দুর্বল ব্যাংকের ধারের টাকা অধরা
- ৯০ হাজার কোটি টাকা ছাপিয়ে সহায়তা
- ঋণের টাকা ফেরতে বারবার অক্ষমতা প্রকাশ
- কেন্দ্রীয় ব্যাংকের টাকাই হাতিয়ার ব্যাংকগুলোর

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দুর্বল ব্যাংকগুলো দীর্ঘদিন ধরেই গ্রাহকের চাহিদামতো টাকা ফেরত দিতে পারছে না। তারল্য ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সহায়তার ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। বিপদে পড়লে বাংলাদেশ ব্যাংকও খেয়ালখুশিমতো টাকা ছাপিয়ে ধার দিচ্ছে এসব ব্যাংককে। গত ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দুর্বল ১৪টি ব্যাংককে ৯০ হাজার কোটি টাকা ছাপিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এটিকে আপৎকালীন ধার হিসেবে আখ্যা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সেই ধার বা ঋণের মেয়াদ পার হলেও বারবার বিশেষ ছাড় পাচ্ছে দুর্বল ব্যাংকগুলো। ফলে এই ঋণের একটি টাকাও ফেরত দেওয়ার নজির নেই।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ব্যাংক ব্যবস্থাকে সচল রাখতে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত সংকটে থাকা ব্যাংকগুলোকে বিশেষ তারল্যসহায়তা হিসেবে দেওয়া হয়েছে প্রায় ৭৬ হাজার কোটি টাকা। যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংক ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে টাকা ধার দেওয়া শুরু করে। প্রথম ধাপেই ২২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ধার দেওয়া হয়েছিল।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সংকট মোকাবিলায় ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১৪টি ব্যাংককে ৯০ হাজার কোটি টাকা ধার দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রথমে ৯০ দিনের জন্য ধার দেওয়া হয়। আর ২০২৪ সাল থেকে এ ধরনের ধার বা ঋণ প্রথম দেওয়া হয়। এরপর থেকে মেয়াদ বাড়ানো হয়। কিন্তু ৯০ হাজার কোটি থেকে একটি টাকাও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। বরং সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংককে চলতি মাসে আরও ৫ হাজার কোটি টাকা ছাপিয়ে ধার দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
ন্যাশনাল ব্যাংকের রাজধানীর লেক সার্কাস শাখার গ্রাহক শামীমা আক্তার জানিয়েছেন, তিনি ন্যাশনাল ব্যাংকে টাকা রেখে তুলতে পারছেন না। ব্যাংক বারবার সময় দেয়; কিন্তু টাকা দেয় না। এবার জানিয়েছিল, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহায়তা পেলে টাকা দেবে। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংক সহায়তা দেয় গোপনে, যা ব্যাংক অন্যান্য কাজে ব্যয় করে। গ্রাহকের টাকা পরিশোধ করে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, টাকা ছাপিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক সবচেয়ে বেশি ধার দিয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশকে। ব্যাংকটির সংকটকালে গত জুন মাসেই ধার দেওয়া হয়েছে ১৭ হাজার কোটি টাকা। এরপর ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংককে ১৫ হাজার ৮১০ কোটি, এক্সিম ব্যাংককে ১২ হাজার ১০ কোটি, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংককে ১০ হাজার ৮৪১ কোটি, ন্যাশনাল ব্যাংককে ১২ হাজার ৫৬৮ কোটি, ইউনিয়ন ব্যাংককে ৫ হাজার ৪২০ কোটি এবং প্রিমিয়ার ব্যাংককে ৪ হাজার ৯০০ কোটি টাকা ধার দেওয়া হয়েছে। আর চলতি মাসে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংককে ধার দেওয়া হয়েছে ৫ হাজার কোটি টাকা। এর বাইরে এবি ব্যাংককে ৪ হাজার ২৭০ কোটি, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংককে ৩ হাজার ৩ কোটি, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংককে ৬২৪ কোটি, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংককে ২৫২ কোটি, পদ্মা ব্যাংককে ২৫২ কোটি এবং বেসিক ব্যাংককে ১৯৫ কোটি টাকা ধার দেওয়া হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেছেন, কোনো কোনো ব্যাংকে তারল্য সংকট হয়েছে, তাদের টাকা ছাপিয়ে অর্থায়ন করা হয়েছে। ফলে আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা থাকে না। এর প্রভাব পড়ে মূল্যস্ফীতিতে। জিনিসপত্রের দাম উসকে যাওয়ার ক্ষেত্র সৃষ্টি হয়। যদিও ব্যাংকগুলো লুটপাটের কারণে সংকটে পড়েছে— এটি সত্য। তবে যেভাবে টাকা দেওয়া হচ্ছে, তাতে অর্থনীতির জন্য খারাপ হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘গোপনে টাকা ছাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, এটি ঠিক নয়। নিয়ম মেনে তারল্যসহায়তা দেওয়া হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক একরকম বাধ্য হয়ে এসব সহায়তা দিচ্ছে। কারণ আমানতকারীরা অর্থ ফেরত না পেলে ব্যাংক খাতে আস্থাহীনতা সৃষ্টি হতে পারে।’



