ২ কোটি
- দাম কমবে বাদ্যযন্ত্র, চলচ্চিত্র ক্যামেরার
- দেশজুড়ে ‘ক্রিয়েটিভ হাব’
- প্রত্যাশা পূরণ হয়নি সংস্কৃতিকর্মীদের
- কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের করমুক্তি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে বরাদ্দ বেড়েছে মাত্র ২ কোটি টাকা। তবে সৃজনশীল অর্থনীতি খাতের উন্নয়নে ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা সংস্কৃতির বিকাশেও ভূমিকা রাখবে বলে মনে করা হচ্ছে। এছাড়া সৃজনশীল অর্থনীতির জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের সিএসআর খাত থেকে আরও ৫০০ কোটি টাকার তহবিল সংগ্রহ করা হবে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
আজ বৃহস্পতিবার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বরাদ্দ প্রস্তাব করেন অর্থমন্ত্রী। বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা।
সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে ৮২৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে পরিচালন ব্যয় ৪৮৫ কোটি এবং উন্নয়ন ব্যয় ৩৪১ কোটি টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাজেট বরাদ্দ ছিল ৮২৪ কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেট ছিল ৭৫৩ কোটি টাকা। গত বাজেটের তুলনায় মাত্র ২ কোটি টাকা বাড়ানো হয়েছে।
দেশের সাংস্কৃতিক উন্নয়ন ও বিকাশের জন্য জাতীয় বাজেটে সংস্কৃতি খাতে ন্যূনতম ২ শতাংশ বরাদ্দের দাবি জানিয়েছিলেন সংস্কৃতিকর্মীরা। দেশের সাংস্কৃতিক উন্নয়ন, সামাজিক সম্প্রীতি, মানবিক মূল্যবোধ ও জাতীয় ঐতিহ্য সংরক্ষণের কথা তুলে এই দাবি জানানো হয়।
সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে এবার মোট বাজেটের ১ শতাংশের কম (০.০৯ শতাংশ) বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে।
সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদ এবং অভিনয়শিল্পী সংঘের সভাপতি আজাদ আবুল কালাম তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় আগামীর সময়কে বলেছেন, বাজেট বরাদ্দে এবারও সংস্কৃতি খাতকে অবহেলা করা হয়েছে, তাদের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।
মামুনুর রশীদ বলেন, “সংস্কৃতি খাতে মূল বাজেটের অন্তত ১ শতাংশ দাবি আমাদের অনেক দিনের। তা পূরণ হয়নি।”
সৃজনশীল অর্থনীতির বিকাশে যে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে, তা কীভাবে সংস্কৃতি খাতে ভূমিকা রাখবে—সেটি স্পষ্ট নয় বলে মনে করছেন মামুনুর রশীদ ও আজাদ আবুল কালাম।
‘সৃজনশীল অর্থনীতি’ বলতে মূলত চলচ্চিত্র, নাচ, গান, নাটক, প্রকাশনা, বিজ্ঞাপন, স্থাপত্য, শিল্পকলা, কারুশিল্প, নকশা, সফটওয়্যার, ভিডিও গেমস ইত্যাদিকে বোঝানো হয়। মূলত সম্ভাবনাময় এ খাতকে অর্থনীতির মূলধারায় সম্পৃক্ত করা এবং এর মাধ্যমে দেশের ব্র্যান্ডিং করার ওপর জোর দিচ্ছে সরকার।
আজাদ আবুল কালাম আগামীর সময়কে বলেছেন, “সংস্কৃতি খাতের বরাদ্দ তো বরাবরের মতোই অবহেলিত। তবে সৃজনশীল অর্থনীতির বিকাশে যে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে, তা কীভাবে বাস্তবায়ন হবে, সেই প্রক্রিয়াটা স্পষ্ট নয়। তবে এই উদ্যোগটিকে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই পর্যবেক্ষণ করছি।”
দাম কমবে বাদ্যযন্ত্র ও চলচ্চিত্র সামগ্রী
অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতায় দেশের সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের মেধা ও মননকে কাজে লাগিয়ে একটি বৈশ্বিক মানের ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ গড়ে তোলার লক্ষ্যে এবং উচ্চমানের কনটেন্ট ও চলচ্চিত্র নির্মাণ সামগ্রী যেন তরুণদের নাগালের মধ্যে থাকে, সেজন্য বাজেটে কিছু পণ্যে শুল্ক কমানোর প্রস্তাব করেন। ফলে বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের দাম কমবে।
