বড়রা আনন্দে মেজোরা স্বস্তিতে ছোটরা চিন্তায়

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
‘করহার কমালে অনেক সময় মোট রাজস্ব বাড়তে পারে, কারণ তা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে উদ্দীপিত করে’—প্রখ্যাত মার্কিন অর্থনীতিবিদ লাফার কার্ভের এমন ধারণাকে অনুসরণ করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। সত্তর দশকে লাফার কার্ভের ধারণাটি করনীতি বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব হিসেবে বিশ্ব জুড়ে পরিচিতি পায়। যুক্তরাষ্ট্রসহ বহু দেশের কর ও বাজেট নীতিতে তার ওই ধারণা ব্যবহার হয়েছে। অর্থমন্ত্রী এ তত্ত্ব অনুসরণ করে তার প্রথম বাজেট ঘোষণায় শিল্প ও রপ্তানি খাতে দিয়েছেন অনেক কর ছাড়। এতে বড়রা অর্থাৎ উচ্চবিত্তরা আছেন বেশ আনন্দে। আর প্রস্তাবিত বাজেটে মেজোদের (মধ্যবিত্ত) জন্য দারুণ স্বস্তির বার্তা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। সেখানে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ১ জুলাই থেকে নতুন পে-স্কেল কার্যকরের কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি কর ও ভ্যাট ছাড় দেওয়া হয়েছে ৬০টি নিত্যপণ্যে।
প্রস্তাবিত (২০২৬-২৭) অর্থবছরের বাজেটে আবার কর ছাড়ের পাশাপাশি বিছানো হয়েছে করজালও। ক্ষুদ্র দোকানিদের লেনদেনের ওপর চাপানো হয়েছে অগ্রিম আয়কর (এআইটি)। গ্রামের একজন খুচরা দোকানি এক হাজার টাকার পণ্য বিক্রি করলেই ভ্যাট গুনতে হবে দুই টাকা। ফলে প্রথমবারের মতো বিপুলসংখ্যক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী করের আওতায় আসবেন। এমন প্রস্তাবে এক ধরনের চিন্তায় পড়েছেন ছোটরা (নিম্নবিত্তরা)। তবে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে বিএনপি সরকার ছোটদের এ চিন্তা দূর করতে বাড়িয়েছে সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী। এ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ লাখ ৪৪ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা। এর আওতায় সুবিধাভোগী হবেন তিন কোটির বেশি দরিদ্র মানুষ।
এসব পদক্ষেপ রেখে গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেট পেশ করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। যার আয় ৭ লাখ ১ হাজার ১৫০ কোটি টাকা। এর মধ্যে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা এবং অনুদান ৬ হাজার ১৫০ কোটি টাকা। আয়-ব্যয়ের ঘাটতি (অনুদানসহ) ২ লাখ ৩৬ হাজার ৮৫০ কোিট এবং অনুদান ছাড়া ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। বেলা ৩টায় নতুন এ বাজেট পেশ করার আগে মন্ত্রিসভার বৈঠকে অনুমোদন দেওয়া হয়।
‘দেশের অর্থনীতির ভগ্নদশার পাশাপাশি বৈশ্বিক অস্থিরতায় হওয়া নতুন ঝুঁকি মোকাবিলা করতে হচ্ছে। তবে স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও সর্বোপরি ন্যায্যতাকে মূল পরিকল্পনা হিসেবে ধরে ২০৩৪ সালের মধ্যেই ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পৌঁছানোর স্বপ্ন দেখছি।’
বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার জেরে নতুন ও তীব্রতর চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছি। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির পাশাপাশি গোটা বিশ্বে যে নতুন রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক মেরূকরণের বাস্তবতা, তা গোটা বিশ্বকে এবং বিশেষ করে আমাদের বড় চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন করেছে। দেশের অর্থনীতির ভগ্নদশার পাশাপাশি বৈশ্বিক অস্থিরতায় হওয়া নতুন ঝুঁকি মোকাবিলা করতে হচ্ছে। তবে স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও সর্বোপরি ন্যায্যতাকে মূল পরিকল্পনা হিসেবে ধরে ২০৩৪ সালের মধ্যেই ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পৌঁছানোর স্বপ্ন দেখছি।
আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশ, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার ঘোষণা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। প্রস্তাবিত বাজেটে বিবেচনায় রেখেছেন ১০টি প্রধান অগ্রাধিকার। যদিও নিম্ন ও মধ্যবিত্তদের স্বস্তি দিতে নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক পণ্যের ওপর ভ্যাট ও করে উল্লেখযোগ্য হারে ছাড় দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি নতুন শিল্প গড়ে তুলতে ঘোষণা আসছে কর ছাড়ের মাধ্যমে নানা ধরনের প্রণোদনা— লক্ষ্য দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীকে আকৃষ্ট করা। এতে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে মনে করছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
আগামী অর্থবছরে কর ছাড় যেমন আছে, তেমনি কৌশলে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে করজাল। বড় বাজেটের অর্থের চাপ সামাল দিতে রাজস্ব আহরণে শহর থেকে গ্রাম, সবদিকেই থাকবে সরকারের চোখ। এনবিআরকে সংগ্রহ করতে হবে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার বেশি। তবে রাজস্ব আদায়ে অতীত অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। বিশ্লেষকরা বলছেন, সংস্কার ছাড়া বিশাল রাজস্ব লক্ষ্য অর্জন অসম্ভব।
২০২৬-২৭ এবং ২০২৭-২৮ অর্থবছরের জন্য ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের বার্ষিক করমুক্ত আয়সীমা সাড়ে তিন লাখ থেকে বাড়িয়ে পৌনে চার লাখ টাকায় উন্নীত হবে। এ ছাড়া নিত্যপ্রয়োজনীয় ৬০টি পণ্যের ওপর উৎসে কর কমানোর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। কৃষি ও ভোগ্যপণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে বর্তমানে করদাতাদের ৫, ২ কিংবা ১ শতাংশ হারে উৎসে কর পরিশোধ করতে হয়। প্রস্তাবিত বাজেটে কমিয়ে দশমিক ৫ শতাংশ করা হয়।
এ ছাড়া কিডনি ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানিতে ৫ শতাংশ অগ্রিম কর মওকুফ, কিডনি ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানিতে ৫ শতাংশ অগ্রিম কর, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের ব্যবহৃত ১৫টি পণ্য আমদানিতে অগ্রিম আয়কর ২ থেকে ১ শতাংশ, স্বর্ণ ও স্বর্ণালংকার সরবরাহে উৎসে কর ৫ থেকে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ, কম্পিউটার প্রিন্টার, ল্যাপটপ/পোর্টেবল ডেটা প্রসেসিং মেশিন, ফ্ল্যাশ মেমোরি ও মনিটর আমদানিতে অগ্রিম কর ৫ থেকে ২ শতাংশ হচ্ছে। এ ছাড়া স্থানীয় মোবাইল ফোন উৎপাদন শিল্পের ২২টি কাঁচামাল আমদানিতে অগ্রিম কর ৫ ও ২ থেকে ১ শতাংশ হচ্ছে।
নতুন বাজেটে বিনিয়োগ ও শিল্পায়নের জন্য যেসব উদ্যোগ থাকছে তার মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ খাতের উপকরণ আমদানিতে শুল্ক-কর শূন্য থাকবে, এ সুবিধা ২০৩১ পর্যন্ত বহাল থাকবে। এ ছাড়া ইলেকট্রিক গাড়ি, বাস ও ট্রাক উৎপাদনে ব্যাপক শুল্ক-কর অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে; কার্যকর থাকবে ২০৩১ পর্যন্ত। ই-বাইক শিল্পে কাঁচামাল ও যন্ত্রাংশ আমদানিতে রেয়াতি সুবিধা থাকছে। মোবাইল ফোন, ফ্রিজ, এসি, ওয়াশিং মেশিন, এটিএম ও সিসিটিভি উৎপাদনে বিদ্যমান কর-শুল্ক সুবিধা, কম্পিউটার ও ডিজিটাল ডিভাইস শিল্পের কর-শুল্ক অব্যাহতি ২০৩০ পর্যন্ত বহাল থাকবে। স্মার্টকার্ড ও ব্যাংক কার্ড উৎপাদনের ১০টি কাঁচামালে অতিরিক্ত আমদানি শুল্ক মওকুফ করা হয়েছে।
শিশুখাদ্য উৎপাদনের কাঁচামালে আমদানি শুল্ক ১৫ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা বাজারে শিশুখাদ্যের দাম কমাতে সহায়ক হবে। এ ছাড়া সব ধরনের মসলার ওপর ৫ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক এবং খেজুর আমদানির ওপর ৫ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার হচ্ছে। কৃষি খাতে স্থানীয় উৎপাদন উৎসাহিত করতে কীটনাশক ও বালাইনাশক উৎপাদনের ৩৬টি কাঁচামালে ভ্যাট মওকুফ, জিংক সালফেট সারের কাঁচামাল জিংক অ্যাশ আমদানিতে শুল্ক শূন্যে নামানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
