বিদ্যুৎ-জ্বালানিতে বরাদ্দ বাড়ছে ৩৯৩ কোটি টাকা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বাজেটে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের জন্য ১৭ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করেছে সরকার। গতবার ছিল ১৬ হাজার ৯৫২ কোটি টাকা; অর্থাৎ নতুন অর্থবছরে বরাদ্দ বাড়ছে ৩৯৩ কোটি টাকা। গতকাল বৃহস্পতিবার সংসদে বাজেট বক্তৃতায় এ তথ্য জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে গুরুত্ব দিয়ে তিনি উল্লেখ করলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে ৩৫ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত কর হবে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা। এর মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে আসবে চাহিদার অন্তত ২০ শতাংশ।
পরিবেশবান্ধব, সাশ্রয়ী ও টেকসই সৌরবিদ্যুতে উৎসাহ দিতে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত সৌরবিদ্যুৎকে করমুক্ত করার প্রস্তাব করেন অর্থমন্ত্রী। পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ বিল পরিশোধের বিপরীতে ব্যবহারকারীদের ৫ শতাংশ কর রেয়াত সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাবও করেন তিনি। তবে দেশীয় শিল্পের বিকাশে মাউন্টিং স্ট্রাকচার, লিথিয়াম সেল, ব্যাটারিপ্যাক, ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম ইত্যাদি পণ্যে রেয়াতি সুবিধা ২০২৮ সালের ৩০ জুনের পর করা হয়েছে প্রত্যাহারের প্রস্তাব।
আমদানিনির্ভর জ্বালানি থেকে বের হওয়ার পরিকল্পনা: জ্বালানি খাতের সংকট কাটাতে বড় ধরনের নীতি পরিবর্তনের কথা জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। ‘বিগত সময়ে জ্বালানি খাতে দীর্ঘস্থায়ী ভুল নীতি, অব্যবস্থাপনা এবং অতিরিক্ত আমদানিনির্ভরতা পুরো খাতকে একটি ভঙ্গুর অবস্থায় দাঁড় করিয়েছিল। সে সময় দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, রিফাইনিং সক্ষমতা বা মজুদ বাড়াতে নেওয়া হয়নি কার্যকর উদ্যোগ— অভিযোগ করলেন তিনি।
দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এখন দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর ওপর সর্বোচ্চ জোর দিচ্ছে সরকার। তিন বছরে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সের মাধ্যমে ২৭০ কিলোমিটার ভূতাত্ত্বিক জরিপ, ৭০০ লাইন কিলোমিটার ২ডি এবং ৭০০ বর্গকিলোমিটার ৩ডি সাইসমিক জরিপ সম্পন্ন করা হবে। মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এ সময়ের মধ্যে নতুন ৬৯টি কূপ খনন এবং ওয়ার্কওভার (মেরামত) করা হবে ৩১টি পুরনো কূপের।
জ্বালানি অবকাঠামো বহুমুখীকরণ: জ্বালানি আমদানিতে একক কোনো উৎসের ওপর নির্ভরতা কমাতে কৌশলগত বহুমুখীকরণ নীতি নিয়েছে সরকার। মহেশখালীতে বিদ্যমান দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের পাশাপাশি নতুন আরও একটি স্থাপনের বিষয়টি এখন সরকারের পর্যালোচনায় রয়েছে। একই সঙ্গে এগিয়ে চলছে মাতারবাড়ীতে স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের কাজও।
দেশের অভ্যন্তরে ৬০১ দশমিক ৫০ কিলোমিটার পাইপলাইনের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি নেওয়া হয়েছে সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) দ্রুত চালুর উদ্যোগ। এ ছাড়া দেশের জ্বালানি তেল পরিশোধন সক্ষমতা বাড়াতে চট্টগ্রাম বা উপকূলীয় শিল্পাঞ্চলে ধাপে ধাপে ৫০ লাখ টন সক্ষমতার একটি নতুন তেল শোধনাগার নির্মাণের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিচ্ছে সরকার।
জানুয়ারিতে আসবে পারমাণবিক বিদ্যুৎ: ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার এই মেগা প্রকল্পের প্রথম ইউনিট থেকে ২০২৭ সালের জানুয়ারির মধ্যে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের এই সমন্বিত ও সংস্কারমুখী উদ্যোগগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়ন হলে দেশের সামগ্রিক জ্বালানি নিরাপত্তা আরও সুসংহত হবে। ফলে দেশের মানুষ ও শিল্পকারখানাগুলোয় তুলনামূলক সাশ্রয়ী মূল্যে, নিরবচ্ছিন্ন এবং পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে’— আশা আমির খসরুর।
বিগত সরকারের লুটপাটের কারণে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে: অর্থমন্ত্রীর অভিযোগ, আগের সরকারের অপরিকল্পিত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নীতি, দুর্নীতি, লুটপাট এবং চরম অব্যবস্থাপনার কারণেই বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় আকাশচুম্বী। বিশেষ করে বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেও ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ বা কেন্দ্র ভাড়ার নামে বিদ্যুৎ খাতের বিপুল অর্থ অপচয় করা হয়েছে এবং এ ক্ষেত্রে রয়েছে অর্থ পাচারের গুরুতর অভিযোগও।
এ ছাড়া কিছু মেগা প্রকল্পে একতরফা এবং বিতর্কিত শর্তের কারণে বিদ্যুৎ আমদানি ও ক্রয়ের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা বহন করতে হচ্ছে দেশের মানুষকে। এসব কারণেই বিদ্যুৎ খাতে বার্ষিক ভর্তুকির পরিমাণ ৪০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।
বিদ্যুৎ খাতের সংস্কার: সব পর্যায়ে দুর্নীতি-অনিয়ম প্রতিরোধ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা, দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ এবং নিবিড় মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
পাশাপাশি অদক্ষ ও পুরনো বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বন্ধ বা আধুনিকায়ন করা, সর্বনিম্ন ব্যয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং আগের বিতর্কিত ক্যাপাসিটি চার্জ ও বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তিগুলো ফের পর্যালোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করলেন আমির খসরু। এ ছাড়া সঞ্চালন ও বিতরণ নেটওয়ার্কের আধুনিকায়ন এবং সিস্টেম লস কমিয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহকে আরও নির্ভরযোগ্য করার কাজ চলছে— যোগ করলেন তিনি।