অর্থমন্ত্রী বলেছেন, “ডিজিটাল মিডিয়ায় ব্যবহৃত সঙ্গীতের মানোন্নয়ন ও ক্রিয়েটিভ মিউজিক তৈরিতে সহায়তার জন্য প্রয়োজনীয় মিউজিক্যাল ইন্সট্রুমেন্ট—যেমন গিটার, পিয়ানো, ভায়োলিন ইত্যাদি এবং এর জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ আমদানিতে বিদ্যমান ৫ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের প্রস্তাব করছি।”
এছাড়া চলচ্চিত্র ও ক্রিয়েটিভ মিডিয়ার কারিগরি দিক আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার উদ্দেশ্যে উচ্চপ্রযুক্তির সিনেমাটোগ্রাফিক ক্যামেরা এবং ক্যামেরা ও প্রজেক্টরের খুচরা যন্ত্রাংশ আমদানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান আমদানি শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে হ্রাস করে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করেন অর্থমন্ত্রী।
অভিনয়শিল্পী সংঘের সভাপতি আজাদ আবুল কালাম বলেন, “বাদ্যযন্ত্রের ওপর শুল্ক প্রত্যাহার এবং চলচ্চিত্র সামগ্রীর শুল্ক ছাড়ের প্রস্তাব ইতিবাচক।”
দেশজুড়ে ‘ক্রিয়েটিভ হাব’, কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের করমুক্তি
সৃজনশীল অর্থনীতির উন্নয়নে জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে ক্রিয়েটিভ হাব গঠন করা অত্যন্ত জরুরি উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, “এসব ক্রিয়েটিভ হাবসমূহে সাংস্কৃতিক মঞ্চ, বইয়ের দোকান (বই পড়ার সুবিধাসহ), সিনেপ্লেক্স, ছোট আকারের ক্যাফেটেরিয়ার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট এলাকার বিশেষ পণ্যের প্রদর্শন ও বিপণনের ব্যবস্থাও থাকবে।”
ইউটিউব ও ফেসবুকে কনটেন্ট তৈরি করা তরুণদের উৎসাহিত করতে ডিজিটাল কনটেন্ট ক্রিয়েটর এবং ফ্রিল্যান্সারদের সেবার ওপর থাকা ১৫ শতাংশ ভ্যাট সম্পূর্ণ মওকুফ করা হয়েছে। এই সুবিধা ২০৩৫ সাল পর্যন্ত বজায় থাকবে বলে জানানো হয়।
অর্থমন্ত্রী বলেছেন, “ক্রিয়েটিভ খাত আমাদের অর্থনীতিতে একটি সম্ভাবনাময় খাত হলেও কখনোই তা গুরুত্বসহকারে বিবেচিত হয়নি। আমাদের সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার পূরণে ক্রিয়েটিভ অর্থনীতির ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করছি। আমাদের লক্ষ্য দেশের ক্রিয়েটিভ শিল্পের বিশাল অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে উন্মুক্ত করার মাধ্যমে অর্থনীতির মূল ধারায় সম্পৃক্ত করা।”
দেশজুড়ে আঞ্চলিক সৃজনশীল হাব গড়ে তুলতে ১০ বছরের বিনিয়োগ ও কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হচ্ছে বলেও জানালেন অর্থমন্ত্রী। বিভাগীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে এবং শিশু একাডেমি ও শিল্পকলা একাডেমি চত্বরে ‘ক্রিয়েটিভ হাব’ স্থাপন করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ‘আমাদের সরকার ক্রিয়েটিভ অর্থনীতির বিভিন্ন খাতের উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে এই খাতের অবদান জিডিপির ১.৫ শতাংশে উন্নীত করতে এবং এ খাতে পাঁচ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে নানামুখী কর্মকৌশল গ্রহণ করছে। গ্রামীণ কারুশিল্পীদের গ্লোবাল ভ্যালু চেইনে অন্তর্ভুক্তি, পণ্যের মান ও ডিজাইন বৈচিত্র্যকরণে সহায়তা, অর্থায়ন ও উন্নয়নের মূলস্রোতধারায় নিয়ে আসার উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে।’