বৈদ্যুতিক গাড়ি (ইভি) আমদানির ক্ষেত্রে বর্তমানে শুল্ক-কর ভার ৯৩ শতাংশ। নতুন প্রস্তাবে ২৫ হাজার ডলার পর্যন্ত দামের ইভিতে ৬৪ শতাংশ এবং ২৫ থেকে ৫০ হাজার ডলার পর্যন্ত দামের ইভির ক্ষেত্রে ৮০ শতাংশ শুল্ক-কর হার নির্ধারণ করা হয়েছে। বৈদ্যুতিক গাড়ির নিবন্ধন ও ফিটনেস নবায়নের সময় অগ্রিম কর কেটে রাখা হয়। সেটিও কমানোর উদ্যোগ রয়েছে। ১৮০০ সিসি পর্যন্ত ইঞ্জিন ক্ষমতার ব্র্যান্ড নিউ হাইব্রিড গাড়ি আমদানির নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে।
রপ্তানির প্রণোদনার অর্থের ওপর বর্তমানে বিভিন্ন হারে উৎসে কর কাটা হয়। আগামী অর্থবছরে ১০ শতাংশ উৎসে কর কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হচ্ছে। এ ছাড়া বিদেশি বিভিন্ন উৎস থেকে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের নেওয়া ঋণের সুদের বিপরীতে ২০ শতাংশ উৎসে কর কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হচ্ছে। এতদিন এই উৎসে কর মওকুফ ছিল।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করে উৎপাদন ও সরবরাহে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে ২০৩৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত অর্জিত আয়ের ওপর আয়কর অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
এসি ও ফ্রিজের উৎপাদন পর্যায়ে ১৫ শতাংশ ভ্যাট কমিয়ে সাড়ে ৭ শতাংশ প্রস্তাব করা হয়েছে। আবার মোবাইল ফোন উৎপাদনে ২২ ধরনের কাঁচামাল আমদানিতে অগ্রিম কর ৫ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে দেশে উৎপাদিত মোবাইল ফোনের দাম কমার সম্ভাবনা রয়েছে।
ক্যাশলেস লেনদেনে উৎসাহিত করতে পয়েন্ট অব সেল (পিওএস) মেশিনের আমদানি শুল্ক ১০ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে পিওএসের দাম কমতে পারে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির কার্যকর সমন্বয়ের মাধ্যমে বাজারে অর্থ সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করা হবে। তবে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ যাতে ব্যাহত না হয়, সেদিকেও নজর রাখা হবে। একই সঙ্গে ঋণনির্ভর প্রবৃদ্ধি থেকে বেরিয়ে উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও বেসরকারি বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলার ওপর জোর
সৌরবিদ্যুৎ শিল্পের প্রয়োজনীয় উপকরণ আমদানিতে ২০৩১ সাল পর্যন্ত সব ধরনের শুল্ক-কর শূন্য করার প্রস্তাব করা হয়। একই সঙ্গে দেশে ইলেকট্রিক গাড়ি, বাস ও ট্রাক উৎপাদনে ব্যবহৃত যন্ত্রাংশ এবং কাঁচামাল আমদানিতে ব্যাপক কর-শুল্ক অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে, যা ২০৩১ সাল পর্যন্ত বহাল থাকবে।
ইলেকট্রিক গাড়ির চার্জার ও চার্জিং স্টেশন আমদানিতে বিদ্যমান ৩৯.৭৫ শতাংশ করভার সম্পূর্ণ প্রত্যাহার এবং বৈদ্যুতিক গাড়ি ও প্লাগ-ইন হাইব্রিড গাড়ি আমদানিতে কর কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। বিপরীতে ১২০০ থেকে ১৬০০ সিসি পেট্রল ও ডিজেলচালিত গাড়ির করহার বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়।
তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বিকাশে কম্পিউটার, ল্যাপটপ, সার্ভার, প্রিন্টার, মনিটর ও এসএসডি আমদানিতে বড় ধরনের শুল্ক-কর ছাড় এবং পিওএস মেশিন আমদানিতে কর কমানোর প্রস্তাব রয়েছে। একই সঙ্গে স্টার্টআপ, ফ্রিল্যান্সার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের ভ্যাট অব্যাহতি এবং মোবাইল সিমের ওপর আরোপিত ৩০০ টাকার কর প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে।
কৃষি খাতে সার ও কীটনাশকের ওপর কর ছাড়, স্বাস্থ্য খাতে হার্টের স্টেন্ট, চোখের লেন্স ও ডায়ালাইসিস সামগ্রীর ওপর ভ্যাট ও কর অব্যাহতি এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের সহায়ক ২১ ধরনের উপকরণ আমদানিতে সম্পূর্ণ শুল্ক-কর মওকুফের প্রস্তাবও রাখা হয়েছে।
বাজেটের কর-সংক্রান্ত নানা পরিবর্তনের কারণে কিছু পণ্যের দাম বাড়বে। যেমন সিগারেট, বিড়িসহ তামাকপণ্যের মূল্যস্তর ১৫ শতাংশ পর্যন্ত করা হয়।
