৪০ হিমাগার বন্ধ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের সঙ্গে বাড়তি ব্যয়, সরকারের নীতিগত অসামঞ্জস্য এবং আলু সংরক্ষণের ভাড়া কমানোর সিদ্ধান্তে গভীর সংকটে পড়েছে দেশের হিমাগার শিল্প। এরই মধ্যে বাড়তি পরিচালন ব্যয় সামলাতে না পেরে সারা দেশে বন্ধ হয়ে গেছে প্রায় ৪০টি হিমাগার। এসব হিমাগারের ধারণক্ষমতা ছিল ১ লাখ ৩২ হাজার ২৪৩ টন। এর মধ্যে কোনো ধরনের বাস্তবভিত্তিক পর্যালোচনা ছাড়াই নতুন করে কেজিপ্রতি ৭৫ পয়সা সংরক্ষণ ভাড়া কমানোর সিদ্ধান্তে ক্ষোভ ও অনিশ্চয়তা আরও তীব্র হয়েছে খাতটিতে।
হিমাগার খাতের সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি এসেছে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের অনুপস্থিতি থেকে। আলুর মান ও স্থায়িত্ব বজায় রাখতে হিমাগারে ২৪ ঘণ্টা নির্দিষ্ট তাপমাত্রা ধরে রাখতে হয়, অথচ প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় বাধ্য হয়ে চালাতে হচ্ছে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ডিজেল জেনারেটর। বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএসএ) সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বাবুর তথ্যমতে, বিদ্যুৎ সংকটের কারণে বর্তমানে প্রতিটি কোল্ড স্টোরেজে প্রতিদিন শুধু জেনারেটরের জ্বালানি বাবদই অতিরিক্ত ২৫-৩০ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। বিদ্যুৎ বিলের বোঝা তো রয়েছেই; ২০২৫ সালের জুনের তুলনায় ২০২৬ সালের জুনে তার নিজের ৯টি ইউনিটে প্রতিটিতে ৩ লাখ করে ২৭ লাখ টাকা অতিরিক্ত বিল গুনতে হয়েছে। বিদ্যুৎ ঘাটতির কারণে প্রতি ঘণ্টায় বিশাল অঙ্কের জ্বালানি অপচয় হওয়ায় পরিচালন ব্যয় এখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।
এই চড়া পরিচালনা ব্যয়ের মধ্যে কৃষি মন্ত্রণালয়ের একতরফা সিদ্ধান্ত মালিকদের কোণঠাসা করে ফেলেছে। দেশে যেখানে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের কাছাকাছি এবং গত জুনে বিদ্যুতের দাম বাড়ল ১৮ শতাংশ, সেখানে কৃষি মন্ত্রণালয় হিমাগার মালিকদের কোনো মতামত না নিয়ে এক নির্দেশে আলুর সংরক্ষণ ভাড়া কেজিপ্রতি ৭৫ পয়সা কমিয়ে দিয়েছে। বর্তমানে দেশের হিমাগারগুলোয় প্রায় ২৩ লাখ বস্তা আলু সংরক্ষিত রয়েছে। বিসিএসএর হিসাব অনুযায়ী, ভাড়া কমানোর এই একটি সিদ্ধান্তে মালিকদের সরাসরি প্রায় ১৭২ কোটি টাকার ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের অভাব এবং আয় কমে যাওয়ার এই দ্বৈত চাপে বেশিরভাগ হিমাগার মালিকই এখন ঋণখেলাপি হওয়ার চরম ঝুঁকিতে রয়েছেন।
বিদ্যুৎ-বিভ্রাটের পাশাপাশি কারিগরি ও ব্যবস্থাপনাগত সমস্যাও হিমাগারগুলোয় বিপর্যয় ডেকে আনছে। লোডশেডিংয়ের কারণে তাপমাত্রা নিয়মিত ওঠানামা করায় অনেক ক্ষেত্রে ভেতরে সংরক্ষিত আলু ঘামছে এবং দ্রুত পচন ধরছে। এ ছাড়া অনেক হিমাগারে বাড়তি বিদ্যুতের খরচ বাঁচানোর মানসিকতা ও অতিরিক্ত আলু সংরক্ষণের কারণে বাতাসে আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণের নিয়ম মানা সম্ভব হচ্ছে না, যার খেসারত দিতে হচ্ছে সংরক্ষিত আলুর গুণগত মান নষ্ট হওয়ার মাধ্যমে। কৃষিপণ্য সুরক্ষায় এত বড় ভূমিকা রাখা সত্ত্বেও বেসরকারি হিমাগারগুলো বিদ্যুৎ বিলে কোনো রেয়াত সুবিধাও পাচ্ছে না, যা এই শিল্পকে আরও রুগ্ণ করে তুলছে।
এমন পরিস্থিতিতে হিমাগার খাতকে বাঁচাতে অ্যাসোসিয়েশন থেকে সরকারের কাছে জরুরি কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার আবেদন জানানো হয়েছে। মালিকরা বলছেন, হিমাগারগুলোকে অবিলম্বে পূর্ণাঙ্গ কৃষিভিত্তিক শিল্পের সুযোগ দিয়ে বিদ্যুৎ বিলে বিশেষ রেয়াত দিতে হবে এবং কৃষি অঞ্চলের জন্য নিরবচ্ছিন্ন ডেডিকেটেড বিদ্যুৎ লাইন চালু করতে হবে। একই সঙ্গে কেজিপ্রতি ভাড়া ৭৫ পয়সা কমানোর অসংগতিপূর্ণ সিদ্ধান্তটি অবিলম্বে পুনর্মূল্যায়ন করা না হলে সামনের দিনগুলোয় বন্ধ হিমাগারের তালিকা আরও দীর্ঘ হবে, যা শেষ পর্যন্ত দেশের সামগ্রিক খাদ্য সুরক্ষাকেই মারাত্মক হুমকিতে ফেলবে।