বাজেট কাঠামো: মোট ব্যয় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি, মোট আয় ৭ লাখ ১ হাজার ১৫০ কোটি টাকা। এর মধ্যে রাজস্ব আয় ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি এবং বৈদেশিক অনুদান ৬ হাজার ১৫০ কোটি টাকা। ঘাটতি (অনুদানসহ) ২ লাখ ৩৬ হাজার ৮৫০ কোটি এবং ঘাটতি (অনুদান ছাড়া) ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। রাজস্ব আহরণ করতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর আদায়ের লক্ষ্য হচ্ছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি, এনবিআর-বহির্ভূত আয় ২৫ হাজার কোটি এবং কর ছাড়া প্রাপ্তি হচ্ছে ৬৬ হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া বৈদেশিক অনুদান ৬১৫০ কোটি টাকা। ঘাটতি পূরণে এ বছর বিদেশ থেকে ঋণ নেওয়া হবে ১ লাখ ৯ হাজার ৮৫০ কোটি, ব্যাংক থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি, সঞ্চয়পত্র থেকে ৮ হাজার ৫০০ কোটি এবং অন্যান্য খাত থেকে ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা হচ্ছে ৭ দশমিক ৫ এবং জিডিপির লক্ষ্যমাত্রা ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। তবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে খুব পদক্ষেপ থাকছে না।
পরিচালন খাতে যা থাকছে: এদিকে পরিচালন বাজেট ব্যয় ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৫ হাজার ৭৪০ কোটি টাকা। এর মধ্যে সুদ পরিশোধে ব্যয় হবে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে বরাদ্দ আছে ৩ লাখ কোটি টাকা। এ ছাড়া চাকরিজীবীদের জন্য থাকছে পে-স্কেল ঘোষণা। এর জন্য বাজেটে বরাদ্দ আছে অতিরিক্ত ৩৫ হাজার কোটি টাকা। বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তার খাতে যুক্ত হচ্ছে নতুন আট কর্মসূচি। এ ছাড়া সৃজনশীল অর্থনীতিতে বরাদ্দ থাকছে ৩০০ কোটি টাকা।
১০ খাতে অগ্রাধিকার: প্রস্তাবিত বাজেটে ১০টি খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে–সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা, বিনিয়োগনির্ভর ও উৎপাদনমুখী অর্থনীতি, বিনিয়ন্ত্রণকরণ ও সহজীকৃত ব্যবসার পরিবেশ, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা, জ্বালানি নিরাপত্তা, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির বিকাশ, প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং স্বচ্ছ, দক্ষ ও জবাবদিহিপূর্ণ প্রশাসনিক ব্যবস্থা। একই সঙ্গে এতদিন মূলধারার বাইরে থাকা ক্রিয়েটিভ অর্থনীতি, সবুজ অর্থনীতি ও সুনীল অর্থনীতিকে জাতীয় অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিনিয়োগ বাড়াতে সরকার ‘ভ্যালু ফর মানি’ নীতিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। অর্থাৎ সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা, বিনিয়োগের অর্থনৈতিক সুফল মূল্যায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সরকারি বিনিয়োগের প্রত্যক্ষ অবদান এবং পরিবেশগত সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। প্রাণ-প্রকৃতি ও পরিবেশ সংরক্ষণকে উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করার কথাও বলা হয়েছে।
তবে অর্থমন্ত্রী বৈশ্বিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল, এলএনজি ও সারের দাম দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে। এর প্রভাবে বিদ্যুৎ, কৃষি, পরিবহন ও শিল্প খাতে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে মূল্যস্ফীতি ও ভর্তুকির চাপ বেড়েছে এবং আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও চাপে পড়েছে। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য বাংলাদেশের প্রবাসী শ্রমবাজারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য হওয়ায় সেখানে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা প্রবাস আয় ও কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছে।
সরকারের মতে, যুদ্ধ, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, উচ্চ সুদহার, বাণিজ্য শুল্কের অনিশ্চয়তা এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্ন এখন বিশ্ব অর্থনীতির স্থায়ী বাস্তবতা। তাই বাইরের ধাক্কা মোকাবিলা করে অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা বজায় রাখাই হবে অর্থনৈতিক কৌশলের মূল লক্ষ্য।
এমন প্রেক্ষাপটে ২০৩০-৩১ অর্থবছরের মধ্যে প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করা, মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা, প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ জিডিপির ২ দশমিক ৭ শতাংশে উন্নীত করা এবং মোট বিনিয়োগকে জিডিপির ৪০ শতাংশে নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। কর-জিডিপি অনুপাত বর্তমান ৬ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৯ দশমিক ৬ এবং রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত ৮ থেকে ১১ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে তিন ধাপ: সরকার তিন ধাপে অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের পরিকল্পনা নিয়েছে। প্রথম ধাপে এক বছরের পুনরুদ্ধার কার্যক্রম, দ্বিতীয় ধাপে এক থেকে তিন বছরের মধ্যে অর্থনীতির উত্তরণ এবং তৃতীয় ধাপে আগামী পাঁচ বছরে সমৃদ্ধ অর্থনীতি বিনির্মাণের লক্ষ্য বাস্তবায়ন করা হবে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির কার্যকর সমন্বয়ের মাধ্যমে বাজারে অর্থ সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করা হবে। তবে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ যাতে ব্যাহত না হয়, সেদিকেও নজর রাখা হবে। একই সঙ্গে ঋণনির্ভর প্রবৃদ্ধি থেকে বেরিয়ে উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও বেসরকারি বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
ব্যাংক ও আর্থিক খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনতে খেলাপি ঋণ কমানো, ঋণ অনুমোদন ও পুনঃতফসিল ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা এবং ব্যাংক পরিচালনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দুর্বল ব্যাংকগুলোর জন্য ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি, পুনঃমূলধনীকরণ ও ব্যবস্থাপনা সংস্কার কার্যক্রম চালানো হবে। উল্লেখ্য, চলতি অর্থবছরে দুর্বল ব্যাংক পুনঃমূলধনীকরণে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করছে সরকার।
আগামী অর্থবছরে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ১০ দশমিক ২ শতাংশ। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যমে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি এবং অন্যান্য উৎস থেকে ৯১ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। মোট ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ১৩ দশমিক ৭ শতাংশ। বাজেট ঘাটতি হবে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা বা জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ নেওয়ার পরিমাণ কমিয়ে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকায় নামিয়ে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে।
শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি এবং স্বাস্থ্য খাতে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তায় ১০০ উপজেলায় ৪২ লাখ ৫০ হাজার কৃষকের জন্য কৃষক কার্ড চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভূমিহীন ও প্রান্তিক কৃষকরা এ কার্ডের মাধ্যমে বছরে একবার ২ হাজার ৫০০ টাকা করে নগদ সহায়তা পাবেন। এ খাতে প্রাথমিকভাবে ১ হাজার ৬২ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া সুনীল অর্থনীতির ওপর গুরুত্ব দিয়ে ২০৩০ সালের মধ্যে মৎস্য রপ্তানি আয় ১ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে ক্রিয়েটিভ অর্থনীতিকে জিডিপির ১ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করতে প্রাথমিকভাবে ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সিএসআর তহবিল থেকে আরও ৫০০ কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
সরকারের প্রত্যাশা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, উদ্যোক্তা বিকাশ, উৎপাদনশীল খাতের সম্প্রসারণ এবং তরুণ ও নারীদের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করে বেসরকারি খাতকে প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত করা সম্ভব হবে।





